প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ

প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ

মোঃ মুরশীদ আলম: বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্লাস্টিক ব্যবহার হচ্ছে। দামে সস্তা ও টেকসই বলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। প্লাস্টিকের বোতল, কৌটা, হাঁড়িপাতিল, থালা বাসন, চেয়ার টেবিল শিশুদের খেলনা ইত্যাদি প্লাস্টিকের পণ্যে বাজার ছেয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ ভাংগাচোরা বা ব্যবহার অনুপোযোগী প্লাস্টিকের দ্রব্যাদি আশ পাশের জমিতে ফেলে দেয়। মাটির জন্য প্লাস্টিক ক্ষতিকর। প্লাস্টিক উপকারি ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে এবং মাটির ভিতর সূর্যালোক পৌঁছাতে বাধা দেয়। মাটির সংস্পর্শে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া জন্ম দেয় যা ধান, আলু, গম ও সরিষা চাষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শিশুদেরকে প্লাস্টিকের তৈরি নানাবিধ রঙিন খেলনা কিনে দেয়া হয় খেলার জন্য। খেলনার রংগুলো নানাভাবে শিশুর হাতে এবং মুখে লেগে যায়। ওই রং কোন না কোনভাবে শিশুর পেটের মধ্যে যায়। যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্লাস্টিকের জন্য পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। শস্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিশুসহ সব বয়সের মানুষের মধ্যে নানাবিধ রোগ বালাই দেখা দিচ্ছে। আজকাল গ্রামে কুলখানি, বিবাহ বা যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে মিশ্রিত অতিথিদেরকে খাবারের সময় ওয়ানটাইম গ্লাস, প্লেট ও বোতলজাত পানি দেওয়া হয়।

 খাবার শেষে এই সব গ্রাম, বোতল ও সেগুলো আশে পাশের জমিতে ফেলে দেওয়া হয়। শহরেও এমন অবস্থান দেখা যায়। কিন্তু শহরে পৌর সভার পরিচ্ছন্নকর্মিরা তা অপসারণ করে দূরে কোথাও স্তুপাকৃত করে রাখে। কিন্তু গ্রামে তো এমন কোন ব্যবস্থা নেই। তাই ওই জমিতেই প্লাস্টিক পণ্যগুলো পড়ে থাকে দিনের পর দিন। এর ফলে ওই জমির উর্বরা শক্তি কমে যায়। সেখানে কোন ফসল উৎপাদন হয় না। পাঁচটি গ্রামে অনুসন্ধান করে এবং জমির মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে  জানা গেছে যে, তাদের পাড়ার আশে পাশের জমিগুলোতে প্রতি বছর প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় গড়ে ছয় মণ ধান কম উৎপাদন হচ্ছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ি প্রতি বিঘা জমিতে ইরি ও আমন ধান মিলে কমপক্ষে ৪০ মণ ধান পাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে তারা পাচ্ছে ২৮ মণ। প্রতি গ্রামে যদি এমনি প্লাস্টিক জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জমি ১০০ বিঘা থাকে। তা হলে এই ৫টি গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ হল ৫ শত বিঘা। এই পাঁচশত বিঘা জমিতে ইরি আমন মিলে তারা ধান কম পাচ্ছে (৫শত বিঘা´১২)  ৬ হাজার মণ। প্রতি মণ ধান যদি ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয় তা হলে ৬ হাজার মণ ধানের মূল্য হচ্ছে ৬০ লক্ষ টাকা। এই পরিমাণ টাকা কৃষক পাচ্ছে না। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এই হিসাবে সারা দেশের গ্রামের ধান উৎপাদনের পরিমাণ অনুমান করলে কী পরিমাণ টাকা কৃষকরা পাচ্ছেনা বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কেন প্লাস্টিকের জন্য তা সহজেই অনুমান করা বা বোঝা যাবে। ঘুন পোকা যেমন নিরবে নি:শব্দে কুরে কুরে খেয়ে কাঠ কে ধ্বংস করে তেমনি প্লাস্টিকও আমাদেরকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

পরিবেশ, কৃষি, কৃষকের খাদ্য ও গ্রামেরই হোক বা শহরের মানুষ হোক এদের জীবনকে প্লাস্টিকের দূষণ থেকে বিপদমুক্ত ও নিরাপদ করতে হলে প্লাস্টিকের যথেচ্ছার বা অবাধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা প্রয়োজন আর সময়ের দাবি। প্লাস্টিক জাত পণ্যাদি আমদানি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে প্লাস্টিক দ্রব্যাদি তৈরির সকল প্রকার কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি। ভারতে অক্টোবর/১৯ থেকে ছয়টি প্লাস্টিকজাত পণ্যের উৎপাদন, ব্যবহার ও আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হচ্ছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হয়তো এতদিন কার্যকর হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকার তালিকায় থাকা ভারতের শহর ও গ্রামগুলো থেকে ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য তুলে নিতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ পণ্যগুলোর তালিকায় থাকা পণ্যগুলো হচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যাগ, স্ট্র, প্লেট, ছোট বোতল, কাপ ও শ্যামপুর মত পণ্যের ছোট প্যাকেট। এ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২১ সালের মধ্যে প্লাস্টিক জাত স্ট্র কর্ক, ছবি ও কটনবার্ডের মত পণ্য নিষিদ্ধের পরিকল্পনা করছে। চীনে বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাংহাই- এ ধারাবাহিকভাবে ব্যাটারি শিল্পে ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে আনছে।

 দেশটির হাইনাস প্রদেশে ২০২৫ সালের মধ্যে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক পণ্য পুরোপুরি অপসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। আমাদের দেশেও প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া এর কুফল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পত্র-পত্রিকায় ও সব টিভি চ্যানেলগুলোতে প্লাস্টিকের কুকর্ম সম্পর্কে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। গ্রামের হাট বাজার ও নিত্য জনসমাবেশ হয় এমন স্থলে প্লাস্টিকের কুফল সম্পর্কে ও সচেতনতামূলক বক্তব্য সম্বলিত সাইনবোর্ড, পোস্টার ইত্যাদি টাঙ্গাতে হবে। প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এমন নিয়ম প্রবর্তনের দিন থেকে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য বা বিকল্প ব্যবস্থা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে প্রাথমিকভাবে ছয়মাস নিষেধাজ্ঞা বা লঙ্ঘনে  কোন রকম শাস্তি বা জরিমানা বিধান থাকবে না। ছয় মাসের পর থেকে কড়াকড়িভাবে তা মেনে চলার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন থেকে যদি আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহারের বিরুদ্ধে জোরদার ব্যবস্থা গ্রহণ না করি তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদেরকে ক্ষমা করবে না।
লেখক ঃ উন্নয়নকর্মি  
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬