প্রান্তজনের বাজেট ভাবনা

প্রান্তজনের বাজেট ভাবনা

আতাউর রহমান মিটন  : ঈদের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। শহরের মার্কেটগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। শহরের ভিড় দেখে বোঝার উপায় নেই যে, আমাদের গ্রামীণ অথনীতি ভঙ্গুর দশায় নিপতিত হয়ে আছে। কৃষকের ধানের দাম সরকার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও বাড়েনি। সরকার ঘোষিত ১০৪০ টাকা মণ দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা সুরাহা করা যায় নি। কিন্তু জীবন তো থেমে নেই। কৃষি নির্ভর পরিবারগুলোও এখন বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অন্যান্য কায়িক শ্রমনির্ভর পেশায় জড়িত হচ্ছে। তারা টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মত করে। আমাদের উদ্যমী মানুষগুলোর এই প্রাণান্ত প্রচেষ্টার কারণেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, গতি পাচ্ছে অর্থনীতির চাকা।
কৃষক অবহেলিত এটা অনেক পুরনো কথা। ভূমিহীন কৃষক আরও অসহায়। মহাকাশে আমরা স্যাটেলাইট পাঠাতে সমর্থ হলেও প্রান্তিক এই কৃষিনির্ভর মানুষগুলোর অবস্থা উন্নয়নে কোন টেকসই ব্যবস্থা আমরা আজও করতে পারিনি। আমরা কেবল শুনেছি বড় বড় গালভরা কথা। আমরা শুনি, ‘কৃষকরা হচ্ছেন আমাদের জাতীয় বীর’! কিন্তু বীরত্বের এই তকমা কি তাদের মনে হাসি ফোটাতে পারছে? কৃষক ভাল থাকলে সে তার পাকা ধানে আগুন লাগায় কেন? লোকসান দিয়ে ধান উৎপাদন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর বানানো আমাদের কৃষকের বঞ্চনার অবসান তবে কোথায়?
‘কি করা উচিত’ সরকারে থাকা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা সেটা জানেন না তা আমি বিশ্বাস করি না। তারা সব জানেন, সব বোঝেন কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেন না। সবাই জানেন ‘সিন্ডিকেট’ এর কথা। সরকারও জানে। এখনই র‌্যাবকে দায়িত্ব দেয়া হোক চালের গোডাউনগুলো মনিটরিং করার, দেখবেন থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসছে। ইচ্ছে করে সিন্ডিকেটওয়ালারা ধানের বাজার ফেলে দিয়েছে। মিল মালিকেরা ধান কিনছে না তাই কৃষক বাধ্য হচ্ছে কমদামে ধান বেচে দিতে। সরকার সরাসরি ধান কিনে রাখবে কোথায়? আমাদের গোডাউনগুলোতে তো ভেজা ধান রাখা সম্ভব নয়। এখানে দরকার ছিল সমন্বয়ের এবং সুব্যবস্থাপনার। সরকার, মিলমালিক এবং কৃষক প্রতিনিধিরা একত্রে বসে আলোচনা করলেই সমাধান বেড়িয়ে আসবে। কি করতে হবে তা নিয়ে গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। অনেক সুন্দর সুন্দর মতামত পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু কানে তুলো দিয়ে বসে থাকলে তো সেই মতামতগুলো কোন কাজে লাগবে না। কৃষক সমবায় গঠন এবং তাদের নেতৃত্বে ইউনিয়নভিত্তিক খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। আর দরকার র‌্যাব বা এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙার সাহসী পদক্ষেপ।
সরকার কৃষকবান্ধব প্রমাণ করতে চাইলে কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। ধরা যাক, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষক সমবায় গঠিত হয়েছে। সরকার সেই সমবায়গুলোকে ১ কোটি টাকা দিয়েছে ‘ঘুর্ণায়মান তহবিল’ হিসেবে। কৃষক সমবায়গুলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কৃষকের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান কেনার এবং তা প্রক্রিয়াজাত করার। এর জন্য সরকার থেকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। সরকারের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন মনিটরিং-এর দায়িত্বে। কল্পনার এই প্রক্রিয়া বাস্তবে প্রয়োগ করা হলে ধান নিয়ে বিরাজমান সমস্যার সমাধান হয়তো হতো। এছাড়াও ইউনিয়নভিত্তিক কৃষক সমবায় থাকলে সরকারের অন্যান্য সহযোগিতা যেমন, আধুনিক ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্র সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। এর ফলে কৃষিকে আধুনিকীকরণের যে আকাঙ্খা সরকারের রয়েছে সেটাও সহজ হয়ে যেত। প্রশ্ন হলো কেন সরকার সেটা করছেন না। নিন্দুকেরা বলে, ওটা করলে সিন্ডিকেট এর কি হবে? তাহলে কি আমাদের সরকার সিন্ডিকেট এর কাছে জিম্মি! এটা কি করে সম্ভব!
আমার প্রস্তাব দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষক সমবায় গঠন করা হোক। তাদের জন্য অবশ্য পালনীয় বিশেষায়িত বিধি তৈরি করা হোক। দেয়া হোক আর্থিক সহযোগিতা। প্রতিটি কৃষক সমবায়কে বছরে ১ কোটি টাকা দেয়া হলে সরকারের প্রয়োজন হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বিগত বছরগুলিতে কৃষিখাতে বরাদ্দের প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা অব্যবহৃত থেকেছে। সরকার টাকা খরচ করতে পারছে না অথচ কৃষকের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে কাজে লাগবে এমন খাতে সরকার বরাদ্দও দিচ্ছে না, এটা কেমন কথা! বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিখাতে ভর্তুকি দেয়ার নিয়ম আছে। নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মত মুক্ত বাজার অথনীতির দেশেও কৃষিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দেয়। সুতরাং এটা অসম্ভব বা অবাস্তব কোন দাবি নয়। সরকারকে শুধু তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ও কৃষককে সহায়তা করার জন্য কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা বিবৃতি নয়, দরকার দৃঢ় পদক্ষেপ। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কৃষকের স্বার্থে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভেঙ্গে ফেলতে যে কোন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে কুণ্ঠিত বোধ করবেন না।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে কৃষক-ক্ষেতমজুর-শ্রমজীবী তথা প্রান্তিক মানুষের স্বার্থে অধিকতর ও কার্যকর বরাদ্দ প্রদানের দাবি জানাই। আমরা সবাই জানি, বাজেট কেবল সরকারের বাৎসরিক হিসাব-নিকাশের দলিল নয়। এটি সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনের প্রতিচ্ছবি। বাজেট দেখেই বোঝা যায় সরকার কোন শ্রেণী বা জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কতখানি বরাদ্দ দিচ্ছে। যদিও এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ দিয়ে ভরা আমাদের বর্তমান সংসদ। সেখানে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব নেই। সরকারের কাজের ন্যায্য সমালোচনা করার মত সাহসী প্রতিনিধিও খুব বেশি আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। তাই সঙ্গতঃ কারণেই প্রান্তজনের স্বার্থে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। মেট্রো রেল এর কথায় ধরা যাক? এটা কি গরীবের যানবাহন? এত টাকা দিয়ে নির্মিতব্য বিলাসবহুল এই ট্রেনে কি আমাদের প্রান্তজনেরা চড়তে পারবে? তাহলে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয় এমন গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরির চাইতে এমনতর মেগা প্রজেক্ট করার দিকে এত ঝোঁক কার স্বার্থে? মেগা প্রজেক্ট হয়তো করতে হবে কিন্তু সেই তুলনায় প্রান্তজনের কল্যাণে ছিঁটে-ফোঁটা বরাদ্দ দিতে কার্পণ্য কেন?
দেশের কর্মক্ষম মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ আমাদের বড় সম্পদ। আমরা ভিক্ষুকের জাতি হয়ে বাঁচতে চাই না। আমরা চাই সম্পদের সুষম বন্টন। আমরা চাই মানুষের কল্যাণে কার্যকর বরাদ্দ। দেশের মানুষের আয় বাড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের আয় বছরে যদি ২ হাজার টাকা বেড়ে থাকে তাহলে দেশের উপরতলার একজন মানুষের আয় বেড়ে যায় বছরে ২ কোটি টাকা। আয় বৃদ্ধির এই অসম ধারা অব্যাহত আছে সরকারের সুশাসনের অভাবের কারণে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বি-গুণ করা হয়েছে কিন্তু দেশের কোথাও সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষের পরিমাণ কমেছে এমন অভিজ্ঞতা কারও হয়নি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে অসন্তুষ্ট এবং বিভিন্ন সময়ে তিনি এ ব্যাপারে উস্মা প্রকাশ করেছেন। দেশে ঘুষ-দুর্নীতির একটা নির্লজ্জ মহাসমারোহ এখনও চলছে। বিরোধি শিবিরগুলো সমালোচনা করে বলছেন, আমাদের সরকার ‘ঋণখেলাপী বান্ধব সরকার’। হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপীদের রক্ষায় সরকারের আন্তরিকতার অভাব নাই অথচ কৃষি ও কৃষকের জন্য অর্থ বরাদ্দে তাদের হাত কচলানি আর অজুহাতের কোন শেষ নাই। এটা সত্যিই আমাদের কষ্ট দেয়। বঙ্গবন্ধু’র আদর্শে পরিচালিত সরকার কেন এই অচলায়তন ভাঙতে পারছে না!
কৃষি, বাসস্থান, শিক্ষা, আত্মকর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতগুলোকে বিকশিত করার জন্য সরকারের বরাদ্দ বাড়াতেই হবে। এখানে কার্পণ্য করে কেবল কতিপয় মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পুরো শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত রেখে কেবল মুখমন্ডলকে সুন্দর ও পরিপাটি করে সাজানোর মত বোকামি হবে বলে দেশের মানুষ মনে করে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি একটি সুন্দর কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতা ও পরিধি আরও বৃদ্ধি করা দরকার। তবে এটাও মনে রাখতে হবে সরকারি বরাদ্দ বাড়লেই তা সব সময় সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় না। এ ক্ষেত্রে বিরাজমান দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে কঠোর হস্তে। রাজনৈতিক পরিচয় কখনই সেবাদান কর্মসূচিতে মুখ্য বিবেচিত হওয়া কাম্য নয়। মানুষের কল্যাণ করার অঙ্গীকার এখানে মুখ্য বিবেচিত হওয়া উচিত। আমরা সরকারের কাছে সুষম উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সোপান তৈরির মত বাজেট চাই।
আমাদের বর্তমান অর্থনীতি কেবল ধনী ও দরিদ্রের মধ্যেই বৈষম্য বাড়াচ্ছে না, বৈষম্য বাড়াচ্ছে নগর ও গ্রামের মধ্যেও। রাজধানীর সাথে অন্যান্য জেলা শহরের উন্নয়ন বৈষম্য এখন দৃশ্যমান। এমনকি পদ্মার পাড়কে ঘিরে একটি অঞ্চলের উন্নয়নে সরকারি প্রচেষ্টাও চোখে পড়ার মত। যেন ঐ অঞ্চলটাই বাংলাদেশ, অন্য এলাকাগুলো নয়! এটা সত্যিই কষ্টদায়ক! আমরা সরকারের কাছে কোন এলাকার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করি না। উন্নয়ন পরিকল্পনা সুষম হওয়া দরকার। সত্যি বলতে কি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুষম উন্নয়ন হচ্ছে না বিধায় দেশের মানুষ রাজধানীর দিকে ছুটছে। সবাই এসে ভিড় করছে এই ছোট্ট নগরীতে। আর এত মানুষের ভীড়ে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা। সেটা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে মেট্রোরেল, পাতাল রেল, ফ্লাইওভার, ইত্যাদি সব বড় বড় প্রকল্পের। অথচ জেলাগুলোর সুষম উন্নয়ন হলে, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মত অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে, সর্বোপরি আন্তঃজেলা রেল ও নৌ যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও সহজতর করা হলে দেশের মানুষকে রাজধানীতে গিয়ে ভিড় করতে হতো না। সরকার কি এবারের বাজেটে এদিকটা বিবেচনায় রাখবেন? বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন চালু, সারিয়াকান্দি নৌ বন্দর চালু, গাইবান্ধা থেকে যমুনা সেতু পূর্ব পর্যন্ত কি নৌপথ চালু করার মত স্থানীয় যোগাযোগ পথগুলো চালু করা হবে?
আমরা দীর্ঘদিন থেকে সরকারের কাছে বলে আসছি যে, দয়া করে আপনারা জনগণের জন্য পথ তৈরি করে দিন। তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিন, দেশের ভেতরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিন। বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়েই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবে। আমাদের উন্নয়নের জন্য কারও কাছে ভিক্ষার থালা বাড়িয়ে দিতে হবে না। দয়া করে দলবাজ, লুটেরা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দুর্বৃত্তদের ঠেকান। মানুষকে সুযোগ দিন। সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা বৃদ্ধি করুন। প্রান্তজনের দিকে মনোযোগ দিন। ওদেরকে আস্থায় রাখুন। বৈষম্যহীন, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ওরাই কাঁধ বাড়িয়ে দেবে। সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের অগ্রীম শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯