বিজয় দিবসে আমাদের প্রত্যাশা

বিজয় দিবসে আমাদের প্রত্যাশা

রবিউল ইসলাম রবীন  : বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মাস, প্রতিটি দিন একেকটি মহাকাব্য। শত বা হাজার নয়, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। কোন রানার আপ ছাড়াই সেই মুক্তিযুদ্ধে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। আর পাকিস্তানিরা হেরেছিল। ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। ইতিহাসে এমনটি মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক মুজিবের ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা স্বজনের সমস্ত বন্ধন ছিড়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ কি জিনিষ সেটি অনেকের উপলদ্ধিতে ছিল না। বাঙালিদের এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল স্বত:স্ফূর্ত। যে কৃষক শহর, সভ্যতা চিনতো না, জানতো না, সে কিনা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মাত্র দুই তিন মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। অনেক কিশোর হয়তো কিছু না বুঝেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকারের অনুসুঙ্গ, পরিচয়ের উৎস। আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
একাত্তরের আগে আমাদের ভূমি ছিল, মাতৃভূমি ছিল না। দেশ ছিল, স্বদেশ ছিল না। ভাষা ছিল, মাতৃভাষা ছিল না। ভূখন্ড ছিল, স্বাধীনতা ছিল না। এখন আমরা মাতৃভূমি পেয়েছি, যে মাতৃভূমিতে আমাদের সন্তানরা ’পাক সার জমিন সাদ বাদ’- এর পরিবর্তে আমাদের জাতিয় সংগিত গায়। আমাদের নিজস্ব দেশ হয়েছে, সেখানে গর্বিত লাল-সবুজের পতাকা ওড়ে। এখন আমরা মাতৃভাষা পেয়েছি, যে মাতৃভাষা বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এখন ১৮৮ দেশ পালন করে। এই সব কিছু সম্ভব হয়েছে আমরা স্বাধীন হয়েছি বলে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণও বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে। একটি গৌরবময় রাষ্ট্র হিসাবে এখন বাংলাদেশ সারা বিশ্বে স্বীকৃত, সমাদৃত। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাই মুক্তিযুদ্ধকে কখনো অবজ্ঞা করা যাবে না। ডিসেম্বর এলেই আমরা স্মৃতিকাতর হই,বেদনায় নীল হই, আবার মুক্তির আনন্দে ভেসে যাই। একটা সময় হিসাব কষে দেখতে মন চায়। আমরা কী হারালাম,কী পেলাম। দেশ স্বাধীন হয়েছে,. রক্তের ঋণ কি শোধ হয়েছে? মুক্তি কি এসেছে? রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে আমরা মাত্র ৯ মাসে জয়লাভ করেছিলাম। এত দ্রুত এই পর্ব শেষ যাওয়াটা ছিল বিস্ময়কর। বিশ্বে যা বিরল। এখনো ফ্লাশব্যাকে এই সময়টা জীবন্ত ধরা দেয়। স্বজন হারানোর বেদনায় হাহাকার করি, আবার মুক্তির আনন্দে উল্লসিত হই। ডিসেম্বর আমাদের নিকট অতীতকে স্মরণ করার সময়। বিজয়ের আনন্দে আমরা যেন ভুলে না যাই, মুক্তিযুদ্ধে কী চড়া দাম আমরা দিয়েছিলাম। ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সর্বজনিন জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। গড়ে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। (সূত্র: ২৫ মার্চ কেন গণহত্যা দিবস, মুনতাসির মামুন)।
বিশ শতকের একাত্তর থেকে একুশ শতকের সময় পর্যন্ত অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি আমরা। এখন তো আমাদের শুধূ সামনের দিকে তাকানোর সময়। মারামারি, ঝগড়াঝাটি করে তো আমরা কয়েক দশক পার করলাম। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের পরস্পরের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। আমাদের সকলকেই উপলদ্ধি করতে হবে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশটা তো আমাদের সবার। সে দেশটাকে এখন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মাঠে-ঘাটে আন্দেলন করা, তজন-গর্জন করা এক জিনিষ আর রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা অন্য জিনিস। আমরা মনে হয় গোড়া থেকেই আমরা এই সব সংকটের মধ্যে আছি। প্রায় সর্বত্রই চলছে দখলদারি আর আধিপত্যের দৌরাত্ম। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কেউ কেউ নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। মুক্তিযুদ্ধ থেকে যে যত দূরে ছিল, তার আস্ফালন তত বেশি। এত কিছুর পরও এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় যে, মেঘ কেটে যাবে, অন্ধকার দুর হবে। সমৃদ্ধির জোছনায় চারদিক আলোকিত হবে।
আমাদের সন্তানরা যখন ক্রিকেটে ভাল করে, হিমালয় জয় করে,  আনন্দে তখন আমরা রাস্তায় নেমে আসি। আমাদের অর্জনগুলো যখন বিশ্বসভায় সর্বজনিন রূপ নেয়, তখন আমাদের আস্থা ও সাহস বাড়ে। বিশ্বে আমাদের সৈনিকরা যখন কৃতিত্ব অর্জন করে, গর্বে তখন আমাদের বুক ভরে যায়। তাইতো নিজে নিজেকে বলি, এই তো আমাদের মুক্তি, এই তো আমাদের স্বাধীনতা। আর এ কথা তো সত্য যে, এই এত এত কিছু সম্ভব হয়েছে, কারণ আমরা আমাদের মতো করে দেশটাকে পেয়েছি। এতসব অর্জনকে পেতে যারা বেঁচে আছে, যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যেন অটুট থাকে, বিজয় দিবসে এই প্রত্যাশা ।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক, কলামিস্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫