বাড়ছে রেমিটেন্স প্রবাহ

বাড়ছে রেমিটেন্স প্রবাহ

আব্দুল হাই রঞ্জু : প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব যে অপরিসীম, নতুন করে যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মূলত বিদেশি আয়ের প্রথম স্থানটি পোশাক খাতের, আর পরের স্থানটি ধরে রেখেছে প্রবাসী রেমিট্যান্স। যার বদৌলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ছে তরতর করে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বর্ণদ্বার পদ্মা সেতুর মত সুবিশাল প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনকালে অভিযোগ করেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কথা বলে বিশ্ব ব্যাংক আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বন্ধ করতে বাংলাদেশের কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে বিদেশিদের প্রভাবিত করেছে মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দিলেও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে আমি ঘোষণা দেই। যদিও শেষ পর্যন্ত কানাডার আদালতে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির কোন প্রমাণ মেলেনি।

 অবশ্য আমাদের দেশে দুর্নীতির মাত্রা কমবেশি প্রতিটি খাতেই এখনও প্রবল। ফলে দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠলে যে কেউ সহসাই তা বিশ্বাসও করেন। স্বাধীনতা উত্তর গত ৪৭ বছরে এ দেশের অর্থনীতিতে যেমন বৈষ্যমের হার বেড়েছে, পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতিও বেড়েছে, তেমনি চোখে পড়ার মত উন্নয়নও ঘটেছে, যা অস্বীকার করারও কোন জো নেই। আবার মানুষের আয় রোজগারও যেমন বেড়েছে, তেমনি ভূমিহীন, বাস্তুহীন মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। পাশাপাশি দেশে সমৃদ্ধশালী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। আর পূঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার এটাই নিয়ম। যে সমাজ ব্যবস্থায় বৃহৎজনগোষ্ঠী শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করবে, আর গুটিকতক মানুষের ভোগ বিলাস বাড়বে।

 হচ্ছেও তাই। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, এ দেশে কোটিপতির সংখ্যাও প্রতিনিয়তই বাড়ছে। পক্ষান্তরে গ্রামীণ জীবনে বাস্তুভিটাহারা নিঃস্ব মানুষ নগর-মহানগরের বস্তিগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে। এসবই একটি পূঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শোষণের জ্বলন্ত প্রমাণ। নগর-মহানগরগুলোয় গড়ে ওঠছে সুবিশাল অট্টালিকার পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যে হারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রসার হচ্ছে দেশে, সে হারে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে না। কারণ আগেই বলেছি, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। যদিও ক্ষমতাসীনদের দাবি, মানুষের আয় রোজগার বেড়েছে, মানুষ স্বাবলম্বী হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে দেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়নি। যারা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সে ঋণ নির্দিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে বসতবাড়ির উন্নয়ন, ছেলে মেয়েদের বিবাহ উৎসবে ব্যবহার করায় উপরিভাগে মানুষের আর্থিক সক্ষমতা দেখা গেলেও এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে অধিকাংশ মানুষকেই ধারদেনা কিম্বা মহাজনী ঋণের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে। এটাই কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র। আর কৃষি শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য, কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে কৃষক মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। দেশের বৃহৎজনগোষ্ঠীর আহার যোগান দিতে সাধারণ কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টার শেষ নেই। কিন্তু সেই কৃষকের দৈন্য দশারও এখন দৃশ্যমান।

অর্থাৎ কৃষি অর্থনীতির দেশে কৃষকের অবস্থার উন্নতি না হলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে, এটাই স্বাভাবিক। মানুষ এমন প্রয়োজনের তাগিদে দৈনন্দিন নিত্যপণ্য একান্তই যা না কিনলে নয়, শুধু তাই খরিদ করছে। ফলে সারিসারি দোকানের সামনে দিয়ে যে কেউ হাঁটলে স্যার স্যার এখানে আসুন, এ ধরনের ডাক এখন নিত্যদিনের। অর্থাৎ সারি সারি শপিং মল, দোকানপাট গড়ে উঠলেও সে হারে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে না। এসবগুলোই একচেটিয়া পূঁজির আধিপত্য বিকাশের ফসল। যখন একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন গোটা দেশের অর্থনীতি গুটিকতক মানুষের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। সংগত কারণে এখন একজন চিকিৎসক চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কিম্বা ক্লিনিক স্থাপন করে ব্যবসা করছেন। আবার মানব সেবারও দাবি করছেন! দেখা যায়, ওই চিকিৎসকের পুঁজির আধিপত্য এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে তিনি এখন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ব্যবসার পাশাপাশি জনগণের নিত্যপণ্য তেল, ডাল, আটা, চাল, সুজিসহ নানা পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করছেন। এমনকি সুযোগ পেলে রাজনীতির মাঠও দখল করছেন।

 একজন বুনিয়াদি শিল্পপতি হিসেবে যিনি নিজেকে দাবি করেন, তিনিও এখন দেশের গ্রোসারী ব্যবসার সুযোগটি পর্যন্ত গ্রহণ করছেন। শুধু গ্রোসারি কেন বলবো, আবাসন, বিদ্যুৎখাতেও তাদের পদচারণা এখন কার্য্যত দৃশ্যমান। ফলে দেশের হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক জগতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবার এসব ঋণগৃহিতা শিল্পপতিরা যথাসময়ে ব্যাংকের টাকাও পরিশোধ করেন না। অনেক সময়ই রুগ্ন শিল্প, ব্যবসায় মন্দা এমনি নানা অজুহাতে ঋণ পুনঃতফসিল করে নতুন করে ঋণ নেয়ারও চেষ্টা করেন। তাদের চেষ্টা অধিকাংশ সময়েই বিফলে যায় না। আবার ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে যাদের বিরুদ্ধে সচরাচর মামলা পর্যন্ত হয়। কিন্তু রুগ্ন শিল্পের দাবিদারদের বিরুদ্ধে সহসাই কোন মামলাও হয় না। অথচ কৃষি নির্ভর দেশের কৃষকের বিরুদ্ধে সামান্য কৃষি ঋণ আদায়ে সার্টিফিকেট মামলা দিতেও ব্যাংকগুলো পিছ পা হয় না। এই হচ্ছে বাস্তবতা। কৃষি নির্ভর আমাদের দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সেভাবে গড়ে উঠছে না, আবার গড়ে ওঠা কৃষিভিত্তিক সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়ে লোকসান গুনতে গুনতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

দেশের ১৬ কোটি মানুষের নিত্যপণ্যের চাহিদার তালিকায় চিনি অন্যতম। একসময় দেশের প্রচুর আখের চাষ হতো। আখও ভাল উৎপাদন হতো। আখকে ঘিরে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান আমলে দেশের চিনিকল গড়ে উঠেছিল। চিনিকলগুলো লাভও করতো। ফলে আখ চাষীরা আখের উপযুক্ত মূল্য পেতো। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর দেশের চিনিকলগুলো দুর্নীতির কারণে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ফলে বাড়তি জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে দেশীয় চিনিকলগুলো অপারগ হওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দেওয়ায় হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তা পরিশোধন করে বিপণন করা অব্যাহত রেখেছেন। যাদের হাতে গোটা দেশের সকল ভোক্তাই জিম্মি! তারা যে দাম নির্ধারণ করে, সে দামেই ভোক্তাদের চিনি খেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অথচ কৃষি অর্থনীতির দেশে রাষ্ট্রায়ত্ব চিনিকলগুলোয় উৎপাদিত চিনি বাড়তি মূল্যের কারণে মিলের গুদামে মজুদ অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেক সময়ই ক্রেতার অভাবে মাসের পর মাস ধরে অবিক্রিত চিনি নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতাসীনরা কেন এবং কোন যুক্তিতে অপরিশোধিত চিনি আমদানি বন্ধ করে সম্ভাবনাময় দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব চিনিকল শিল্পকে রক্ষা করছে না, যা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে এও সত্য, শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা কাজ করায় দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব¡ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যতদিন এ অবস্থা থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে পারবে না, ততদিন দেশীয় চিনি শিল্পকে রক্ষা করা যেমন সম্ভব হবে না, তেমনি সাধারণ ভোক্তাদেরকে বেশি মূল্যেই পরিশোধিত চিনি কিনে খেতে হবে। শুধু প্রাসঙ্গিকতার খাতিরেই রেমিট্যান্সের ওপর লিখতে গিয়ে অনেক কথাই লেখা হলো।

আগেই বলেছি, প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে। জুলাই হতে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে প্রবাসী আয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩৮৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। আর সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে ১১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন। এ পরিমাণ অর্থ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মুনসুর বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই রেমিটেন্স প্রবাহ ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। গত অর্থবছর অর্থনীতিতে ১৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হলেও রেমিটেন্স১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা সব মাসে সমান থাকে না। কোন মাসে বেশি হলেও পরের মাসে তা কমে যায়। যেমন চলতি অর্থবছরে জুলাইয়ে রেমিটেন্স ভাল প্রবৃদ্ধি হলেও আগস্ট মাসে তা কমে যায়। যা আবার সেপ্টেম্বর মাসে এসে ঘুরে দাঁড়ায়। রেমিটেন্স প্রবাহে কমবেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও টেকসই রেমিটেন্স প্রবাহ ধরে রাখতে হলে দক্ষ জনশক্তির কোন বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। আবার রেমিটেন্সের বদৌলতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাদি দক্ষ মানবশক্তি বিদেশে প্রেরণ করা সম্ভব হয়, তাহলে আমাদের প্রবাসী আয়ের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে। আমাদের ঘন জনসংখ্যার দেশের কর্মক্ষম হাতগুলোকে দক্ষ করে বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করতে পারলে প্রবাসী রেমিটেন্সের পরিমাণ যেমন একদিকে বেড়ে যাবে, অন্যদিকে আমাদের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে। এটাই নিখাদ সত্য।   
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮