বঙ্গবন্ধু এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য

বঙ্গবন্ধু এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য

মোহাম্মদ নজাবত আলী : আগস্ট মাস শোকের মাস। ১৫ আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদত বার্ষিকী। পচাঁত্তরের ১৫ই আগস্ট কতগুলো বিপথগামী সামরিক অফিসার তাঁর ধানমন্ডির ৩২নং বাড়ি আক্রমণ করে বঙ্গবন্ধু সহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক মহাকলঙ্ক। যিদি আঁধারে দিয়েছেন আলো তাঁকেই হত্যা করে  ঘাতকরা। অমানিশার অন্ধকারে ঠেলে দিলো গোটা দেশ। তাঁর অপমৃত্যু জাতির করুণ ট্র্যাজেডি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ২৩বছরে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠির অত্যাচার, নির্যাতন ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু সাধারণ জনগণকে নিয়ে রুখে দাঁড়ান। বাঙালি হাজার বছর পরাধিন ছিল। বাঙালির হাজার বছরের দুঃখ বেদনা অত্যাচার, নির্যাতন, আশা আকাংখা ও আবহমান বাঙলার সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে বঙ্গবন্ধু নিজের চেতনায় আত্মস্থ করেছেন। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি জাতির সবচাইতে বড় আকাংখা স্বাধীনতার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিত, শান্তিকামী মানুষের সার্থক প্রতিনিধি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রবক্তা ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। বঙ্গবন্ধুর বড় কৃতিত্ব একটি ভাষা ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আজ সারা বিশ্বে তাঁর সবচাইতে বড় পরিচয় জাতির পিতা হিসাবে।

বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তর পর্যন্ত এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাঙালি প্রেরণা শক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুই। ৭ই মার্চের ভাষণে মুজিব স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা দেন এবং ২৫শে মার্চ মধ্য রাতে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘ নয় মাস চলে। এ সময় মুজিব পাকিস্তানী কারাগারে বন্দি ছিলেন। তথাপি এ দেশের মুক্তি পাগল জনতা শুধুমাত্র মুজিবের নাম বুকে ধারণ করে মুক্তি সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৭এপ্রিল যে অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয় তার নাম “মুজিব নগর”। অন্য নাম কারো মাথায় আসেনি।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সংবিধান প্রণয়ন, মানচিত্র, ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার, দেশ পুনর্গঠনের সফলতার ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর সাহসী দেশ প্রেম, আপোষহীন নেতৃত্ব পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে। একটি সাধারণ পরিবার থেকে বেড়ে উঠা আপোষহীন চরিত্র কিভাবে জাতিকে স্বাধীনতার প্রশ্নে নেতৃত্ব দিয়ে অসাধারণ চরিত্রে পরিণত হয় তা নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় ও বিষ্ময়করও বটে। তাঁর মতো একজন সংগ্রামী নেতাকে আমরা পেয়েছিলাম বলেই স্বাধীন দেশ পেয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ আওয়ামীলীগ নেতারা যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে তাদের নিজস্ব বলয়ে রাখতে চান তা মোটেও ঠিক নয়। আমাদের মনে রাখা উচিত মুজিব কোনো দলের নেতা বা সম্পদ নয়। তিনি জাতীয় নেতা, জাতীয় সম্পদ।  তাই সকল ব্যক্তি ও সংগঠনের উচিত হবে এ মাপকাঠিতে তাঁকে মূল্যায়ন করা। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সোনার বাংলা। এ লক্ষ্যে তিনি এগিয়েছিলেন কিন্তু ঘাতকরা তাঁকে আর এগোতে দেয়নি। তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন ও তাঁর প্রতি যথার্থ ভালোবাসাই সোনার বাংলায় পরিণত হবে এ দেশ। এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কাজ করে যাচ্ছেন। জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে তার মর্যাদা সমভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, দলীয় বলয় থেকে তাঁকে মুক্ত করতে হবে । বাঙালি বলে আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম ব্যক্তি যিনি সারা বিশ্বে আমরা যে বাঙালি তার পরিচয় তুলে ধরে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম-মৃত্যু (১৯২০-১৯৭৫) হিসেব করলে মাত্র ৫৫বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘকাল ধরে শোষিত বাংলাকে সোনার বাঙলায় পরিণত করা। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতি পেয়েছে একটি পতাকা, নির্দিষ্ট ভূখন্ড, মানচিত্র, সংবিধান ও স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমরা সে রাষ্ট্রের গর্বিত সন্তান। এসবের জন্য বাঙালি জাতি তাঁর কাছে ঋণী। এ ঋণ কোনদিন বাঙালি পরিশোধ করতে পারবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ভালোবাসা ঠিকই শোধ করে গেছেন বুকের রক্ত দিয়ে। বঙ্গবন্ধু  ছিলেন কীর্তিমান পুরুষ। যুগে যুগে মহাপুরুষদের কীর্তি মুছে ফেলা যায় না। আপন মহিমায় চিরভাস্বর। যুক্তরাষ্ট্রের জজ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মাগান্ধী, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ তেমনি বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীর কাছে শোকের মাস, বেদনার মাস আগস্ট। ১৫আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদত বার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর মহান জাতীয়তাবাদী নেতাদের একজন। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি মনিরুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশ একটি মহাকাব্য। আমরা মনে করি বঙ্গবন্ধু সে মহাকাব্যের প্রধানতম ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু মূলত এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম মৃত্যু দিবসে তাঁর সুমহান আদর্শ ও মহিমান্বিত স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক : শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১