বস্ত্র খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র এখনই রুখে দিন

বস্ত্র খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র এখনই রুখে দিন

মীর আব্দুল আলীম: দেশীয় টেক্সটাইল এবং স্পিনিং খাত এখন ধ্বংসের মূখে। এ খাত নিয়ে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র আছে। আন্তর্জাতিক চালে আটকে যাচ্ছে এ শিল্প। গত কয়েক বছরে অসংখ্য টেক্সটাইল মিল (তাঁত) বন্ধ হয়ে গেছে। এখন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সুতা কলগুলো। যেগুলো চালু আছে উৎপাদিত সুতা বিক্রি হচ্ছে না। গোডাউনে সুতার পাহাড় জমছে কিন্তু সুতা তৈরির জন্য তুলা নেই। স্পিনিং মিলগুলোতে বর্তমানে আড়াই লাখ টন সুতা অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে বলে জানা যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এমন সংবাদ ছাপছে আমাদের পত্রিকাগুলো। আন্তর্জাতিক চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশে পুরো বস্ত্র খাতকে করায়ত্তে নিয়ে আসার জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তারা যেভাবে সুতা, বস্ত্র ও গার্মেন্টস খাতকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, তাতে আগামীতে ভিনদেশীদের একচেটিয়া ব্যবসার হাতে বাংলাদেশকে পুতুল হয়েই থাকেতে হবে। বিদেশী আগ্রাসনের ফলে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত ধ্বংস হয়ে পরনির্ভর হয়ে পড়বে। এদিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মিল মালিকরা এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত। ঋণ খেলাপি হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়েছে; অনেকটা আবার বন্ধ হয়ে গেছে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই। অন্যদিকে তুলার বাজার উর্ধ্বমুখী আর উৎপাদিত সুতার বাজার নিম্নমুখী। বেশি দামে আমদানিকৃত তুলা দিয়ে সুতা ও কাপড় তৈরি করে মিল মালিকরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। ক্রেতার অভাবে তাদের গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে লাখ লাখ টন সুতা। এভাবে মাসের পর মাস লোকসান দিয়ে এবং ব্যাংকের ঋণ ও সুদ গুণতে গিয়েই বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিল। আর দেশীয় সুতা ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পেও পড়তে শুরু করেছে নেতিবাচক প্রভাব।
বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কম দামের ভিনদেশী সুতা প্রবেশ করায় দেশীয় সুতার কারখানাগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশের সুতা কারখানার মালিকদের সার্ভিস চার্জ ও চক্রবৃদ্ধিসহ ব্যাংক ঋণের সুদের হার গুণতে হয় ২২ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত। যা বিশে^র অন্য কোথাও নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে করার আহবান জানিয়ে আসছেন। তিনি হয়তো ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য না হলে শিল্প টিকে থাকবে না। শিল্প টিকে না থাকলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে সে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পরবে। আরেকটা বিষয় আছে সেটা হলো এ খাতে অধিকাংশ রাষ্ট্র মিলগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে থাকে কিন্তু আমাদের সরকার পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় না। আমাদের স্পিনিং মিলগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলা কিনতে হয় চড়া দামে। তুলা ক্রয় বিক্রয়েও ঢুকে পড়েছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। শেয়ার বাজারের মত তুলার দাম বাড়িয়ে দিয়ে সটকে পড়েছে ঐ চক্রটি। কয়েক বছর আগে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ সেন্ট ছিল প্রতি পাউন্ড তুলা সেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে সেই তুলা উঠে আসে ২ ডলার ৫০ খেকে ৮০ সেন্টে। আবার বাড়তি দর তুলে দিয়েই সট্কে পড়ে প্রতারকরা। সেই তুলাই এখন নেমে আসে ১ ডলার ৫০ সেন্টে। ফলে ভোক্তা স্পিনিং মিলগুলো বিপাকে পড়ে। আন্তর্জাতিক এই চক্রটি বাজারে তুলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কাগজে কলমেই বাড়িয়ে দেয় তুলার দাম। বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভোক্তার কাঁধে লোকসানের বোঝা চাপিয়েই সট্কে পড়ে তারা।
এদিকে চড়া সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হওয়ায় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকটে বিপদে পড়েছেন স্পিনিং মিল মালিকরা। চাইলেই গ্যাস বিদ্যুৎ পায়না শিল্প মালিকরা। এদিকে ৭/৮ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠিত স্পিনিং মিল যেখানে ৪০ লাখ টাকা গ্যাস বিল দিতো সেখানে বর্তমানে তাদের সে তুলনায় উৎপাদন কমে গেলেও তাদেও গ্যাস বাবদ গুণতে হয় ৪ কোটি টাকা। ট্যাক্স, ভ্যাটও এখন আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি দিতে হচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন এখন কমেছে, সুতার দাম কমেছে কিন্তু গ্যাস বিদ্যুৎসহ সকল কিছুর দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তাহলে কি করে টিকে থাকবে এ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে এখন কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যেমন সুতা বিক্রি করতে হচ্ছে, তেমনি বিপুল পরিমাণ সুতা অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন রুগ্ন হয়ে বন্ধের অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে যেখানে ২ মাস আগেও ৫০ কাউন্টের সুতা বিক্রি হতো ২২০ টাকা তা এখন ১৭০ টাকায়ও বিক্রি করা যাচ্ছে না। ৫৯ কাউন্টের সুতা ২৪০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ২৪০ থেকে ২০০ টাকায়, ৮০ কাউন্টের সুতা ২৮০ টাকা থেকে এখন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। তাও আবার ক্রেতা মিলছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে স্পিনিং খাতের সব মিল অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর আগে খোদ বিটিএমএ নেতারা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের ২০টি বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপ বাংলাদেশের পোশাক খাত দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর দেশের একটি উচ্চ মহলও তাদের সহায়তা করছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ না দিয়ে বিদেশিদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। তারা বলেন, গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করার মতো অনেক উদ্যোক্তা এ দেশেই রয়েছে। এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো দরকার নেই। তারা শীঘ্রই সরকারকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে বিশ্ববাজার পর্যালোচনার মাধ্যমে তুলা ও সুতার দাম হঠাৎ ওঠানামার কারণ অনুসন্ধান ও এ সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন। পাশপাশি এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নগদ সহায়তার হার ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ ও ভারত থেকে আসা কম দামের সুতা ও ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপেরও দাবি জানান।
এখন স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতকে ধ্বংস করার জন্য নতুন করে ষড়যন্ত্র চলছে। আর এ খাত ধ্বংস হলে কয়েক কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে যাবে। টেক্সটাইল ও সুতা শিল্পে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও এ খাতের উদ্যোক্তারা আজ পথে বসার উপক্রম হয়েছে। এভাবে লোকসান দিতে হলে আগামী ২/৩ মাসের মধ্যেই সবগুলো সুতা মিল বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই ধ্বংস হবে গার্মেন্টস শিল্পও। আর সে সুযোগে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতের বাজার দখল করবে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ। এমন কঠিন সংকটে স্পিনিং মিলগুলো এর আগে কখনোই পড়েনি। এ সংকটের উত্তরণ না হলে এ শিল্পখাতটির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। এতে শুধু পথে বসবেন না। শত শত উদ্যোক্তা, লাখ লাখ শ্রমিকও কাজ হারিয়ে বেকার হবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংক, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলো। অর্থনীতি ও সমাজের স্থিতিশীলতা এতে বিনষ্ট হবে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন চলতি বছর থেকে তৈরি পোশাকের জন্য জিএসপির নতুন যে শর্ত দিয়েছে, তাতে স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে বিদেশী সুতা ও বস্ত্রের। পাশাপাশি দেশীয় সুতার বাজারে ভারতীয় আগ্রাসনে বিপর্যস্ত দেশীয় স্পিনিং শিল্প।এ দিকে ইইউতে জিএসপির নতুন শর্তে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্স (জিএসপি) সুবিধার শর্ত পরিবর্তন করেছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের স্পিনিংসহ টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি সুবিধা পেতে পণ্য রূপান্তরের শর্ত দু’ধাপ থেকে এক ধাপে নামিয়ে এনেছে। এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা দেশে উৎপাদিত কাপড় ও সুতা ব্যবহার করত। তাদের সুতার চাহিদার বেশির ভাগই পূরণ করত দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো। কিন্তু জিএসপির শর্ত পরিবর্তন করায় এখন বিদেশ থেকে সুতা ও কাপড় আমদানি করে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। শুধু সেলাই করেই পোশাক ইউরোপে শুল্কমুক্তভাবে রফতানি করতে পারছে তারা। পোশাক প্রস্তুতকারকরা কাপড় ও সুতা ব্যাপকভাবে আমদানি করছে। ইতিমধ্যেই বিদেশী সুতা ও কাপড়ে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। ফলে ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়েছে দেশের সুতা তৈরির মিলগুলো। সুতার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দেশে বিপুল পরিমাণ সুতা অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মিল মালিকরা বাধ্য হয়েই উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে স্টক লটের সুতা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বেশির ভাগ স্পিনিং মিল মালিক উচ্চমূল্যে তুলা রফতানি করে, উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে সুতা তৈরি করে বসে আছেন, কিন্তু ক্রেতা পাচ্ছেন না। ফলে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সুতার মিল মালিকদের। তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ভেস্তে যাচ্ছে। চোখে সর্ষেফুল দেখছেন তারা।
সুতাশিল্পে বিদ্যমান দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা চলতে থাকলে মিলগুলোর সব সুতা বিক্রি করতে না পেরে অর্থ সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে। আর এগুলো একবার বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প বন্ধ হয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পুরো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পে ধস নামবে। সংকটের সুযোগে তখন ভারতীয় সুতা বিক্রেতারা আরও বেশি দামে বাংলাদেশে সুতা বিক্রি করবেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা শ্রীলংকা, মরিসাসের মতো হবে।
আমরা মনে করি, স্পিনিং তথা গোটা বস্ত্রখাতে চলমান সংকট সমাধানের উপায় হচ্ছে, (১) বস্ত্র মিলগুলোর জন্য অন্তত ২০ শতাংশ হারে ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদান, (২) গোটা বস্ত্র খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭/৮ শতাংশে নিয়ে আসা, (৩) দেশীয় সুতা ও কাপড় প্রস্তুতকারকদের ১৫-২০ শতাংশ হারে ক্যাশ ইনসেনটিভ দিতে হবে। সুতা-বস্ত্রশিল্পকে বাঁচাতে হলে ও ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রক্ষা করতে এই উদ্যোগ নিতেই  হবে সরকারকে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটেরও সমাধান করতে হবে। আমাদেরকে শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণের সাথে সাথে শিল্প-আগ্রাসনও প্রতিরোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব না দিলে বস্ত্র শিল্প বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক  
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  

০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮