প্রগতি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে সুখী সমাজ

প্রগতি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে সুখী সমাজ

আতাউর রহমান মিটন : গানে আছে  সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’! যে কোন দেশপ্রেমিক নাগরিকের মত আমিও বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব অনুভব করি। অন্য সকলের মত আমিও চাই দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকুক। গণভবনে পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হতেই পারে কিন্তু সাধারণ মানুষের রান্নায় পেঁয়াজ লাগে। পেঁয়াজের পরে চালের দাম বাড়ানোর খেলা শুরু হয়েছে। আমরা চাই না আবার চালের দাম বাড়–ক। বিশ্বের বহু দেশে সরকার খাদ্যে ভর্তুকি দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখে। এটা করা হয় যাতে কৃষক বা উৎপাদকের ক্ষতি না হয় আবার ভোক্তারাও যাতে দামের চাপে পিষ্ট না হয় সেটি নিশ্চিত করা। তবে বাংলাদেশে কেন খাদ্যে ভর্তুকি দেয়া যাবে না? বর্তমান পরিস্থিতি যে জনগণকে স্বস্তি দিচ্ছে না তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।
আমাদের পাশের দেশ ভূটান। দেশটিতে গরিব মানুষ আছে, আছে সম্পদ-বৈষম্য। তথাপি ভূটানের জনগণকে স্বস্তিতে রাখার জন্য সে দেশের প্রশাসন তৎপর। ভূটান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মাথাপিছু আয় নয়, হ্যাপিনেস বা সুখী হওয়াকে জাতীয় উন্নয়নের সূচক হিসেবে গণ্য করা হয় অর্থাৎ সরকার দেখে তার দেশের জনগণ কতখানি সুখে আছে বা সুখী বোধ করছে। বাংলাদেশে যদি সুখী বোধ করার সূচক দিয়ে অগ্রগতি মাপা  হয় তাহলে তার ফল কি হবে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।  
যে কোন সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনকল্যাণে কাজ করা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য ভাল হয় এমন যে কোন কিছু করাটাই যে কোন ভাল সরকারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। দেশের ভেতরে সিন্ডিকেট বা কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি সব সময় সক্রিয় থাকে কিন্তু একটি ভাল সরকার সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে যাতে করে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে তারা কোন অনৈতিক পদক্ষেপ না নিতে পারে। বাংলাদেশে এই সিন্ডিকেট বা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। না হলে পেঁয়াজ কেলেঙ্কারি বা চালের কালোবাজারীরা না হলে এত সাহস পায় কোথায়!
ভূটান আজ যে হ্যাপিনেস সূচক ব্যবহার করছে এর গোড়া পত্তন হয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে ১৬২৯ সালে। দেশটির প্রাচীন যে পরিচালনা বিধি সেখানে বলা হয়েছে, “যদি সরকার তার জনগণের জন্য সুখী সমাজ তৈরি করতে না পারে তাহলে সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার দরকার কী?” বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী এই দেশটিতে সুখী হওয়ার এই ধারণাকে মৌলিক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে প্রথম থেকেই। প্রকৃতির ছন্দময়তায় টিকে থাকা অপূর্ব সুন্দর এই দেশটির শাসকসহ নেতৃবৃন্দ এটা বিশ্বাস করেন যে, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি সমাজের বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। যে কোন সমাজকে টিকে থাকতে হলে তাকে অন্যান্য সকল প্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই টিকে থাকতে হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রয়োজন কিন্তু তা মানুষকে সুখী করবার জন্য যথেষ্ট নয়। সেই চিন্তার সূত্র ধরেই ভূটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক ১৯৭০ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জিডিপি দিয়ে কোন দেশের জনগণের মনের প্রশান্তি বা স্বস্তি পরিমাপ করা যায় না। তাই আমাদেরকে একটা নতুন ধরনের সূচক ব্যবহার করতে হবে। এই সূচককে তিনি বলেছিলেন ‘জিএনএইচ বা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস” সূচক।
ভূটানের জনগণের মধ্যে ‘জিএনএইচ’ ধারণা গেঁথে আছে। তাই ২০০৮ সালে তারা যখন রাজার শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে চলে আসে সে সময় সংবিধানেও তারা জিএনএইচকে তাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সূচক হিসেবে রেখে দেয়। ভূটানের জনগণ গর্বিত চিত্তে অনুভব করে ‘হ্যাপিনেস’ সূচকের দ্বারা তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল কার্যকরভাবে ফুটে ওঠে। জিএনএইচ এমন একটা সূচক যার মাধ্যমে রাষ্ট্রে জনগণের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা হয়। আমি ভূটানে গিয়ে নিজে দেখেছি সেখানে বিত্ত বৈভবের বাহুল্য না থাকলেও মানুষের চেহারায় একটা প্রশান্তির ছাপ রয়েছে। সেখানে গ্রামের বাড়িগুলোতে বা পথের ধারে থরে থরে লাল টুকটুকে আপেল ধরে থাকা দেখে চোখটা জুড়িয়ে যায়। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণায় সৃষ্ট নদীগুলোতে যে মধূর সুরেলা ধারার সৃষ্টি হয় তা দেহমনকে মুহূর্তে আবেশে ভরিয়ে দেয়! চিত্ত ব্যাকুল হয়, হৃদয় নেচে ওঠে মন ময়ূরের ছন্দে! আমি প্রায় ৫ বছর আগে ভূটানে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি, অনুভব করেছি সরকার ইচ্ছে করলেই দেশটাকে গড়ে তুলতে পারেন। সেটা করতে পারেন বন্দুকের নল দিয়ে নয়, বরং জনগণের মধ্যে ভালবাসাবোধ জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে। আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করে প্রাসাদ গড়ছি আর ভূটানে প্রকৃতিকে প্রাসাদের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা তাদের দেশকে বিশ্বের মধ্যে একটা স্বর্গ রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। এই চাওয়াটা দেশের সরকার প্রধান থেকে গ্রামের বাজারের একজন ক্ষুদ্র চাষীর। তারা সবাই দেশকে গড়ে তুলতে চায়, প্রকৃতি ধ্বংস না করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার সকলের মধ্যে।
জাতিসংঘ ঘোষিত মানব উন্নয়ন সূচকে শীর্ষ স্থান দখলকারী, শান্তির দেশ, পাহাড় আর প্রকৃতি ঘেরা মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়ানো কবিতার মত দেশ ভূটান। সেখানে গিয়ে আমি অনুভব করেছি ভূটান দেশটিতে বেড়াতে না আসাটা একটা বোকামি। আমার বিবেচনায় চমৎকার একটি দেশ, বাড়ির পাশে আরশী নগরের মত। ভূটান আমার কাছে জাপানের মতই সুন্দর। উচ্চ প্রযুক্তিহীন, প্রাণ ও পরিবেশের সম্মিলনে প্রশান্তিময় এক দেশ। সেখানকার আবহাওয়া, মানুষের মন, ব্যবহার, সংস্কৃতি এবং আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলো এখনও আমার মন ভোলায়! আমি চাই আমার সোনার বাংলাও একদিন প্রকৃতির অপরূপ ছোঁয়ায় বিশ্ব পর্যটকদের চিত্তকে এমনিভাবে ব্যাকুল করে দেবে!
বাংলাদেশটাও সুন্দর ও সম্ভাবনাময়। আমাদের দেশে হয়তো সামন্তবাদী রাজা বা রাজতন্ত্র নেই। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক জীবনে একনায়কত্ব বিরাজমান। মনোজগতের সেই নেতা একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হলে তাতে দোষের কিছু নেই।  আমরা অতিথি পরায়ণ জাতি। আমরা অন্যকে সম্মান করতে জানি। তাই বাংলাদেশের মানুষকে যদি পর্যটন বান্ধব হয়ে ওঠার শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে আগামীতে এদেশটিও বিশ্ব পর্যটনের তীর্থ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আন্তরিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বর্তমানের ঘুনে ধরা, সিন্ডিকেট নির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে সেই প্রগতিশীল ও পরিবেশ বান্ধব সোনার বাংলা গড়ে উঠবে না।
জাপান ও ভূটানের মধ্যে একটা জায়গায় খুব মিল। তা হচ্ছে নারী নেতৃত্ব ও সমাজে নারীদের কর্তৃত্ব। ভূটানে মেয়েরা কেবল ঘরের শোভা হয়ে বসে থাকে না। তারা সবাই ঘরে-বাইরে কাজ করে, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করে। নিজের পরিবার এবং দেশের কল্যাণের জন্য নারীরা মেধা খাটায়। ভূটানের নারীরা আমার চোখে খুবই সুখী। সম্ভবতঃ নারীরা সুখী বলেই ভূটানের সমাজ ও দেশ সুখের সূচক সহজেই বেছে নিতে পেরেছে। জীবনে দুঃখের উপাদানের অভাব নেই কিন্তু সুখী হওয়াটা যে নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে তা ভূটানের নারীরা জানে। তাই তারা নিজেরা সুখী থাকতে যেমন সচেষ্ট, তেমনি তাদের পরিবারকেও সুখী রাখতে সমান যতœশীল। আমার কাছে সুখের এই সহজ সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশে সুখী সমাজ গড়ে তুলতে হলে তাই নারীদের সুখী হবার সুযোগ তৈরী করতে হবে। সেই সুখ কেবল ভোগবাদিতা ও ঐশ্বর্য সঞ্চয়ের সুখ নয়। প্রগতি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে সুখী সমাজ গড়তে হবে।
ভূটান এর উদাহরণ দিলেও আমার মূল হাওয়া হচ্ছে একটি সুখী সমাজ নির্মাণ। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করার যে ভুল পথে আমাদের সমাজ হাঁটছে তা আমাকে শঙ্কিত করে। আমি চাই সরকার একটি প্রকৃতি বান্ধব নতুন ধরনের সুখী সমাজ গড়ে তোলায় মনোযোগ দিক। একটি সুখী সমাজ চাইলেই গড়ে তোলা যায়। এর জন্য বস্তুগত সম্পদের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। দরকার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ। দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টালে যে সমস্যার ধরন বদলে যায় সেটা আমরা এখনও বুঝতে পারছি না। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোর লক্ষ্য অপর পক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল করায়ত্ব করা। আর সে কারণেই আমরা এগুতে ব্যর্থ হচ্ছি। একদল এগিয়ে গেলে অন্যদল এসে তা পিছিয়ে দিচ্ছে। আমরা বারবার পারস্পরিক বিবাদে জড়িয়ে পড়ছি। আমাদের মধ্যে কল্যাণবোধ বা পরার্থপরতার মনোভাব তৈরি হচ্ছে না। হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিঘাত এর দুষ্টচক্র থেকে আমরা বেরুতে পারছি না। আমরা বুঝতে পারছি না যে, সত্যিকারের প্রগতি নির্ভর করে বস্তুগত, সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক উপাদানের মধ্যে একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উপর।
ভূটান তাদের জিএনএইচ সূচকে যে নয়টি ডোমেইন চিহ্নিত করে কাজ করছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো মানসিক কল্যাণবোধ বা সাইকোলজিক্যাল ওয়েলবিং। সমাজের সকল চাহিদাগুলো বিবেচনায় রাখার পাশাপাশি সরকার ও রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের মানসিক কল্যাণবোধকে সমগুরুত্ব দিয়ে থাকে। শরীর খারাপ থাকলেও বা অসুখে বিছানায় শুয়ে থেকেও যখন কেউ দুশ্চিন্তামুক্ত, দ্বিধাহীন ও ভাল বোধ করে, তখন তাকেই বলা হয় সাইকোলজিক্যাল ওয়েলবিং। জানা মতে, ৩৩টি সূচকের মাধ্যমে ভূটানের জিএনএইচ পরিমাপ করা হয়। জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক স্বকীয়তা, সময়ের সদ্ব্যবহার, মানসিক কল্যাণবোধ, সুশাসন এবং টেকসই সাংস্কৃতিক বিকাশ এই ৯টি ডোমেইনে ভূটানকে সুখী দেশে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ! আমাদের ভাগ্য আমরাই রচনা করব তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের নেতৃত্ব বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে এক নতুন ভাবমূর্তিতে প্রতিস্থাপন করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বটে কিন্তু যেভাবে দেশের ভেতরে সিন্ডিকেট এর শক্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে তাতে আমজনতার ভরসা কমে যাচ্ছে। সরকারকেই এর দায় নিতে হবে। শুদ্ধি অভিযানের আলোটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এর প্রদীপে আরও তেল ঢালতে হবে। জনগণের মনে বিশ্বাসের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের সুউচ্চ সেতু নিমিষেই ধসে যেতে পারে! তাই সরকারের কাছে আহ্বান, দয়া করে সুখী সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগ দিন।  আমজনতা সাথে থাকবে!
লেখক ঃ সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯