প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রবাসী আয়

প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রবাসী আয়

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্পের পরের স্থানটি ধরে রেখেছে প্রবাসী আয়। খাত দু’টির আয়ের ওপর নির্ভর করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির সে ধারা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই রেমিট্যান্স প্রবাহে নি¤œমুখী প্রবণতা জেঁকে বসেছিল। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স কম ছিল সাড়ে ১৪ শতাংশ। মূলত রেমিট্যান্স প্রবাহ নি¤œমুখীতার জন্য দায়ী ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিরতা ও তেলের মূল্য পতন ও দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য কমে আসা। এ ছাড়াও ব্যাংকের তুলনায় খোলা বাজারে ডলারের মূল্য বেশি থাকায় ভিন্ন পথে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ঢোকায় রেমিট্যান্স কম এসেছে। আবার মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহারে হুন্ডিওয়ালারা অবৈধ পথে টাকা দ্রুত প্রবাসীদের আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দেয়ায় এ ধারায় নেতিবাচক প্রবাহের রেশ সহসাই কাটছেও না।

 রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার আর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, দক্ষ জনশক্তির অভাব। আমাদের দেশের আগ্রহীদের বিদেশ গমনের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে রেমিট্যান্স না বাড়ার মূলে রয়েছে অদক্ষ জনবলের আধিক্য। যারা অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দক্ষতার অভাবে ভাল মানের কাজে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারছে না। ফলে হাঁড় ভাঙ্গা খাটুনি খেটেও পারিশ্রমিক সে তুলনায় জুটছে না। মূলত এ কারণে জনশক্তি রফতানির হার বাড়লেও রেমিট্যান্স হারাচ্ছে দেশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় প্রবাসীদের সংখ্যা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু সে অনুপাতে প্রবাসী আয় বাড়বে না। তবুও শত প্রতিকূলতার মাঝেও সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে।


আব্দুল হাই রঞ্জু :বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১১১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার ও আগষ্টে ১৪১ কোটি ৮৫ লাখ রেমিট্যান্স আসে। পরবর্তী মাস সেপ্টেম্বরে হঠাৎ রেমিট্যান্স কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। তবে এ নেতিবাচক প্রবাহে পরিবর্তন এসে অক্টোবরে রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়ায় ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার। নভেম্বরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে। এটি অক্টোবর মাসের চেয়ে ৫ কোটি ১৯ লাখ ডলার বেশি। যা আগের অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলার বা ২৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি অর্থাৎ আগের অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে গড় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে।

 তবে, শংকার কারণ হচ্ছে, দালালদের হাত ধরে নানা প্রলোভনের কারণে অদক্ষ কর্মিদের বিদেশ গমন। যা আগেই বলেছি। দালালদের মাধ্যমে বিদেশে কর্মি প্রেরণ সংক্রান্ত ‘দ্য হোমকামিং প্রোফাইলিং দ্যা রিটার্নিং মাইগ্রান্ট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে থেকে অভিবাসী কর্মীর ৫১ শতাংশই দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও সাম্প্রতিক সময়ে ১ হাজার ২০০ জন প্রবাসী বাংলাদেশীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি অনুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হওয়া মোট শ্রমিকের ৮০ দশমিক ৬ শতাংশই যাচ্ছেন দালাল ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে। পক্ষান্তরে দেশের প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিবাসী হচ্ছেন মাত্র ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রবাসে যাচ্ছেন মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সরকারিভাবে বিদেশ গমনের এ হার যে উদ্বেগের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিদেশ গমনেচ্ছুকদের বাড়তি টাকা ব্যয় করতে না হয় এবং জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়রানির মুখে পড়ে যেন প্রতারিত কিম্বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়, সে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে বেশ ক’বছর প্রবাসীদের অন্যতম কর্মক্ষেত্র মালয়েশিয়া, সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানির হার তলানিতে এসে দাঁড়ায়।

মূলত সরকারের লক্ষ্য ছিল, জি-টু-জি পদ্ধতিতে জনশক্তি রফতানি করা সম্ভব হলে প্রতারণার আধিক্য কমে আসবে এবং সরকারিভাবে বিপুল পরিমাণ কর্মিকে বিদেশে প্রেরণ করা সম্ভব, বাস্তবে কিন্তু সরকারি সে উদ্যোগ শতভাগ সফলতা আসেনি বরং প্রবাসে যাওয়ার পথে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার জি-টু-জি পদ্ধতির পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে কর্মি প্রেরণের অনুমতি দিলে অচলাবস্থা ধিরে ধিরে কাটতে শুরু করে। ফলে জনশক্তি রফতানির হার বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যেই যার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে, এখন বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিদেশ গমন প্রতিবছরই কমবেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুত্র মতে, গত ২০১৫ সালে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন বাংলাদেশী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছে। যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জনে। আর ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭৭৩ জন বাংলাদেশী। জনশক্তি রফতানির ইতিবাচক এ ধারা আমাদের জন্য খুশির সংবাদ। কারণ ঘনজনসংখ্যার বাংলাদেশে যে হারে মানুষ বাড়ছে, সে হারে সরকারি বেসরকারিভাবে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম হাত কাজের অভাবে বসে বসে অলস সময় পাড় করছে। অথচ

কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃৃষ্টি করতে না পারলে প্রকৃত অর্থে দেশের সমৃদ্ধি আশা করা ঠিক হবে না। এজন্য বিপুল এই মানবসম্পদের প্রবাসে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হলে পরিবারগুলোর পাশাপাশি দেশে অর্থনীতি স্বাবলম্বি হবে। প্রবাস গমনে সে ধারা নানাভাবে প্রতিকূলে থাকায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। এজন্য সরকারের অদূরদর্শিতা এবং সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবকে দায়ি করতে হবে। মূলত মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদের পুরো সময় জুড়েই জিটুজি পদ্ধতি ব্যতিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তৎপরতা বলতে গেলে বন্ধই ছিল। যদিও ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সরকার সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে জনশক্তি রফতানির ইতিবাচক ধারা ফিরে আসে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে শুরু করেছে।  

মূলত জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে সরকারিভাবে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করায় বেশ ক’বছর ধরে অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। কক্সবাজার রুটে দালালদের দৌরাত্মও বৃদ্ধি পায়। দলে দলে কর্মপাগল যুব শক্তি দালালদের হাত ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিঙ্গায় ওঠে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার দুঃসাহসিকতাকে আলিঙ্গন করে এ পথ বন্ধুর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তা জেনেও শুধু একটু কাজের স্বপ্ন নিয়ে সাগর পাড়ি দিতে কতজনকেই না ট্রলার ডুবে সলিল সমাধির শিকার হতে হয়েছে। আর ভাগ্যগুণে কেউ কেউ সাগর পাড়ি দিলেও মাসের পর মাস জঙ্গলে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে কাজের সন্ধান করতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ অবৈধ অভিবাসীর অপরাধে বিদেশের কারাগারে মানবেতন জীবন কাটাচ্ছে। এটাই দুর্ভাগ্য, দেশের এবং আপনজনদের মায়া মমতা ছেড়ে যারা বিদেশে গিয়ে কাজ করে রুটি রুজি করতে চায়, তাদের সেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটুকু আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা নিশ্চিত করতে পারে না অথচ বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনার মানবসম্পদকে কাজে লাগানো সম্ভব হলে দেশে অর্থনীতিকে মজবুত করা সহজ হবে অর্থাৎ আমাদের দেশের মানবসম্পদই সমৃদ্ধি অর্জনের একমাত্র অবলম্বন। শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের নারী সম্পদও এখন বিদেশে পাড়ি দিতে প্রস্তুত। যদিও নিরাপত্তাজনিত নানা অভিযোগে এখন দেশের নারীরা বিদেশ গমনে অনেকটা বিমুখ হচ্ছেন। সরকার প্রবাসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে এ হার আরও প্রসারিত হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।

 যেহেতু দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেই নারী সেহেতু প্রবাসে নারীদের নিরাপদ কর্মক্ষেত্রকে নিশ্চিত করতে সরকারকে দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে হবে। বাস্তবে আমরা কথায় যতটা পটু, কাজে ততটাই ফাঁকিবাজ। এ অবস্থা সরকার থেকে শুরু করে প্রতিজনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে (?) প্রযোজ্য। আমাদের কথায় নয় কাজে পারদর্শি হতে হবে। বিশেষ করে বিদেশে নারীদের নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা দায়িত্ব সরকারের। সরকারের তরফে এ ক্ষেত্রে সামান্য শৈথিলতা প্রবাস গমনে নারীদের নিরুৎসাহিত করলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের পদচারণা সংকুচিত হবে। যা আমাদের গোটা অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। যদিও আমাদের দেশের নারীরা প্রবাসে কেন, দেশেও শতভাগ নিরাপদ নয়। যাদের প্রতি পদে পদেই ধর্ষণ, সহিংসতা ও নির্মমতার শিকার হতে হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে দেশে বিদেশে নারীদের নিরাপত্তা কর্মক্ষেত্রকে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে, সামাজিক আন্দোলন। তা না হলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীই ‘মানবসম্পদ’। এই মানবসম্পদের যথাযথ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। যাদের বিদেশের মাটিতে নির্বিঘœ গমনকে নিশ্চিত করতে পারলে এ সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব হবে।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৯২২৬৯৮৮২৮