বজ্রপাতের সময় যা করণীয়

বজ্রপাতের সময় যা করণীয়

রবিউল ইসলাম রবীন : ভরা বর্ষা মৌসুমের সময়। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও সময় এখন। তাই পূর্ব আকাশে মেঘ দেখা দিলে কৃষকের মনে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এ ভয় বজ্রপাতের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫/৬ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছে এ কারণে। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে তাই জনমনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংবাদপত্রে, টিভিতে এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি ও গবেষণা চলছে। বাংলাদেশে বজ্রপাতের মৃত্যুর তথ্য বা পরিসংখ্যান আছে ২০১০ সাল থেকে। সেখানে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সারা দেশে ৯৯ জনের মৃত্যুর খবর জানা যায়। তারপর থেকেই বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যা। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মারা যায় ৩৫১ জন আর ২০১৭ সালে মারা যায় ২৬২ জন মানুষ।

কেন এত বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু? বাংলাদেশে যখন বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেড়েছে, সেখানে সারা বিশ্বে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। পরিসংখ্যান তাই বলছে। আমেরিকাতে বজ্রপাতে আগে যেখানে ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু হত, সেখানে প্রতি বছর এখন বজ্রপাতে মারা যায় ৪০ জনের মতো। গবেষকরা গবেষণা করে বলছে এর কারণ নগরায়ণ। আগের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন মানুষ সেখানে নগরে থাকছে। বিদ্যুতের লম্বা খুঁটি মানুষের উচ্চতার অনেক ওপরে থাকায় আর খুঁটির সঙ্গে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবনহানি রোধ করে। যদিও ক্ষয়ক্ষতি হয় বৈদুতিক যন্ত্রপাতির। আমরা বৃক্ষ নিধন করেছি, করছি ইচ্ছেমতো। আবার বেশিরভাগ প্রাচীন বৃক্ষ নিধন করছি। অরক্ষিত করছি প্রকৃতিকে। যে পরিমাণ গাছ আমরা কাটি সেই পরিমাণ কি রোপণ করি? করিনা। বিশেষ করে তালগাছ, খেজুর গাছ মানুষকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করেছে প্রাচীনকাল থেকে। এখনো পুরোনো আমলের জমিদার বাড়ির ছাদে, মন্দিরের চুড়ায় কিংবা মসজিদের মিনারে যে ত্রিশুল দিয়ে আর্থিং করা দেখি আমরা, সেটাও বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য তৈরী করা হতো বলে শোনা যায়।

বজ্রপাত নিয়ে তাই বিস্তর আলোচনা এখন সর্বত্র। জনমনেও আতঙ্ক। কিন্তু বজ্রপাতের কারণ এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় ব্যাপারে অনেকটায় অজ্ঞ আমজনতা। জলবায়ুজীবীরা কিন্তু বজ্রপাতের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের একটা সম্পর্কের হিসাব ইতিমধ্যে বের করে ফেলেছেন। নাসার গোদার্ড ইনস্টিটিউট অব স্পেস ষ্টাডিজের (জিআইএসএস) কলিন প্রাইস আর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড রিল্ড তাঁদের প্রকাশিত নিবন্ধে (পসিবল ইমপ্লিকেশন অব গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অন গ্লোবাল লাইটেনিক) জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বজ্রপাত আর দাবানল বা ফরেষ্ট ফায়ারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। তাঁদের পরীক্ষাগারের তত্ত্ব অনুযায়ী পরিবেশে এখন যে পরিমাণ কার্বন আছে, তা যদি কোনভাবে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে বজ্রপাতের পরিমাণ ৩২ ভাগ বেড়ে যাবে।

বজ্রপাতে মৃতদের মধ্যে নারী,শিশু ও প্রবীণের তুলনায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেশি। পৃথিবীতে তাবৎ দুর্যোগে যখন প্রবীণ, নারী ও শিশুদের লাশের মিছিল সবচেয়ে লম্বা থাকে, সেখানে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় পরিবারের সবচেয়ে কর্মঠ ব্যক্তিকে। ফলে সেই পরিবার হয়ে পড়ে নিঃস্ব, অসহায়। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে নিহত ৩৫১ জনের মধ্যে ২২০ জনই ছিল পরিবারের একমাত্র রোজগারের মানুষ আর ২০১৭ সালে নিহত ২৬২ জনের মধ্যে ২০০ জনই ছিলেন পরিবারের  একমাত্র ভরসা। বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আমেরিকাতে সবচেয়ে কম। গত বছর সে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। সারা বছরে মাত্র ১৬ জন।

 ফাঁকা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা বা নৌকায় করে যাতায়াতের সময় বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে বেশির ভাগ মানুষ মারা যায় বলে মৃতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি।
সরকারি তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ হাওর এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। আর গত বছর ৫৭ শতাংশ মানুষ মারা যান মাঠে অথবা জলাধারে কাজ করার সময়। এসব অঞ্চলে মুঠোফোনের টাওয়ার লাইটেনিং এরষ্টোর লাগিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো যায়। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো তাদের করপোরেট দায়িত্বের অংশ হিসাবে কাজটি করতে পারে। আর সরকার পারে আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা এবং নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে। সাবধান হওয়ার নিয়ম জানাতে পারে, প্রচার করতে পারে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-কলেজ শিক্ষক
০১৭২৫-০৪৫১০৫