বাংলাদেশ আমার অহংকার

বাংলাদেশ আমার অহংকার

মো. ওসমান গনি  : “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি-সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।” পাখি ডাকা, গাছ গাছালির ছায়া ঢাকা, নদ-নদী,পাহাড় জঙ্গলে ভরপুর আমাদেরই সোনার বাংলাদেশ। যা সত্যিই আমাদের কষ্টার্জিত বাংলাদেশের রূপের অন্ত নেই। এ দেশের প্রকৃতি যেমন নিত্য প্রফুল্ল, তেমনি চিরসৌন্দর্যময়ী। সোনার খনি না থাকলেও এদেশের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের পরতে পরতে সোনা ছড়িয়ে আছে। তাই তো বিশ্বকবির শ্রেষ্ঠ গানটি  জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে- “আমার  সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি.....।” বাংলাদেশ ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ। রূপসী বাংলার রূপের তুলনা বাস্তবিকই বিরল। ষড়ঋতুতে বাংলা যেন নানা রঙে নানারূপ ধারণ করে। পালা বদলের খেলায় বিচিত্র রূপ ও বেশভূষা নিয়ে আসে এই ছয়টি ঋতু। একটি আসে, একটি যায়, প্রকৃতির নতুন নতুন উপহার নানা রকম প্রভাব ফেলে মানুষের মনে। তাইতো কবির কণ্ঠে আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনি- “একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।/ফুলে ও ফসলে কাদামাটি জলে ঝলমল করে ধরণী।” বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও লীলাময় ঋতুচক্রের আবর্তে এ দেশের শস্য-শ্যামল প্রান্তর, ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগঞ্জ, নদীর কলতান, কোকিলের কুহুতান, ভ্রমরের গুঞ্জন, ভাটিয়ালী ও বাউল সুরের টান আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এদেশের সবুজ ঘেরা পাহাড়, নদী-নালা, সমুদ্র সৈকত ইত্যাদির মোহে মুগ্ধ হয়ে জনৈক বিদেশি পর্যটক মন্তব্য করেছেন এইরূপ- “ঞযবৎব ধৎব সধহু ফড়ড়ৎং ঃড় বহঃৎধহপব রঃ নঁঃ হড়হব ঃড় বীরঃ.” আমাদের জাতীয় পতাকার লাল সূর্য তেজোদীপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের রক্তস্নাত রক্তিমতার প্রতীক, গাঢ় সবুজ রঙ গ্রাম-বাংলার সবুজ সমারোহ থেকে সংগৃহীত। মা, মাটি ও মানুষ আমাদের সত্যিকারের গৌরব। যথার্থই শিল্পীর কণ্ঠে মানায়-
“আমারও দেশেরও মাটিরও গন্ধে ভরিয়াছে সারা মন,/শ্যামল কোমল পরশ ছড়ানো নেই কোন প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ গ্রামবহুল দেশ। এ দেশের প্রায় পঁচাত্তর ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। এক একটি গ্রাম যেন প্রকৃতির আর এক লীলা নিকেতন। এদেশের আবহাওয়া না শীত না গরম। পৃথিবীর কোন দেশই এমন মধুর নয়- তাই কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে দ্বিধা নেই- স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এদেশে একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আবহমান কাল থেকে চলে আসছে, তেমনি যুগযুগ ধরে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধদের বহু প্রাচীন নিদর্শন এদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। কবি সত্যি কথাই বলেছেন- “স্বার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে/স্বার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।”
মানুষের মহৎ গুণাবলীর অন্যতম হচ্ছে দেশকে ভালোবাসা। স্বদেশপ্রেমের আবেগ অন্তর্ভেদী ও স্বতোত্সারিত। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত জনগোষ্ঠী যে কোন দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে জনগণের দেশপ্রেমের তুলনা মন্ত্রশক্তির সাথে তুলনীয়। মানুষের ব্যক্তিসত্তার উৎকর্ষ এবং জাতীয় অগ্রগতিতে দেশপ্রেম অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশপ্রেম ঈমানেরও অঙ্গ। মায়ের বুকের মতই স্বদেশের মাটি মানুষকে টানে। মাতৃভাষার বাণী তার হৃদয়কে সুশীতল করে। বিদেশে অবস্থানকালে কিংবা দেশের দুর্দিনে তার প্রাণ ডুকরে উঠে, আবার সুদিনে আন্দোলিত হয় হৃদয়মন। বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগ নাড়া বিষয় বলে বিবেচিত হয়েছে দেশপ্রেম। কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাসে দেশপ্রেমের প্রেরণাটি সঞ্জিবনী সুধার মতই প্রবাহমান। বিশেষ করে বাংলা কবিতায় দেশ প্রেমের চেতনা অভিনব আবেগময়তায় বাণীবদ্ধ হয়েছে-
                “মিছা মণিমুক্তা হেম, স্বদেশের প্রিয় প্রেম/ তার চেয়ে রতœ আর নাই,/
                সুধাকরে কত সুধা, দূর করে তৃষা সুধা/
                                স্বদেশের শুভ সমাচার।”
আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। কিন্তু এ ভালোবাসা হওয়া উচিত অক্ষয়, অব্যয় ও চিরজাগ্রত। কেবলমাত্র শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা অন্যকোন বিশেষ দিবসেই যেন আমাদের ভালোবাসা সীমাবন্ধ না থাকে বরং প্রতিক্ষণেই যেন আমরা দেশকে ভালোবেসে বলতে পারি- “ঙ সু ষড়াব ও ষরাব ভড়ৎ ঃযবব!”
প্রতি মুহূর্তেই যেন আমরা আমাদের হৃদয়ে অনুভব করি লাল সবুজ বাংলাদেশের স্পন্দন। তবেই পরিস্ফুটিত হবে আমাদের দেশপ্রেমের দৃষ্টিনন্দন রূপ, তবেই প্রতিফলিত হবে দেশমাতৃকার জন্য যারা প্রাণ বিসর্জন করেছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আসুন যার যার অবস্থান থেকে সকলে মিলেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলি এবং দেশকে আমরা এভাবেই ভালোবাসি যেভাবে ভালোবাসা দরকার।

লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯