প্লিজ বিষ খাওয়াবেন না

প্লিজ বিষ খাওয়াবেন না

মীর আব্দুল আলীম : প্লিজ বিষ খাওয়াবেন না। আমাদের বাঁচতে দিন। কারো কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফুসফুস আক্রান্ত হচ্ছে, ক্যান্সারের কিংবা অন্য কোন জটিল রোগে ভুগলেন স্বজনরা। নিজেও সুস্থ নই। ক্যান্সারে মারা গেছেন চাচা। বাড়ির পাশের শিশুটাও জটিল রোগে আক্রান্ত। রোগবালাই পেয়ে বসেছে আমাদের। মানুষ অকালে মারাা যাচ্ছে। বিষ খেলে মানুষতো মরবেই। বেঁচে থাকার তাগিদেই প্রতিদিনই আমরা খাবার খাই। কিন্তু এই খাবারই যে আবার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে সে খেয়াল কজনে রাখেন। আমরা আসলে কী খাচ্ছি? কখনো কি জানতে চেয়েছি? জানার চেষ্টা করেছি? বা জেনে খাচ্ছি? ২৩ জানুয়ারীর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম  “হাঁস মুরগি মাছে বিষাক্ত পদার্থ”। দেশে উৎপাদিত হাঁস, মুরগি ও মাছের শরীরে মিলেছে হেভিমেটাল (এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ)। যা হাঁস, মুরগি ও মাছের শরীরে প্রবেশ করছে খাদ্যের মাধ্যমে। বিভিন্ন ধাতু ও রাসায়নিকসমৃদ্ধ বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য খাবার হিসেবে অধিক মুনাফার জন্য ব্যবহার করছে খামারিরা। এ ধরণের মাছ ও মাংস গ্রহণ করলে তা মানবশরীরে প্রবেশ করে। তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, ট্যানারির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত পোলট্রি ফিডে হেভিমেটালে ক্যাডমিয়াম, লেড (সিসা), মার্কারি (পারদ) ও ক্রোমিয়ামসহ বেশ কিছু বিষাক্ত পদার্থ মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্রোমিয়ামসহ এসব ধাতু ও রাসায়নিক থেকে ক্যান্সার, হূদরোগ, আলসার, কিডনির অসুখ হতে পারে। মানবদেহে অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম প্রবেশ করলে পুরুষের সন্তান উত্পাদনক্ষমতা হ্রাস, নারীদের অকাল প্রসব, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগও হয়ে থাকে। দেশে ক্যান্সার রোগী বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো বিষাক্ত মাছ ও মাংস গ্রহণ।

‘হাঁস-মুরগি আর মাছের খাবারে ক্যানসারের উপাদান!’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। জনমনে আতঙ্ক তৈরি হবার মতোই সংবাদ। আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। হাঁস-মুরগির আর মাছের খাবারে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ক্রোমিয়াম মাত্রাতিরিক্ত অবস্থায় আছে বলে ক’দিন ধরে যে সংবাদ ছাপা হচ্ছে তাতে ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষাক্ত উপাদানযুক্ত খাবারে বেড়ে ওঠা মাছ-মুরগি মানুষের জন্যও ক্যানসার, কিডনি, লিভারের জটিল রোগের অন্যতম কারণ হতে পারে। অবশ্য এ বিষয়ের গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন ইতোমধ্যে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ট্যানারি বর্জ্য ছাড়া অন্য যেসব উপাদান ব্যবহার করে দেশে যে পোলট্রি ফিড তৈরি হয়, তাতে ক্রোমিয়ামের উপাদান থাকার আশঙ্কা নেই। সে ক্ষেত্রে যেন গোটা পোলট্রি ফিডশিল্পের ব্যাপারে ভোক্তা ও উৎপাদকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না হয়, তাতে সতর্ক থাকা জরুরি। অতীতে এ ধরনের আতঙ্কের কারণে আমাদের পোলট্রি শিল্প ধসের মুখোমুখি হয়েছিল। এর পুনরাবৃত্তি কোনোভাবে কাম্য নয়। এ ব্যাপারে দেশের গণমাধ্যমগুলোকেও বেশ সতর্কতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। মাছ-মুরগির খাবারে ক্রোমিয়াম! যা কিনা ক্যানসার সৃষ্টি করে। এমন সংবাদে আতঙ্ক সৃষ্টিতো হবেই। ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় তৈরি মাছ-মুরগির আর মাছের খাবারে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ক্রোমিয়ামের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি প্রমাণ হওয়ার খবর উদ্বেগজনক সন্দেহ নেই। সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর ক’টি পোলট্রি ফিড প্রস্তুত কারখানায় অভিযান চালায়। সেখানে প্রাপ্ত নমুনা তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল তথা গবাদিপশুর চামড়া, হাড়সহ অন্যান্য বিক্রয়যোগ্য উপাদানে বিপজ্জনক মাত্রায় এই উপাদানটি ব্যবহার হয়।

 ট্যানারি বর্জ্যে তৈরি পোলট্রি ফিডেও রয়ে যায় এই বিষাক্ত উপাদান। ফলে কেবল পোলট্রি ফিড নয়; অন্যান্য উৎপাদনেও এই বর্জ্যের ব্যবহার এমনকি নির্বিচার নিক্ষেপ যে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। প্রাণঘাতী প্রবণতা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আমরা চাই, খোদ ট্যানারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেই জোর দেয়া হোক। পোলট্রি ফিডে ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি এই বর্জ্য যাতে পরিশোধন করা হয়, সেজন্যও চাই কড়া নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান। এ কথাও মনে রাখতে হবে সকল পোলট্রি ফিড উৎপাদকই অসাধু। আবার সব মাছ-মুরগির খামারেই বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত খাবার ব্যবহার করা হচ্ছে তাও না। কোনোভাবে এ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাবে না। আতঙ্ক সৃষ্টি নয়, কেবল দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনকি সংবাদমাধ্যমেরও উচিত এ বিষয়টি স্পষ্ট করা যে, কেবল বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি পোলট্রি ফিডেই বিষাক্ত ক্রোমিয়ামের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি মিলেছে। একই সঙ্গে এর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই। বড় দ-ে লঘু শাস্তি যেন না হয়। তাতে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে, আবারো একই অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। দেশে লাখ লাখ মানুষের ক্যানসার, কিডনি বিকল ও যকৃৎ নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী এক শ্রেণির অসাধু কারখানা-মালিক। এরা মাছ-মুরগির বিষাক্ত খাবারের ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করবে আর ধরা পড়লে তাদের দিতে হয় মাত্র ১/২ লাখ টাকা।

 জরিমানার ওপর দিয়েই সব খালাস! সামান্য দ-িত দিয়ে যদি কোটি কোটি টাকা বানানো যায়, তাহলে এ জাতীয় অপরাধতো এরা করবেই। আগে হাঁস-মুরগি বড় হতো প্রাকৃতিকভাবে। রান্না করা ভাত, ধানের কুড়া ও ভুসি এসব খেয়ে। আর ফার্মের মুরগির খাবার হলো দানাদার। যার সঙ্গে মিশ্রিত থাকে নানা রকম রাসায়নিক। যার কারণে এসব খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি বড় হয় ফার্মের মুরগি, ওজনও বাড়ে। এসব খাবারে লুকিয়ে আছে মরণঘাতী ব্যাকটেরিয়াসহ মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর মারাত্মক জীবাণু। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। বাজারে বিক্রি হওয়া হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্য (পোলট্রি-ফিশ ফিড) খাওয়ানো মুরগি কেটে এর রক্ত, মাংস, হাড়, কলিজা, মগজ ও চামড়া আলাদাভাবে পরীক্ষা করে আঁতকে উঠেছেন গবেষকরা। প্রথম দফায় এক মাস এসব খাদ্য খাওয়ানোর পরে এবং দ্বিতীয় দফায় আরেক মাস খাদ্য খাওয়ানোর পরে পরীক্ষা করে যে ফলাফল পাওয়া গেছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। এসব মুরগির মাথার মগজে সর্বোচ্চ পরিমাণ ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। ক্রোমিয়াম হলো এক ধরনের ভারী ধাতু, মানবদেহে যার সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা হলো প্রতিদিন ২৫ পিপিএম বা মাইক্রোগ্রাম। এর বেশি হলে বেশিটুকু শরীরে জমা হতে থাকবে এবং একপর্যায়ে প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করবে। কিন্তু পরীক্ষায় এক মাস খাদ্য খাওয়া মুরগির মগজে পাওয়া যায় ৭৯৯ পিপিএম এবং দুই মাস খাদ্য খাওয়া মুরগির মগজে (প্রতি কেজিতে) পাওয়া যায় চার হাজার ৫৬১ পিপিএম। এ ছাড়া মাংসে যথাক্রমে ২৪৪ ও ৩৪৪, চামড়ায় ৫৫৭ ও ৩২৮, হাড়ে এক হাজার ১১ ও এক হাজার ৯৯০, কলিজা বা লিভারে ৫৭০ ও ৬১১ এবং রক্তে ৭১৮ ও ৭৯২ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই মাত্রা মানবদেহের জন্য অসহনীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিপজ্জনক মাত্রার ক্রোমিয়ামযুক্ত মাছ বা মুরগির মাংস কিংবা ডিম খেয়ে দেশের মানুষের পুষ্টি জোগানোর ভয়াবহ একপর্যায়ে  রয়েছি, যাকে এক ধরনের ‘বিষাক্ত পুষ্টি’ বলা যায়।

প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হাঁস, মুরগি ও মাছ খেয়ে মানুষ মূলত গ্রহণ করছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা মানুষকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। আমরা যে প্রতি দিন বিষ খাচ্ছি এ ভাবনাটা আমাদেও দেশের মানুষের মধ্যে নেই। শ্রীলংকায় ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি বিষাক্ত হেভিমেটাল যুক্ত খাবার নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবে শ্রীলংকায় হেভিমেটালযুক্ত খাবার ব্যবহার করা হতো। এক পর্যায়ে শ্রীলংকার একটি গ্রামে যখন বহু মানুষের কিডনি সমস্যা দেখা দেয়, তখন আলোচনা উঠে বিশ্বজুড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ওই গ্রামে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, হেভিমেটালযুক্ত খাদ্য খাওয়া হাঁস, মুরগি ও মাছের মাধ্যমে এটি হয়েছে। বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি সার কৃষি জমিতে ব্যবহারের ফলেও কিডনি রোগ হয়। পরে শ্রীলংকা এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কেউ করলে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। আমাদেরও এমনটা করা উচিৎ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর দেশে দেড় লক্ষাধিক মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং লক্ষাধিক রোগি কার্যত বিনা চিকিৎসায়ই মারা যায়।

দেশে ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা ও সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। পনের লক্ষাধিক ক্যানসার রোগির জন্য হাসপাতালের বেড রয়েছে মাত্র ৫ শতাধিক। ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ক্যানসার, কিডনি ও লিভার রোগের চিকিৎসার বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে পানি, বায়ু, মাটি ও পরিবেশ দূষণের ফলে জনস্বাস্থ্যে যে হুমকি সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে শুধু চিকিৎসা সেবা বাড়িয়ে অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কল-কারাখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার এবং পোল্ট্রি ফিড ও খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল ও মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যানসার, কিডনি, লিভারসহ যাবতীয় জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির প্রকোপ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে বাজারে থাকা সব পোলট্রি ফিডই বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহার করে না। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত, মানহীন স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে এমন পোলট্রি ফিড কারখানাগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি পোলট্রি ফিড যেন আমদানি নির্ভর না হয়ে পড়ে সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

ভেজাল নিরোধ করতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত গঠনের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে হাইকোর্টের। সরকার একমাত্র ঢাকা জেলায় একটি খাদ্য আদালত গঠন করে বসে আছে। ৬৪টি জেলার ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের ফায়সালা এই এক আদালতে হয় কি করে? এ ক্ষেত্রে দেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছে নির্ভেজাল খাদ্য পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জেলায় জেলায় একটি করে খাদ্য আদালত গঠন করতে হবে। উপজেলা প্রশাসনকেও এক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্য আদালত গঠনের কাজটি যত দ্রুত সম্ভব করা উচিৎ। সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। সর্বশেষ যারা মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী এসব খাদ্যের জল্লাদদের ফাঁসি চাই আমরা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮