প্রবল ইচ্ছে শক্তি-ই পারে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে পরাজিত করতে

প্রবল ইচ্ছে শক্তি-ই পারে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে পরাজিত করতে

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ:গত বছরের  অক্টোবর মাসটি  আমার জীবনের জন্য অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে হয়তবা অক্টোবর বিপ্লবের শত বছর পূর্তির কথা ভাবছেন। কিন্তু বিষয়টি ঠিক তা না, অক্টোবর বিপ্লব  একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটিতে আমার কোন সন্দেহ বা দ্বিমত নেই। তবে আমি বলছি অন্য অক্টোবরের কথা। বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল পঞ্চগড়ের  কথা। আমেরিকার কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ এবং  ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক নিলাম দিনসা কান্তা লুগোর সাথে প্রায় এক সপ্তাহের মত সময়  আমি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় কাটিয়েছি। তিনি ‘এশিয়ার ফারমার টু ফারমার’ কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। নিলাম দিনসা কান্তা লুগো পঞ্চগড়ের বোদায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে কমিউনিটির লোকজনদেরকে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেন। কিভাবে একজন সাধারণ মানুষ উদ্যোক্তা হতে পারে?  একজন উদ্যোগতা তার কোন কোন দিকগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেগুলোর উন্নয়ন করবেন এবং কিভাবে একজন সাধারণ মানুষ উদ্যোক্তা ভূমিকায় স্বনির্ভরশীল হওয়ার জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন ? এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে দৈনন্দিন সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হলে কিভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয় এবং নেতৃত্বে বিকাশে কোন কোন দিকগুলো পরিহার করতে হবে এবং কোন কোন বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে? এসব বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। আমি শুনেছিলাম বিদেশিরা নাকি খুবই বিনয়ী হয়, ছোট্ট একটা উপকারের বদলে মাথা নিচু করে ধন্যবাদ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন কিন্তু তাদের নিজস্ব স্বার্থের ব্যাপারে  তারা খুবই সজাগ এবং স্বার্থের জায়গাতে তারা  এক চুলও  ছাড় দিতে চান না। কিন্তু নিলাম দিনসা কান্তা লোগো ছিলেন একেবারেই আলাদা একজন মানুষ। সত্যিই তিনি অসাধারণ প্রশিক্ষক এবং অসাধারণ একজন মানুষও বটে।


নিলাম দিনসা কান্তা লুগোকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম আপনি তো অনেক দেশেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। সেই সব দেশের মানুষ এবং আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে প্রধান পার্থক্যটা কোথায়? উত্তরে তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশের মানুষ খুবই পরিশ্রমী এবং অতিথিপরায়ণ। আমি উত্তরটা শুেেন একটু অবাক-ই হয়ে গেলাম। কারণ দ্বিতীয় উত্তরটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত বটে কিন্তু প্রথমটির সাথে নয়। আমরা সবাই জানি বাংলাদেশের মানুষ খুবই অলস হয় আর বিদেশের মানুষগুলো খুবই পরিশ্রমী হয়। সেইজন্য তারা এতো উন্নত এত সমৃদ্ধশালী। আমরা বাঙালিরা যেহেতেু একটু অলস প্রকৃতির সেহেতেু উন্নতি বা সমৃদ্ধি কোনটিই আমাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। জন কেনেথের সেই দারিদ্র্যের থিওরির মত। জন কেনেথ দরিদ্রতা নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষদের  দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র থেকে বের হতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দরিদ্রতাকে মেনে নেয়া। কারণ আমরা প্রথম থেকেই মেনেই নেই যে, আমরা গরিব হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, আমাদেরকে সারাজীবন গরিব হয়ে থাকতে হবে। সুতরাং যা আছে  তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই ভাল। এছাড়াও আমরা হয়তবা উপনিবেশবাদকে আমাদের দরিদ্রতার পিছনে  প্রধান অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাই। কারণ আমরা সবাই খুব ভাল করেই জানি অন্যান্য সব জাতির দুটি করে হাত থাকলেও বাঙালি জাতির তিন নম্বর একটি হাত রয়েছে সেটির নাম অজুহাত। আমাদের এই ডান ও বাম হাত দুটি ভালভাবে না চললেও অজুহাতটি খুব চলে।

এই তিন নম্বর হাত তথা অজুহাত দেখিয়ে আমরা সব জায়গায় পার পেয়ে যেতে চাই। আমরা হয়তবা বলে থাকব যে, মোঘলরা আমাদেরকে ৪০০ বছর শাসন করেছে, বৃটিশরা আমাদেরকে ২০০ বছর শাসন করেছে এরপর আমরা পাকিস্তানিদের হাতে শোষিত হয়েছি, নির্যাতিত ও নিপীঁড়িত হয়েছি। এত সব অত্যাচার, অনাচার উপনিবেশবাদের কারণে আজকে আমরা গরিব হয়ে আছি। জন কেনেথ এরকম অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন যে  অনেক দেশ রয়েছে যারা কোন দিনই উপনিবেশবাদের শিকার হননি, কোন বিদেশী শক্তি দ্বারা শাসিত হননি। অথচ সেই দেশের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। অর্থাৎ তারা উপনিবেশবাদের শিকার না হয়েও আজও দারিদ্র্যর দুষ্ট চক্র থেকে বের হতে পারেনি। জন কেনেথ আরও দেখিয়েছেন এরকম অসংখ্য দেশ রয়েছে যারা উপনিবেশবাদের শিকার হয়েছে, দীর্ঘদিন শাসিত ও শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছে সেই দেশগুলো এখন উন্নত। সুতরাং উপনিবেশিক শাসনের কারণে যে আমরা দরিদ্র এটি ঠিক না। দরিদ্রতার আরও কিছু অজুহাত আমরা বরাবরই দিয়ে থাকি সেটি হচ্ছে আমাদের আবহাওয়া ভাল না, চাষাবাদের জন্য আমাদের অনুকূল পরিবেশ নেই, আমাদের পর্যাপ্ত জায়গা জমি নাই, যার কারণে আমরা দরিদ্র। এখানে জন কেনেথ দেখিয়েছেন যে, বহু দেশ রয়েছে যাদের পর্যাপ্ত চাষাবাদের জন্য জমি নেই, যাদের আবহাওয়া অনুকূল না, সেই দেশগুলোও উন্নতির চরম শিখরে পৌছেছেন। বরং এটা দেখা গেছে, যে দেশে যত বেশি প্রতিকূল পরিবেশ, সেই দেশগুলো ততবেশি উন্নত। সুতরাং মানুষ প্রতিকূলতার মোকাবেলা করেই উন্নতির চরম শিখরে পৌছে যায়।

 এখানে ঐতিহাসিক ও গবেষক আরনল্ড টয়েনবির উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আরনল্ড টয়েনবির জীবনের বিখ্যাত থিওরি হচ্ছে ’চ্যালেঞ্জ এন্ড রিসপনস’ অর্থাৎ প্রতিকূলতা ও মোকাবেলা। টয়েনবির তথ্যমতে মানুষ যখনি প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে ঠিক তখনি সেটির মোকাবেলা করে মানুষ নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছে। সুতরাং মানুষ যদি বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন না হত তাহলে মানুষের দ্বারা কোন কিছুই আবিষ্কার করা সম্ভব হত না। টয়েনবি এখানে মানুষের যাবতীয় অর্জনের পিছনে প্রতিকূলতাকেই প্রধান নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে আমরা যে এখন আধুনিক সভ্যতার যুগে বসবাস করছি এর পিছনে রয়েছে আমাদের বিভিন্ন রকমের চ্যালেঞ্জ। আরনল্ড টয়েনবি এখানে সভ্যতার উত্থান-পতন, ক্রম বিকাশ পিছনে তার চ্যালেঞ্জ এন্ড রিসপনস থিওরিকেই প্রধান হিসেবে দেখিয়েছেন। সুতরাং কেউ যদি এসে বলে যে আমাদের পর্যাপ্ত জায়গা জমি নেই, আমাদের অনুকূল পরিবেশ নেই এজন্যই আমরা গরিব, দারিদ্র্য, তাহলে এটি ভন্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক সেই কথাটিই জন কেনেথ সুন্দরভাবে ব্যাখা করে দেখিয়েছেন। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি কেন দারিদ্র্য?  এর উত্তর হবে যে আমরা মেনেই নিয়েছি যে আমরা দারিদ্র্য। সুতরাং আমরা দারিদ্র্য, আমরা গরিব। সত্যিকার অর্থে আমরা চাই না যে আমরা এই দারিদ্রের দুষ্ট চক্র থেকে বের হয়ে আসি। আমাদের এই মেনে নেয়া বা দরিদ্রতাকে স্বীকার করে নেয়ার প্রবণতাই আমাদেরকে দরিদ্রতা থেকে বের হতে দিচ্ছে না, আমাদেরকে উপরের দিকে উঠতে দিচ্ছে না।


সুতরাং বাংলাদেশের মানুষ যে খুব পরিশ্রমী নিলাম কান্তা লুগোর এই উত্তরে আমি ওনার সাথে দ্বিমত প্রশ্ন করলাম। তাকে আর একটি প্রশ্ন করলাম, বাংলাদেশের মানুষ যদি এতো পরিশ্রমী  হবে তাহলে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও বাংলাদেশ এত পিছিয়ে কেন? তার মানে একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য ৪৬ বছর কি যথেষ্ট নয়? একটি দেশের সামগ্রীক উন্নয়নের জন্য ৪৬ বছর কিন্তু অনেক। বাংলাদেশের অনেক পরে স্বাধীনতা অর্জন করেছে কিংবা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থা থেকে এখন বাংলাদেশের চেয়ে এখন অনেক এগিয়ে এরকম অনেক দেশই আছে। তার মানে এই না যে বাংলাদেশ ভাল করছে না। বাংলাদেশও ভাল করছে। তবে এই উন্নয়নের ধারাকে আরও একটু বেগবান করা যায় কিনা সেই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তবে একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রধান নিয়ামক হিসেবে পালন করে  সেই দেশের  ইনস্টিটিউশনগুলো কত উন্নত তার উপর। আমরা যদি আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন না নিয়ে আসতে পারি, আমরা যদি রাজনীতিতে ইতিবাচক চিন্তাভাবনার  প্রতিফলন ঘটাতে না পারি, তাহলে আমাদের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের মানুষ যে কতটা পরিশ্রমী


 আমরা যদি গার্মেন্টস শিল্পের কথা বলি, যেখানে নারী শ্রমিকদের সংখ্যায় বেশি। একটি দেশের অর্থনীতি নারীদের এত অবদান থাকা সত্ত্বেও একটি দেশ কিভাবে পিছিয়ে থাকে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে পরিমাণ শ্রম দেয় তার বিনিময়ে তাঁদেরকে যে বেতন দেয়া হয় এটাকে মানবিকতার চরম লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। নিলাম দিনসা কান্তা লুগোর মতে আমেরিকায় একজন শ্রমিকের একঘন্টা কাজের ন্যূনতম মূল্য ধরা হয় ১০ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী  টাকায় তা ৮২০ টাকা। তারপরেও তারা সন্তুষ্ট না। আমেরিকার  বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমিক নেতারা এখন আন্দোলন করছে যাতে করে দৈনিক কাজের ন্যূনতম মজুরি ১০ ডলার থেকে ১৫ ডলারে উন্নতি করা হয়। সেই তুলনায় আমাদের দেশের কী অবস্থা আমাদের দেশে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক গোটা এক মাস কাজ করে মাস শেষে তাদের হাতে ৫০০০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেয়া হয়। ঢাকা শহরের মত একটি ব্যয়বহুল শহরে মাসে ৫০০০ টাকা বেতন দিয়ে একটি পরিবার কিভাবে চলতে পারে।  অথচ এই বিষয়ে কারও কোন মাথা ব্যথাও নেই। আমরা যদি মনে করি যে আমাদের দেশে একটি প্রগতিশীল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে তাহলে আমাদের অর্থনীতির মূল জায়গাটিতে ফোকাস করতে হবে। কৃষি, কৃষক ও শ্রমিক বান্ধব একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
লেখক-সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮