বাঙালির স্বপ্নের মূল প্রেরণা বঙ্গবন্ধু

বাঙালির স্বপ্নের মূল প্রেরণা বঙ্গবন্ধু

মাশরাফী হিরো : ‘সবার বেলায় যেমন মানুষ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন আসে, গোসল করিয়ে দেয়, শেষবারের মত বিদায়ের পূর্বে মুখটা দেখে, অতি যতœসহকারে কাফন-দাফন করে আমাদের সে সৌভাগ্য হয়নি। মৃত্যুর পর আমরা দীর্ঘ ৬ বছর দেশে নিষিদ্ধ ছিলাম। জানি না আমাদের কি অন্যায় ছিলো?’ কথাগুলি বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে শেখ রেহানা এই বক্তব্য রেখেছিলেন। সমস্ত মিলনায়তন পিনপতন নীরবতা। শুধু তিনি বলছেন আর সবাই শুনছেন। কথাগুলি শুনতে শুনতেই পুরো মিলনায়তনে কান্নার রোল উঠেছিল। মঞ্চে তখন বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন আরও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সবাই তার বক্তব্য শুনে কাঁদছিলেন। কিন্তু যিনি বক্তব্য রাখছিলেন তিনি এক সেকেন্ডের জন্যও কাঁদেননি। বরং শেখ হাসিনা কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলেও তাকে অত্যন্ত দৃঢ় মনে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই কন্যাই প্রথম বৃটেনে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন।

তিনি কিছুটা অভিমানের সুরেই বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘আব্বার ¯েœহ-ভালোবাসা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। তিনি সারাজীবন শুধু মানুষের জন্যই কাজ করে গেছেন’। সন্তান হিসেবে বাবার ¯েœহ-ভালোবাসা পাবার যে অধিকার তা থেকে বঞ্চিত হয়ে অভিমানে তিনি কথাগুলি বলেছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আব্বা তো গণমানুষের নেতা ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। তিনি জনগণের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করতেন। আর এ কারণেই আম্মাসহ আমরা কখনও এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলিনি। বাবার মত তিনিও এখন জনগণের নেতা’। তাই হয়তো শেখ রেহানার এই কথার সম্পূরক উদ্ধৃতি তিনি দিয়েছিলেন। আসলে বঙ্গবন্ধু তার পরিবারকে সময় দিতে পারেননি, তার জন্য বঙ্গবন্ধু দায়ী নন। বরং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী বারবার তাকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। যার কারণে তিনি পরিবার থেকে বহু দূরে ছিলেন। তবে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর মূল ইচ্ছা ছিলো বঙ্গবন্ধুকে জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখার। তার শিকার তার পরিবারও হয়েছে। শেখ হাসিনা তখন কিছুটা বুঝতে শিখেছেন। শেখ কামাল তখন ছোট। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে আব্বা আব্বা বলে ডাকছেন।

 কিন্তু শেখ কামাল তাকে চিনতে পারছে না। তখন শেখ কামাল বলেছিল, ‘হাচু আপা, হাচু আপা আমি একটু তোমার আব্বাকে আব্বা বলে ডাকি’। সেই দিন সারাদিন শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর গলা ধরে ঘুমিয়েছিল। যার উদ্ধৃতি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে নিজেই করেছেন। জেলখানায় থাকার কারণে নিজের সন্তান বাবাকে চিনতে পারছে না, এ যে কত বড় বেদনার বিষয় তা সম্ভবত পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ভুলেই গিয়েছিল। অথবা এসব দুঃখ-বেদনা পিন্ডির প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছত না। শেখ হাসিনা যেমন শেখ রেহানার কথাটি শুধরে দিয়েছিলেন তেমনি বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনীও বঙ্গবন্ধুর সহকর্মিদের ভুল শুধরে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে একবার প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছিলো সরকার। রাজনৈতিক কিছু নেতাও তাতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে বাধ সেধেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি বলেছিলেন, প্যারোলে মুক্তি তোমার জন্য অসম্মানের। মুক্তি হলে জামিনেই মুক্তি হতে হবে। যেখানে স্বামীর মুক্তিই প্রত্যেক স্ত্রীর কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে সেখানে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী তা চান নি। এর সাথে যেমন বঙ্গবন্ধুর সম্মান জড়িত ছিল তেমনি নেতা হিসেবে বাংলাদেশের মান-সম্মানও জড়িত ছিল। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী চাননি তার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কাছে বাংলাদেশের মানুষ হেরে যাক। এখানেও শেখ হাসিনার মত তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মানুষগুলিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। হয়তো শেখ হাসিনার এ শেখা মায়ের কাছ থেকেই। তাদের এ কথার স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

 অন্ধকার সেলে তাকে রাখা হয়। সামরিক আদালতে তার ফাঁসির আদেশ হয়ে যায়। তার সেলের পাশেই কবর খোড়া হয়। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাদেরকে বলেছিলেন, আমাকে ফাঁসি দাও, আমার কোন দুঃখ নেই। আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না। বাংলার মানুষকে ছোট করে যাবো না। যদি পারো আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। এই ছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজও যিনি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সমস্ত বীরদের অনুপ্রেরণা। যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কারো কাছে জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মত হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। যা থেকে শিক্ষা নিয়েছিল আওয়ামী লীগের লক্ষ-লক্ষ নেতাকর্মি। মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিরা হাসিমুখে বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখেছিল। আজও বিশ্বের সমস্ত নির্যাতিত আর নিপীড়িত মানুষের মূর্ত প্রতীক হয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজও শত সহ¯্র শিশু তার কবিতা পড়ে, আজও হাজারও মা তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, আজও বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়- বিশ্ব সভ্যতায় বাংলাদেশ আর বাঙালিকে তুলে ধরতে চায়। আর এসব অমূল্য স্বপ্ন এবং ভাবনার মূল প্রেরণা বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি চিরকাল বীর হয়ে বেঁচে থাকবেন এই বাংলায় এবং বিশ্ব ইতিহাসে।
লেখক : উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫