প্রসঙ্গঃ সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবা

প্রসঙ্গঃ সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবা

নাজমুল হোসেন : জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার নামে নৈরাজ্য দেখার যেন কেউ নেই। দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নেই। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। এসব হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার নেই আবার কোন কোন হাসপাতালে একাধিক ডাক্তার কর্মরত। যেখানে এমন ডাক্তারের স্বল্পতা সেখানে ডাক্তারের সহকারি ও ওয়ার্ড বয় জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা। হাসপাতালসমুহে শুধু ডাক্তার সংকট নয় বরং সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ অন্যান্য বিভাগের লোকবল চরম সংকটে। জেলা সদর ও উপজেলার বেশিরভাগ হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন, ডেন্টাল যন্ত্রপাতি, প্যাথলজিস্ট যন্ত্রপাতি, হার্ট বিভাগের যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সহ বহু মূল্যবান চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার আশায় আগত সাধারণ মানুষ ওই সমস্ত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 একটু ভাল আর বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পেতে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বড় আশা নিয়ে দরিদ্র রোগিরা হাসপাতালে আসেন। কিন্তু এখানে এসেই তাদেরকে পড়তে হয় বিপাকে, নানা বিড়ম্বনায়। হাসপাতালের প্রবেশ গেট থেকে শুরু করে কেবিন, বেড পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এক শ্রেণীর দালাল চক্র। নানা প্রলোভন যেমন দ্রুত ডাক্তার সেবা পাইয়ে দেয়া, প্রয়োজনীয় ঔষধ, থাকার জন্য কেবিন ইত্যাদি দেখিয়ে তারা দরিদ্র ও সহজ সরল রোগিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এক রকম সর্বস্বান্ত করেই ছাড়েন। ওই সব দালালরাই এই পর্ব শেষে আবার সরকারি মেডিকেলের কাজের হতাশাপূর্ণ বর্ণনা দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। অভিযোগ আছে, এরা একশ্রেণির সরকারি ডাক্তারদের দ্বারা নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রিত আর রোগি প্রতি এসব দালালদের ডাক্তাররা কমিশন দিয়ে থাকেন। ভুক্তভোগী রোগীদের অভিযোগ ডাক্তাররা তাদের সরকারি কর্মক্ষেত্রের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানকেই বেশি প্রাধান্য দেন। আরও একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র হচ্ছে, ডাক্তাররা কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি। তাদের এই কার্যক্রমের মাধ্যমেও লাইনে অপেক্ষমাণ থাকা রোগিদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।

প্রায়ই গণমাধ্যমের খবরে চিকিৎসার ক্ষেত্রে দুরবস্থার চিত্র উঠে আসে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগিরা সহ অন্যান্য রোগিরা পর্যাপ্ত ঔষধ থাকা সত্ত্বেও সঠিকভাবে ঔষধ পান না। ডাক্তারদের লেখা স্লিপ নিয়ে ঔষধ আনতে গেলেই ২/১টা সস্তা ঔষধ দিয়ে বলা হয় বাকীগুলো স্টোরে নেই তাই বাহির থেকে কিনতে হবে। অথচ বাহিরের ফার্মেসিতে গেলেই দেখা যায় না পাওয়া ঔষধগুলো অগ্নিমূল্য। চিকিৎসকদের বাণিজ্যিক মন-মানসিকতার কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ সরকারি চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। এই সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায় নিকটস্থ বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে সেবা নিতে গিয়েও সাধারণ রোগিরা পড়েন নতুন হতাশা ও যন্ত্রণায়। উন্নত চিকিৎসার নামে চাকচিক্য ওই সব ক্লিনিকে ভাল চিকিৎসার নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। সাধারণ রোগিরা চিকিৎসকদের নামী-দামী ডিগ্রি দেখে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন।
ডাক্তারদের অতিরিক্ত ফি, প্রয়োজনীয় ঔষধের সাথে অপ্রয়োজনীয় ঔষধ, ঊর্ধ্ব মূল্যের টেস্ট ফি, বেড ভাড়া দিয়েই ধার দেনা করে আনা অসহায় রোগিদের পকেট খালি হচ্ছে। তাছাড়া রোগিকে দরকারি ও অদরকারি প্যাথলজি টেস্টের জন্য লম্বা স্লিপ দিয়ে মনোনীত ক্লিনিক কিংবা ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্য কোথাও থেকে করলে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য হয়। এখানেও রয়েছে কমিশন বাণিজ্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মনীতি আর হুঁশিয়ারির কোন কিছুতেই পরোয়া নেই তাদের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫% দুর্নীতি হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে, ২৪.৯% জেনারেল হাসপাতালে ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০.৭%।

অথচ উন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও রয়েছে উন্নত চিকিৎসা সেবা। বড় বড় ও জটিল রোগের অপারেশন করার মত সরকারি ব্যবস্থা ও আধুনিক যন্ত্রপাতিও এদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রয়েছে। বর্তমান সরকার চিকিৎসা সেবা ও খাতে অনেক বড় বাজেট রাখে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন, হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, অসংখ্য ডাক্তার নিয়োগ ইত্যাদি কমবেশি সকল ব্যবস্থা থাকলেও সেই হিসেবে নেই চিকিৎসা সেবা। প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে বারবার ডাক্তারদের অবহেলা, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির চিত্র দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সব ডাক্তারদের চাকরি ছাড়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে দালালদের উৎখাত ও ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মনিটরিং সেল জোরদার করা সহ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং পাশাপাশি ডাক্তাররা যে সব যৌক্তিক সমস্যায় জর্জরিত সেগুলোকেও আমলে নিতে হবে। এছাড়া অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্যাগুলোর সমাধানকল্পে দ্রুতই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে তবেই সাধারণ জনগণের শতভাগ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিশ্চিত হবে।
লেখক ঃ প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৭২-৩৯১৪৯১