প্রশ্নফাঁস এবং গুজব ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ সবাইকে নিতে হবে

প্রশ্নফাঁস এবং গুজব ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ সবাইকে নিতে হবে

রিপন আহসান ঋতু : আগামী ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা এটি। যদিও বিগত কয়েক বছর ধরে সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যার নাম এই প্রশ্নপত্র ফাঁস। বিশেষভাবে বলতে গেলে, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে কোনো পরীক্ষার প্রধান সমস্যা এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর সঙ্গে রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব। এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব যে শুধু গুজবই, ব্যাপারটা তা নয়। এটি অনেক সময় বাস্তবে পরিণত হয় এবং হচ্ছে। তাই যারা পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে, তাদের পড়াশোনা তো আছেই, এর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও এই প্রশ্নফাঁসের গুজব তাকে আরও বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং পরীক্ষার্থীরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে ‘ফাঁস হওয়া’ প্রশ্নপত্র সংগ্রহেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে। এটাও অসম্ভব নয় যে, এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা বা হিংসাবশত ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের নামে অন্য একটা মনগড়া প্রশ্ন দিয়ে দিচ্ছে কোনো পরীক্ষার্থীকে। এমনিতেই পড়াশুনাসহ পরীক্ষার চিন্তা, সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব, সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর অবস্থা হয় অবর্ণনীয়। তাই আমরা সকলেই চাই, চিরতরে অবসান হোক এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য কাজ। সঙ্গে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ানো বা রটানোরও যেন কোনো রকম সুযোগ না থাকে তারও কার্যকরী উদ্যোগ দেখতে চাই।

 যেহেতু প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও খবর বের হচ্ছে আবার না হলেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে ফাঁস হওয়ার। তাই ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ এই দুইটি শব্দ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এই হুমকি থেকে বের করার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মূলত এই গুজব বিমুখ হতে হবে আমাদের সন্তানদের কল্যাণেই। এবারের ৩ হাজার ৭শ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী। তথ্যগত হিসেব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে এবার গত বছরের চেয়ে ৫শ পরীক্ষা কেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসসহ সব ধরনের অনিয়ম ঠেকাতেই এমন নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও একসময় শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যেতো কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এখন তো সেটি আরও ব্যাপকতা পেয়েছে। এইচএসসি-এসএসসির পর আমরা দেখলাম প্রাথমিক সমাপনীর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটছে। শিক্ষার সকল পর্যায়ে প্রশ্নফাঁস অত্যন্ত উদ্বিগ্নের বিষয়। কারণ, এ পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলোর প্রাথমিক ভিত্তি নির্মিত হয়; কিন্তু এই স্তরেই একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় সহজভাবে উত্তীর্ণের উপায় হিসেবে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে যায়, তখন অর্জিত-শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ আর মনুষ্যত্ব থেকে সে হয় বিচ্যুত। তার পথ-চলার শুরুটাই হয় একটা মিথ্যা-ফাঁকি-মেকিত্বের মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে জীবনাভিজ্ঞ অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের সবচেয়ে ভাল ফলের স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে এতটাই উদগ্রীব হয়ে পড়েন যে অনেক সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসে বিচলিত না হয়ে, অর্জিত মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে, ন্যায়-অন্যায়কে চুলোয় দিয়ে বহুমাত্রিক উপায়ে ফাঁসকৃত প্রশ্ন সংগ্রহ করে সন্তানের হাতে তুলে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এভাবেই প্রথম জীবনেই শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবার থেকেই দুর্নীতির সম্মতি পাচ্ছে, পাচ্ছে সহযোগিতা ফলে অদূরভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীদের পক্ষে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের পথে ফিরে আসা কতটুকু সম্ভব? সেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।

 তাহলে যারা একদিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে, পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তারা জীবনের শুরুতেই যে দুর্নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল সে পথ থেকে উত্তরনের উপায় কী? আমরা দেখছি, বিগত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে সমালোচিত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার সময়েও একই অভিযোগ ছিল, তবে সেইবার এসএসসির শেষ কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা এবং এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে প্রশাসনের সহায়তায় বেশকিছু শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল মন্ত্রণালয় এবং আমরা দেখেছি  সফলও হয়েছিলেন। এবার দেখলাম নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নফাঁস ঠেকানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কার্যকরী বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন যা আমাদের আশান্বিত করেছে। এখন থেকে সব ধরণের পরীক্ষাতে প্রশ্নফাঁস ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি করার জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইতিমধ্যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর পাশাপাশি এবার অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল কাগজে বাঁধিয়ে প্রশ্নপত্র পাঠানো ও নিরাপত্তা স্টিকারযুক্ত খাম ব্যবহার করা হবে। ট্রেজারির বাইরে কোথাও প্রশ্নপত্র না রাখার (আগে ভোল্টেও রাখা হতো) সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে দেখা যেত কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শুরুর কিছু আগেই প্রশ্নপত্র মুঠোফোনে ছবি তুলে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এ ছাড়া সমঝোতার ভিত্তিতে বিভিন্ন কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র সমাধান করে দেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটত। এসব কারণে এবার অধিকাংশ কেন্দ্র পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতদিন সারা দেশেই অসংখ্য উপকেন্দ্র বা ভেন্যু সেন্টার ছিল। অর্থাৎ একটি মূল কেন্দ্রের অধীনে আরও একাধিক স্থানে পরীক্ষা নেওয়া হতো। এবার সেটা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা শহরের বেশিরভাগ কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এবারই প্রথম ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র রাখা হচ্ছে না যা খুবই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এখন শুধু দেখার বিষয় এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সকলের সদিচ্ছা শেষ পর্যন্ত কেমন থাকে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রশ্নফাঁসের সাথে যেসব অপরাধীদের পাওয়া যাবে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

 কেননা অতীতে একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারি প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল, এখন দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু শিক্ষকই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’; শিক্ষকদের বেলাতেও কথাটা ঠিক। সকলেই শিক্ষক নয়, কেউ কেউ শিক্ষক। আমরা জানি, যে শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীর মননবিকাশের ভেতর নিজের নিয়তিকে রক্তমাখা ভবিষ্যত হিসেবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, শিক্ষার্থীর জীবনের ভেতর রাতের আকাশের কোটি কোটি ধ্রুব তারার মতো জ্বলে উঠতে পারেন, তিনিই তো শিক্ষক, তার স্মৃতিই তো ছাত্রের আমৃত্যু স্মরণযোগ্য। আমরা এমনই শিক্ষক দেখতে চাই সব জায়গায়। কেননা শিক্ষকদের হাত দিয়ে এভাবে প্রশ্নফাঁস হতে থাকলে জাতি পর্যবসিত হবে গভীর সঙ্কটে। শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোটি ভেঙ্গে পড়বে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে। মেধাবীরা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং ফাঁসকৃত প্রশ্নের আশায় তারা বই-খাতা-কলম ফেলে অনৈতিক পথে হাঁটবে কিংবা অধ্যবসায়ের পথ ছেড়ে দিয়ে শর্টকাট পথে সবচেয়ে ভাল ফলাফলের নেশায় আক্রান্ত হবে; শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত মেধাবীদের প্রতি যেমন অবিচার করা হবে তেমনি তাদের নির্ণয় করার পথটিও রুদ্ধ হয়ে যাবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। তবে এই সঙ্কটে আশাহত হলে চলবে না। অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচতে চাইলে এই মুহূর্তে আমাদের সাবধান হতে হবে। সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।

সরকার যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতির অনুসরণ করতে গলদঘর্ম অবস্থা সেখানে কিন্তু শিক্ষা নিজেই হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার। আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষা মানুষের সুপ্ত-প্রতিভা বিকাশে ও মনন-গঠনের প্রধান সহায়ক উপায়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের জনসংখ্যার অভিশাপকে আশীর্বাদে কিংবা জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে সঠিক ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। প্রযুক্তিগত কিংবা প্রায়োগিক দিক থেকে একটি জাতি যতই শক্তিশালী হোক না কেন যদি মানুষের যাপিত জীবনে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের মতো সুকুমারবৃত্তির পরিপূর্ণ ও সুস্থ বিকাশ না ঘটে, তবে সেই জাতির বিনাশ অনিবার্য। তাই এখনই আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা পাকাপোক্তকরণ ও সহজভাবে সংশ্লিষ্ট বিধি এবং নিয়মনীতি বিবৃত থাকতে হবে; অবশ্যপালনীয় নীতিমালা পরিবীক্ষণের জন্য নির্দেশনা থাকতে হবে, ওই সকল নীতিমালা পালন না হলে কী ধরনের পরিণতি হবে তাও সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে এবং পক্ষপাতহীনভাবে জবাবদিহিতার নীতিমালাগুলো প্রয়োগ করত কেউ নীতিবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকলে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্ব ও গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করার পাশাপাশি আমাদের অভিভাবকদের খুব বেশি সচেতন হতে হবে। এই প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এ সংক্রান্ত সব ধরনের গুজব ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ সবাইকে নিতে হবে। যে প্রযুক্তির কল্যাণে ফাঁসকৃত প্রশ্ন সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র, সেই প্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে প্রশ্নফাঁস রোধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩