প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও আমাদের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও আমাদের প্রত্যাশা

  নাজমুল হোসেন : ৪ দিনের সফরে নয়াদিল্লি গেলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের ইন্ডিয়ান ইকনোমিক সামিটের বাংলাদেশ বিষয়ক অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি গতকাল নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের এটি শেখ হাসিনার প্রথম ভারত সফর। বলা হচ্ছে রাজনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নের ধারা বজায় রাখাই এর মূল লক্ষ্য। আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফর না হলেও এই সফর নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে। সফরে তিস্তার পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা সংকট, আমদানি-রপ্তানির সঠিক ধারা বজায় রাখা, আসামের নাগরিকত্ব তালিকাসহ নানা ইস্যুতে আলোচনা-সমঝোতার কথা রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ টি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছ। সেখানে নরেদ্র মোদির সাথে বৈঠকের পরেই এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষর হবে। এছাড়া ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী রামনাথ কোবিন্দের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত ও কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করবেন তিনি। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর তিস্তাসহ আন্তঃসীমা নদীসমূহের পানি বণ্টনের বিষয়ে ‘চুক্তি কাঠামো’ স্বাক্ষরের ব্যাপারেও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু, তিস্তা চুক্তি, আর আসামের নাগরিকত্ব সংকট ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি সকল আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়, তিস্তা সহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের সহযোগিতা, সীমান্ত হত্যা সংকট নিয়ে। কারণ এই সব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে ভারতের উদাসীন মনোভাব। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে এসব সমস্যার সমাধানে? কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাথে এখনও আমাদের সম্পর্ক বাহ্যিকভাবে ভালো অবস্থানেই রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট ইস্যুগুলোতে তাদের ভূমিকার কোন অগ্রগতি লক্ষণীয় নয়। সম্প্রতি ভারত সরকার আমাদের আশ্বস্ত করলেও আসামের নাগরিকপন্থী নিয়ে বাংলাদেশের এখনই সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানালেন কূটনীতিকরা। আসামের স্থানীয় নেতাদের বক্তব্যের ব্যাপারে দিল্লির কাছ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য চাওয়ারও পরামর্শ দিলেন তাঁরা। এছাড়া এজেন্ডায় না থাকলেও তিস্তা সহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বণ্টনের ইস্যুটিতেও বাংলাদেশকে নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। সংশয় প্রকাশ করে  বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ইস্যুতে আলোচনা কতটা হবে বা আদৌ হবে কি না সে নিয়ে রীতিমত সংশয় রয়েছে। কারণ এ ব্যাপারে অতীতে সমাধান হবে, হচ্ছে, সম্ভাবনা আছে এমন অনেক প্রতিশ্রুতি জাতি দেখেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। হাসিনা-মোদির বৈঠকে তিস্তার সঙ্গে সকল আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের সহায়তা এবং সীমান্ত হত্যা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসাসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সকল দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়াসহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির চিত্রও সেখানে তিনি তুলে ধরবেন। এছাড়াও যৌথভাবে জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়েও বৈঠকে আলোচিত হবে। অন্যদিকে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির মন্তব্য করেছেন, প্রতিবারই ভারত সফরে প্রতিবেশীকে উজাড় করে দিয়ে আসে বাংলাদেশ তবে এদেশের কোন সমস্যার সমাধান হয় না। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের মানববন্ধনে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন- অন্তত এই সফরে ফারাক্কার বাঁধ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং তিস্তা পানির সঠিক হিস্যা আদায় করা হোক।
ভারতের সাথে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের শুধু মুখের কথায় বা বাহ্যিকভাবে নয় অভ্যন্তরীণভাবেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত মজবুত হোক। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দীর্ঘদিনের মানবিক বোঝার সংকট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের কঠোর অবস্থান, আসামের নাগরিকত্ব সংকটের সমাধান ও সীমান্ত হত্যা যেন শূন্যের কোঠায় চলে আসার ব্যাপারে অগ্রণী রাখুক এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক ঃ প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৭২-৩৯১৪৯১