বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: আলোকিত সংস্কৃতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: আলোকিত সংস্কৃতি

তৌফিক হাসান ময়না:১৭ মার্চ ১৯২০। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন গোপালগঞ্জের একটি গ্রামে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে দিন জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, সেদিন সারা দেশে এবং বিশে^ অনেক ঘটনাই সংঘটিত হয়েছিল। ১৯২০ সালে খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক স্থানে  ব্রিটিশরা এ দেশের মানুষদের নির্মম ভাবে হত্যা করে। প্রতিবাদে গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯২০ সালেই ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। প্রবাসে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি গঠিত হয় এ বছরেই। ১৯২০ সালে সারা বিশে^ বাণিজ্যিকভাবে বেতার যন্ত্র উৎপাদন শুরু হয়। এ বছরের মে মাসে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ড এবং অক্টোবরে আমেরিকা গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয় এই বছরেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশের দেওয়া স্যার খেতাব বর্জন করেন। এই বছরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বয়স হয়েছিল ২১ বছর। তরুণ, টগবগে। লিখে যাচ্ছিলেন ইংরেজ বিরোধী কবিতা ও গান।
এমনি এক ঘটনাবহুল সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেড়ে উঠেছিলেন ধীরে ধীরে। লড়াই, সংগ্রাম আর আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির মহানায়ক। দুঃসাহসী দুর্জয় প্রেরণার মহত্তম উৎস হলেন তিনি। সকল জুলুম, অত্যাচার আর দু:শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার অভিযাত্রী হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মানুষের ভালোবাসায় হলেন বঙ্গবন্ধু, স্বীকৃতি পেলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মানুষের কর্মজীবন, রাজনীতি জীবন নিয়ে অনেক ইতিহাস নির্মিত হয়েছে কিন্তু তাঁর সংস্কৃতি জীবন নিয়ে লেখা নেই বললেই চলে। বঙ্গবন্ধুর বর্ণিল সংগ্রামী জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে উজ্জীবিত সংস্কৃতির ইতিহাস। আজকের প্রবন্ধে মহান নেতার সেই সমৃদ্ধ আখ্যান তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি থাকলে সংশোধনী করার বিনীত অনুরোধ করছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসের  মহানায়ক। অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির সম্মিলিত চেতনায় জাতীয়তাবোধ সঞ্চারে তিনি পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। তিনিই বাঙালির শ্রেষ্ঠতম জাতীয়তাবাদী নেতা। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা শোষণ মুক্তির আকাক্সক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। আর স্বপ্নকে তিনি সঞ্চারিত করে  দিয়েছেন বাঙালির চেতনায়। লড়াই, সংগ্রাম, জেল জুলুম আর প্রতিবাদী সাহসী যোদ্ধা তিনি। এর মধ্যে দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির    
অবিসংবাদিত নেতা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিচরিত্র একটি অখন্ড সংগ্রামের ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত। তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়। বাংলাদেশের ভাষা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁর সাধনার মধ্য দিয়েই ভাষা-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক রূদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পূর্ণাঙ্গ রূপ সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন হাজার বছরের চর্চিত শিল্পরীতির আলোকিত সংস্কৃতি যোদ্ধা। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণই বলে দেয়, তিনি কতো উচ্চমানের সংস্কৃতিজন। ভাষণে তিনি বলেছেন, “যারা সাহিত্য সংস্কৃতির সাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করেছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাঁদের দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হতে হবে। দেশের জনগণের চিন্তা-ভাবনা, আনন্দ-বেদনা ও সামগ্রিক তথ্যে তাঁদের জীবনপ্রবাহ আমাদের সাহিত্যে ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এ দেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো দিন কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না।”
প্রকৃত সাহিত্য, সংস্কৃতির আন্দোলন কার ওপর দাঁড়াবে তাঁর এই কথামালার মধ্যে দিয়ে ওঠে এসেছে। তিনি পথ দেখিয়েছেন আমাদের, দেখিয়েছেন জনগণের সংস্কৃতির মূল উৎস।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন যেমন রাজনৈতিক মহানায়ক, তেমনি ছিলেন উজ্জীবিত সংস্কৃতিজন। তাঁর পুরো পরিবারকে তিনি সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়াশোনার সময়ই তিনি খেলাধূলার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৪০ সালে কিশোর বয়সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফুটবল খেলায় দারুণ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি গান  শুনতেন, কখনও কখনো গেয়ে ওঠতেন ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকায় মাথা।” রবীন্দ্র সংগীত তাঁর খুব প্রাণের ছিল। সুযোগ পেলেই তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান শোনাতেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি তাঁর সংগ্রামী জীবনের উৎস মনে করতেন। কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিবাদী কবিতা তাঁর জীবনের লড়াই সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুকে দারুণ আলোড়িত করেছিল। তাই তো তিনি স্বাধীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েই প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে নজরুলকে তার জন্মবার্ষিকীর শুভ লগ্নকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় ২৪ মে ১৯৭২, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৯ কলকাতা থেকে অসুস্থ কবিকে ঢাকায় এনেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে নজরুলকে ডি. লিট ডিগ্রী প্রদান করা হয়। সময় পেলেই তার পাশে বসেছেন, মাথায় হাত দিয়ে কতো কথা বলেছেন। নির্বাক শুধু তাঁর দিকে চেয়ে থেকেছেন। বারে বারে বিদ্রোহীর ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠতো, হয়তো বঙ্গবন্ধুকে চিনতে পেরেছিলেন, শত কাজের ফাঁকে বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহী কবির সব সময় খোঁজ খবর নিতেন। তিনি বুঝতেন এই নজরুল স্বাধীনতার মূল উৎস, বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ তার সাহস।
বঙ্গবন্ধু তার রাজনীতির জীবনে সার্Ÿক্ষণিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে রাখতেন। পরিবারের সকল সদস্যদের এ বিষয়ে সর্বদা উৎসাহিত করতেন। বলতেন শুধু রাজনীতি দীক্ষা লাভ করে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়া যায় না। সংস্কৃতি হলো আমাদের শিকড়, একটি গাছ যেমন তার শিকড়ের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ তেমনি মাটির নিচে মূল শিকড় গ্রোথিত করে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন ঝড় ঝঞ্ঝা তাঁকে উপড়ে ফেলতে পারে না।
১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা এ.  কে. ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলে শেখ মুজিব ব্যতিক্রমী তরুণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পেয়েও তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র বানানোর জন্য এফ ডি সি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় অনেকে এর বিরোধীতা করেছিলেন, বলেছিলেন এ দেশের আবহাওয়া ফিল্ম তৈরি করার উপযুক্ত নয়। শেখ মুজিব এ দেশের সংস্কৃতিকে গতিশীল করার জন্য এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময়ে দেশের এফ ডি সি থেকে ‘জাগ হুয়া সাবেরা’, মুখ ও মুখোশ (দেশের প্রথম ছবি)’, ‘কাঁচের দেওয়াল’, ‘সুতরাং’-সহ উল্লেখযোগ্য বহু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিল। দেশ এবং দেশের বাইরে প্রশংসিত হয়েছিল।
১৯৬১ সালে ছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী। পাকিস্তানের সামরিক শাসকের প্রতিরোধ উপেক্ষা করে বাঙালিরা রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করে। এর পিছনে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরই প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন “দেউলিয়া সরকার আমাদের রবীন্দ্রনাাথের লেখা পাঠ নিষিদ্ধ করে  দিয়েছে। তিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতায় লিখে তিনি বিশ^ কবি হয়েছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানিনা। আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বোই, আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাইবোই এবং রবীন্দ্র সংগীত এদেশে গীত হবেই।” বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এইভাবেই সম্পূর্ণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু একজন ভালো লেখকও ছিলেন। ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দেশের অবস্থা সহ নানান বিষয়ে লেখা শুরু করেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। জেল জুলুম, নিগ্রহ-নিপীড়ন যাঁকে সদা তাড়া করে  ফিরেছে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে উৎসর্গীকৃত প্রাণ, সদাব্যস্ত বঙ্গবন্ধু যে লেখায় হাত দিয়েছিলেন এবং কিছুটা লিখেছিলেনও এই বইটি মহাকাল গ্রন্থ’র কথা মনে করিয়ে দেয়। এই লেখায় বঙ্গবন্ধু ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনী লিখেছেন। তবে অনুপুঙ্খ বর্ণিল বর্ণনায় তিনি লিখেছেন বংশ পরিচয় জন্ম শৈশব, স্কুল ও কলেজের শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, মুসলীম লীগের রাজনীতি ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানী সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি সর্বোপরি সহধর্মিনীর কথা, যিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সব দুঃসময়ে অবিচলভাবে পাশে  ছিলেন। তাঁর এই লেখা সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সমকালীন বৃহত্তর জীবন ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার প্রেক্ষাপটে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একটি অমূল্য মহাকাব্যিক গ্রন্থ।
জাতির পিতার “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বিশে^র আত্মজীবনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। মাত্র তিনশত ত্রিশ পৃষ্ঠায় লিখিত এই গ্রন্থে আছে, বর্ণিল কথামালায় সাহিত্য গুণসমৃদ্ধ। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনী তথা তৎকালের ইতিহাস রচনা করে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বইটি নিয়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বললেন, “এটি ইতিহাস সংবলিত মানবিক দলিল”। বঙ্গবন্ধু  ছিলেন লোকধর্মসিক্ত লোকদর্শনের জীবনমুখী চিন্তা আদর্শের প্রতীক। তিনি কিংবদন্তির লোক নায়ক, অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির ত্রাতা। বাংলা হারকিউলিস, প্রমিথিউস। ১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে সর্বপ্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করেন, বিকশিত করেন বাঙালি সংস্কৃতিকে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার জন্য উৎসাহিত করতেন।  তিনি তাঁর বড় ছেলে শেখ কামালকে ছায়ানটে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। শেখ কামালকে শাস্ত্রীয় সংগীতে চর্চা করার জন্য ওস্তাদও রেখে দিয়েছিলেন। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ ধানমন্ডির বাড়ীতে তাঁকে তালিম দিতেন।  শেখ কামাল পিয়ানোও বাজাতেন। বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়ীর তিন তলায় ছিল সংগীতের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সমাহার। বঙ্গবন্ধু সময় পেলেই বসে যেতেন গান শুনতে। ছোট ছেলে জামালকেও তিনি সংগীতের সাথে জড়িত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু শেখ জামাল এ বিষয়ী তেমন মনোযোগী ছিল না। দুই মেয়ে শেখ রেহেনা ও শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে গানের আসরে বসাতেন। কোরাস গান গাইতেন। শেখ কামালের আর একটা শখ ছিল ক্রিকেট খেলার। সময় পেলেই তিনি ছুটে যেতেন মাঠে। এ নিয়ে ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ বঙ্গবন্ধুকে বহু অভিযোগ করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্ব¯েœহে  হেসে বলতেন, থাক না ওস্তাদ-দুটোই চলুক। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর উৎসাহে আবাহনী ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেখ কামালের আর একটি গুণ ছিল তিনি ভালো অভিনয় করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে এ ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমিতে মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন শেখ কামাল। সেদিনের অভিনয় দেখে বঙ্গবন্ধু কামালকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, তুই তো অলরাউন্ডার।
বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণ যা ছিল বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের দলিল বা সনদ,  আন্তর্জাতিকভাবেও পেয়েছিল স্বীকৃতি। বিশ^ তাঁকে বললো রাজনীতির কবি, ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিটি পঙক্তি কাব্যিক, মহাকাব্যিক কালোত্তীর্ণ বর্ণিল সংস্কৃতির সংলাপ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য দেশের সকল চিত্র পরিচালক,  অভিনেতাদের প্রতি আহ্বান করেছিলেন। ঐ সময়ে মহিলা সমিতিতে গ্রুপ থিয়েটার ভুক্ত একটি নাট্যদলের নাট্য উৎসব উদ্বোধন করতে গেলে নাট্যকর্মিরা তার কাছে সুস্থ নাট্য আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য ও বেতার মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীকে ডেকে নাটকের টিকিটের ওপর প্রমোদকর বাতিল করেন। ব্রিটিশ আমলের কালো আইন নাটকের সেন্সর প্রথা বাতিলের আদেশ দেন। তিনি নাট্যকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভালো আধুনিক মঞ্চ করার কথা ঘোষণা করেন। শিল্প চর্চার জন্য দেশে শিল্পকলা একাডেমী গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন।
বঙ্গবন্ধু শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। বলতেন, এরাই আমাদের আগামী বাংলাদেশ। শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘর সম্মেলনে সারাদিন শিশুদের নিয়ে আনন্দ করেছেন। তাদের নাচ, গান, কবিতা শুনেছেন, পুরস্কৃত করেছেন। ১৯৭২ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশুদের বঙ্গভবনে এনে সারাদিন  শিশুকিশোরদের সাথে হৈ হুল্লোর করে কাটিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে ভারতের প্রখ্যাত নাট্যদল বহুরূপী নাট্যদলকে এদেশে নিয়ে আসার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু দারুন সহযোগিতা এবং উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বহুরূপী ‘চাকভাঙ্গা মধু’ নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। ভারত থেকে এসেছিলেন বিশিষ্ট জাদুঘর জুনিয়র পিসি সরকার। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ভারতের সংস্কৃতি আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে এ জনপদের সুস্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বন্ধু দেশ তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সাথেও ছিল সাংস্কৃতিক বর্ণিল সম্পর্ক।
শেখ রেহেনা, শেখ হাসিনাকেও তিনি পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি পরিবেশে বড় করেছেন। বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, হাজার বছরের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এর ইতিহাস তুলে ধরেছেন তাঁদের সামনে। মেরুদন্ডহীন আপসকামী রাজনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে প্রাণবন্ত ও প্রাণদায়ী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর উদাহরণ তো দেখছি আমাদের সামনে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই দীক্ষার মন্ত্রে বলীয়ান হয়ে বাংলাদেশকে বদলে  দিয়েছে নতুন দিগন্তে। সারা বিশ^ অবাক চোখে দেখছে সাহসী বাংলাদেশকে। সৃষ্টির ভিতর সৃষ্টির কারিগর তিনি। বঙ্গবন্ধু যে সংস্কৃতির উষ্ণতা ও বিদ্রোহের উত্তাপ দিয়ে গেছেন, তার উষ্ণতায় এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনা।
বিশ^ায়ন এবং বাজার অর্থনীতির মোড়কে নয়া সা¤্রাজ্যবাদ প্রায় পুরো বিশ^কে গ্রাস করছে। প্রত্যক্ষ আগ্রাসনের চেয়ে ভয়াবহ সাংস্কৃতিক অগ্রাসনের মধ্যে দিয়ে তাবৎ বিশ^কে করে  ফেলেছে নয়া উপনিবেশ। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সিনথেটিক কালচার বা কৃত্রিম সংস্কৃতি ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো গ্রাস করেছে পৃথিবীর প্রায় সব জনগোষ্ঠী, জাতি ও রাষ্ট্রকে। বিভ্রান্ত হতচকিত ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতিগুলো। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পৃথিবীর সব জাতির মানুষ এ আগ্রাসন থেকে মুক্তি চায়। চায় নিজস্ব পরিচয়ে বাঁচতে। আর সেই বাঁচার শক্তি হচ্ছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তাই আমাদের এই জনপদে সুস্থ রাজনীতির পাশাপাশি সুস্থ সাংস্কৃতিক লড়াই প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এ লড়াইটা আরো গতিবেগ পেত। আশা রাখি, স্বপ্ন দেখি- হয়তো আমরা এই প্রজন্ম অথবা ভাবীকালের কোন এক তরুণের মাঝে দেখতে পাবো নতুন এক বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির সংস্কৃতির যে বীজ বপন করে  গেছেন এই মৃত্তিকায়, শেখ হাসিনা তার সোনালী ফসলে ভরে তুলুক দেশের সকল আঙ্গিনা।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক এ জনপদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির।