বন্ধ হোক মেধা ধ্বংসের পাঁয়তারা

বন্ধ হোক মেধা ধ্বংসের পাঁয়তারা

রায়হান আহমেদ তপাদার :প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়। তবে ইদানীং এই ফাঁসের ঘটনাটি বেড়েছে। পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে এক অনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে কতিপয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী। যাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে আগামী প্রজন্ম। সম্ভবত, ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় দেশে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। তখন ওই ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। আর গত চার-পাঁচ বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি একেবারে সাধারণ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন, পরীক্ষা হচ্ছে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ধারণা সাধারণ মানুষদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর তার চেয়ে হাজার হাজার গুণে বেশি ক্ষতিকর- যে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তার জন্য। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং ধারাবাহিক ঘটনা বলা যায়। গত ৫ আগস্ট প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে জানায়, ২০১২-২০১৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় মোট ৬৩টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিআইবির ওই প্রতিবেদনে প্রশ্নপত্র ফাঁসে কারা জড়িত সে ব্যাপারে জানায়-গবেষণায় প্রশ্ন ফাঁস ও ফাঁসকৃত প্রশ্ন ছড়ানোর এবং বাজারজাতকরণে সম্ভাব্য অংশীজনের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত এক ধরনের সিন্ডিকেটের উদ্ভব ঘটেছে- যারা অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ফাঁস করছে। মূলত প্রভাবশালীদের একাংশের নেতাকর্মি, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কোচিং সেন্টার মিলে একটি সিন্ডিকেট প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সক্রিয় এমন তথ্য পাওয়া যায়। যদিও টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী ওই প্রতিবেদনকে অসত্য এবং ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।  

প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে মেধার অবমূল্যায়নই হয় না, লেখাপড়ায় মনোনিবেশ হারিয়ে শিক্ষার্থীরা শিশুকাল থেকেই নীতিবর্জিত মানসিকতা লালন করতে শুরু করে। যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। সুনির্দিষ্ট চক্রান্তের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে রাখার এই পাঁয়তারায় কতিপয় ব্যক্তি সফলও হয়েছে বলা যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে তেমন কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না। এতবড় একটি জাতীয় সমস্যা নিয়ে সম্মিলিতভাবে কেউ কথা বলছে না। বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলে কোনো লাভ হবে না। যে শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখল সব সময় পেছনের সিটে বসা তার সহপাঠী তার চেয়ে ভাল উত্তর লিখছে। ভাল নম্বর পাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই তার ভেতরে এর প্রতিক্রিয়া কাজ করবে এবং  এই প্রতিক্রিয়া যে পজেটিভ হবে না, তা চোখ বুজেই বলে দেওয়া যায়। আর এর মাধ্যমে একটা ধারণা তাদের ভেতর পুতে দেওয়া হচ্ছে। যারা অনৈতিক তারাই ভাল থাকে। পড়াশোনা করে লাভ নেই। পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়েই ভাল রেজাল্ট করা যায়। এই শিক্ষার্থীদের হাতেই অর্পিত হবে দেশের ভবিষ্যত। এই রকম অনৈতিকতার ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম যে দেশের জন্য কতটা ইতিবাচক তা এখন থেকেই ভাবা দরকার। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া গেলেই পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন। ২৫ জানুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সভার শুরুতেই এ কথা জানান তিনি। প্রয়োজনে একই পরীক্ষা। ১০ বার নিয়ে ফল প্রকাশের কথাও বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের পর পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? অর্থের মোহে একদল মানুষ প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে, এর বিপরীতে যদি লাখো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে আমরা কি শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করতে পারি? তবে কেন পরীক্ষা বাতিল করে তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে? শাস্তি যদি দিতে হয়, তবে দোষীদের দিতে হবে। দোষীদের শাস্তির আওতায় না এনে পরীক্ষা বাতিল করা হলে তা রীতিমতো অন্যায় করা হবে। প্রশ্ন ফাঁস রোধের ব্যর্থতা কার? ব্যর্থতা যারই হোক দায়ভার কিন্তু সংশ্লিষ্ট সবার। সুতরাং সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এর দায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।

আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হলে প্রশ্ন ফাঁস অবশ্যই রোধ হবে। আমরা ইতিমধ্যে প্রশ্ন ফাঁসকারী অনেককেই ধরা পড়তে শুনেছি বা দেখেছি। পত্রিকা বা টেলিভিশনে তাদের চেহারা স্পষ্ট দেখানো হয় না। পরবর্তী সময়ে তাদের কী শাস্তি হল, সে খবরও গণমাধ্যমে আসছে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ সহ অর্থদে র বিধান রয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর ৪ নম্বর ধারায় এ শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এদের সমূলে বিনাশ করতে হবে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরা বলছেন-পরীক্ষার যে প্রশ্নপত্রটি তারা অনলাইনে পেয়েছেন, তার সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নের হুবহু মিল থাকে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরিশ্রম করে পড়ালেখা করতে চায় না। তাদের ভাবনায় থাকে-প্রশ্ন তো আগের রাতে পেয়েই যাব।

বিদ্যা যে কেনার মতো বস্তু নয়, হীরা, সোনা, জামাকাপড়, খাট-পালঙ্কের তো বস্তু নয়, এই বাস্তব সত্যটি অনুধাবনের যোগ্যতা আমরা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছি। যে দেশে সার্টিফিকেট কিনতে পাওয়া যায় (কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে শোনা যায়) সে দেশে জ্ঞান কী ভাতের সঙ্গে খাবে নাকি লোকে? ব্যক্তি সার্টিফিকেট কিনতে পারে, চাকরি কিনতে পরে, পারমিট লাইসেন্স কিনতে পারে, আলু-পটল সবই কিনতে পারে, তা কিনুক তার তো জ্ঞানের প্রয়োজন নেই কিন্তু জাতির কি জ্ঞানী, শিক্ষিত নাগরিকের ও জ্ঞানের প্রয়োজন নেই? আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে লড়ার জন্য কী আমরা বিদেশ থেকে চিনির বস্তার মতো জ্ঞানী লোকের জন্য এলসি খুলব? ভাবুন না একবার! ভাবতে গেলেই দেখবেন যে, পাঠদান চলছে দেশে, তাতে সর্বনাশ হচ্ছে গোটা জাতিরÑ মেধা ধ্বংসের এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে একটি মহল। তা কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবুঝ শিক্ষার্থী যদি জ্ঞান অর্জন বাদ দিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন যেখানে সেখানে নোটবই, ভ্রান্তি পরিপূর্ণ শিট থেকে অনায়াসে পাশের প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হতে থাকে সে মহাসর্বনাশ ঠেকা দেবে কে? এবার এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণার পাশাপাশি ১১ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করার পর প্রথম দিন বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষার ২৪ মিনিট আগে এবং বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার ৪৫ মিনিট আগে এসব প্রশ্ন ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফাঁসকৃত প্রশ্ন কিছু শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তারা ভালো পরীক্ষা দিতে সক্ষম হয়। আর যারা সারা বছরে লেখাপড়া করেও তাদের চেয়ে ভালো করতে পারে না, তারা ভোগে হতাশায়। এমন বৈষম্যের কারণে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় মনোযোগ কমিয়ে এখন শুধু ফেসবুকে প্রশ্ন খুঁজে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।  প্রতিবছর এসব খাতে খরচ হয় অজস্র কোটি টাকা। তবে কাজের কাজ কী হচ্ছে, তার খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আইন করে কখনো কখনো নোট বা গাইড বই এবং কোচিং বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এরই মাঝে একশ্রেণির লোভী শিক্ষক বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে ফেরেন। এর মাধ্যমে যে তারা জাতির অবিনাশী ধ্বংস বয়ে আনছেন, তাদের কে বোঝাবে? তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একশ্রেণির অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। পাশের হার বৃদ্ধি যে শিক্ষার মান বৃদ্ধি নয়; শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির অর্থ যে জ্ঞানের পরিধি, পরিমাণ বৃদ্ধি, মূর্খত্ব দূর করা তা যেন সংশ্লিষ্ট সবাই ভুলে গেছেন।

এমনভাবে যদি আগামী দিনের আশার আলো ধ্বংস হতে থাকে, তবে একদিন হয়তো শুধু সনদধারী মানুষ পাওয়া যাবে; কিন্তু হারিয়ে যাবে শিক্ষিত ও মেধাবী বিবেক। যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বন্ধ না করা যায়, তবে পরীক্ষার আয়োজন করে লাভ কী? ঘোষণা দিয়েও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অর্ডারে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়া উদ্দিন বাবলু। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন মহামারী রূপ নিয়েছে। তাই তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে বলেন, নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করতে। তা না হলে তাকে বরখাস্ত করে নতুন মন্ত্রী নিয়োগ দিতে বলেছেন। তবে শুধু কাউকে বরখাস্ত করে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব নয়, এর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সকাল ৯টায় প্রশ্নফাঁস হয়; সেহেতু এর অর্থ হলো- পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত। এ ধরনের অপরাধ রোধ করা মন্ত্রীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। তার জন্য বিটিআরসি এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণ দরকার। ফাঁসকারীদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সাহায্য করা প্রয়োজন। তা না হলে হারিয়ে যাবে প্রকৃত শিক্ষার আলো আমাদের তরুণদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হবে।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]