আওয়ামী লীগের আমলে পদ্মা সেতু হবে না, ছাত্র সমাবেশে খালেদা জিয়া

বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না

বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না

সরকার চাইলেও বিএনপিকে বাদ দিয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপিকে ছাড়া দেশে কোনও নির্বাচন হবে না এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনের দল। আমরা নির্বাচন করব। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চাইলেই রাখা যাবে না। আমরা নির্বাচন করব। তবে সে নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। আর এজন্য বর্তমান অনির্বাচিত পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিতে হবে। এই পার্লামেন্ট রেখে নির্বাচন হবে না, শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচন হবে না। সরকারের উদ্দেশে বিএনপি নেত্রী বলেন, আপনারা যদি মনে করেন আমাদের দলের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন ঘোষণা করবেন আর নির্বাচন হবে-এইটা আর হবে না। দেশে ২০১৪ সালের মতো একতরফা নির্বাচন আর হবে না। দেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপিকে বাদ দিয়েও কোনো নির্বাচন হতে পারে না, হবে না। ২০১৮ সাল হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের বছর।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছাত্রদলের ৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বেগম জিয়া। আগে থেকেই এ সমাবেশের অনুমতি নিয়েছিল ছাত্রদল। পরে সকাল থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। দুপুর দুইটার সময় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের মূল ফটক তালাবদ্ধ ছিল। সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান থাকায় নিরাপত্তার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের তালা বন্ধ করে দেয় বলে জানা গেছে। তবে মিলনায়তন বরাদ্দ পাওয়ার পরেও সেটি তালাবদ্ধ থাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন।

এরপর বিকেল তিনটার দিকে দলের নেতা-কর্মীরা মিলনায়তনের মূল ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় সেখানে বিএনপির নেতারা বলেন, তালা না খুললে তারা সেখান থেকে যাবেন না। এরপর বিকেল চারটা ২৫ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়া মিলনায়তনের সামনে এসে উপস্থিত হন। তখন বিএনপির নেতা-কর্মীরা মুহূর্মুহূ সেøাগান দিতে থাকেন।

এ সময় খালেদা জিয়া তার গাড়িতেই (পাজেরা জিপ) বসে অপেক্ষা করছিলেন। মিলনায়তন বরাদ্দ পাওয়ার পরও কেন তা খুলে দেওয়া হয়নি, বিষয়টি জানতে চান খালেদা জিয়া। এরপর তিনি তাঁর গাড়িতেই অবস্থান করতে থাকেন। তখন খালেদা জিয়ার গাড়ি ঘিরে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। তারা সড়কেও ছড়িয়ে পড়লে গাড়ি চলাচলে বিঘœ ঘঠে। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমাবেশ করতে পুলিশের অনুমতিও আমাদের নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ইঙ্গিতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ মিলনায়তন বন্ধ রেখেছে। এই সমাবেশ থেকে সরকার পতনের দিন শুরু হয়ে গেছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, বিএনপিসহ দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো আজ থেকে সামনে এগিয়ে যাবে, কেউ আর পিছিয়ে পড়বে না। আজ থেকে এ সরকারের পতনের দিন শুরু হলো। একপর্যায়ে বিকেল ৫টা ১৭মিনিটে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ঘোষণা দেন, এইমাত্র ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে- দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সম্মানে মিলনায়তন খুলে দেওয়া হচ্ছে।

ছাত্রদলের প্রতিবাদের মুখে তারা মিলনায়তন খুলে দিচ্ছে। এরপর হাজার হাজার নেতা-কর্মী মিলনায়তনে প্রবেশ করে মঞ্চ সাজানোর কাজটি শেষ করে। সন্ধ্যা ৫টা ৩৫ মিনিটে খালেদা জিয়াও গাড়ি থেকে নেমে মিলনায়তনে প্রবেশ করেন এবং মঞ্চে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। আজ দেশ এক ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী চলছে। শেখ হাসিনা যা বলে সেই অনুয়ায়ী চলে। আসলে কিছুই চলছে না। দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু অচল হয়ে যাচ্ছে।

আমরা বলতে চাই, এক ব্যক্তির শাসনে তো এদেশ চলতে পারে না। এজন্য দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। সদ্য পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ‘অস্ত্রের মুখে’ পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া। নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগে বিলম্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয় না। কাজেই এখনো মতলবটা তাদের ভালো নয়। মওদুদ সাহেব (মওদুদ আহমদ) বলেছেন একদিনও নাকি ওই পদ খালি রাখা যায় না। কাজেই আমরা বলতে চাই, শেখ হাসিনা যা চাইবে সেটা না করলে তাকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে, তার নামে মামলা হবে, তাকে জেলে যেতে হবে, অত্যাচারিত হতে হবে। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ঐক্য, ঈমান ও শৃঙ্খলা- এই তিনটি জিনিস তোমাদের মধ্যে থাকতে হবে।

তোমাদের আরো সুশৃঙ্খল হতে হবে। তাহলে সবকিছু জয় করা সম্ভব হবে। শুধু স্লোগান দিলে চলবে না। দেশে জঙ্গির উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগকে অভিযুক্ত করেন বেগম জিয়া। তিনি বলেন, নিজেরা বোমা রাখে, অস্ত্র রাখে। তারপর যাকে ইচ্ছা তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। জঙ্গি সৃষ্টি আওয়ামী লীগ করেছিলো। শাইখ আবদুর রহমান, বাংলা ভাই সব তাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী। কথায় কথায় কিছু হলে জঙ্গির ভয় দেখায়। পদ্মাসেতুর প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, এখন তারা পদ্মাসেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগের আমলে এই সেতু হবে না। জোড়াতালি দিয়ে যদি কোনো একটা বানায়ও, সেই সেতুতে কেউ উঠতে যাবেন না। অনেক রিস্ক আছে। এ সময় দেশে উন্নয়নের নামে ক্ষমতাসীনদের ‘লুটপাট’ ও ‘দুর্নীতি’ এবং ‘দ্রব্যমূল্যের ঊধর্বগতি’তে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুমতি দিয়েও অনুষ্ঠান করতে না দেয়ায় ইনস্টিটিউশনের কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন বিএনপি প্রধান।

ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহসানের সভাপতিত্বে ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের পরিচালনায় সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, কেন্দ্রীয় নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, কামরুজ্জামান রতন, এবিএম মোশাররফ হোসেন, হাবিবুর রশিদ হাবিব, শফিউল বারী বাবু, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, নাজিমউদ্দিন আলম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে, সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ছাত্র সমাবেশের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অর্থাৎ পুলিশের অনুমোদন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। আজ (মঙ্গলবার) সকাল ১০টার দিকে ছাত্রদলের নেতারা মঞ্চ নির্মাণের জন্য যায়, তখন দেখে প্রধান গেইটে তালা। হঠাৎ করে এভাবে অনুষ্ঠান করতে না দেওয়া, গড়িমসি করা- এটা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে গণতান্ত্রিক যে অধিকারগুলো, সেই অধিকারকে খর্ব করার শামিল বলে আমরা মনে করি।