প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে আইন প্রয়োগ হোক

প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে আইন প্রয়োগ হোক

নাজমুল হোসেন  : ধূমপান হচ্ছে তামাক জাতীয় দ্রব্যাদি বিশেষ উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে শ্বাসের সাথে তার ধোঁয়া শরীরে গ্রহণের প্রক্রিয়া। সাধারণ যেকোনো দ্রব্যের পোড়ানো ধোঁয়া শ্বাসের সাথে প্রবেশ করলে তাকে ধূমপান বলা গেলেও মূলত তামাক জাতীয় দ্রব্যাদির পোড়া ধোঁয়া গ্রহণকেই ধূমপান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকগণসহ মোটামুটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, ধূমপান যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার সহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং ধারক ও বাহক। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী চার কোটি ১৩ লাখেরও বেশী মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছে। তারা পরোক্ষভাবে ক্ষতি করছে প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ মানুষের। ধূমপান না করেও কেউ যেন পরোক্ষভাবে এর কুফলের শিকার না হন, এ লক্ষ্যে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়সহ ২৪ ধরনের স্থানকে পাবলিক প্লেস ঘোষণা দিয়ে সেসব জায়গায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনে খোলা জায়গা পার্ক, মাঠ, বাস টার্মিনাল, স্টেশন, লঞ্চঘাট, রেস্তোরাঁ, খাওয়ার জায়গা যেখানে মানুষ জড়ো হয়, সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া আইনে শিশুসহ অধূমপায়ীদের পরোক্ষ ধূমপান থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান থাকলেও তা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সকল বড় বড় শহর, বাজার, স্কুল-কলেজের আশপাশের মত ব্যস্ত এলাকায় বেপরোয়াভাবে প্রকাশ্যে চলছে ধূমপান। তাঁরা তোয়াক্কা করছেন না পাশ দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষদের। সিগারেট পানে কখনোই কোন ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রকাশ পায় না। পাবলিক প্লেসে বা জনসম্মুখে বেশ বেপরোয়া ধূমপায়ীরা। তাদের কারণে বিষাক্ত ও বিরক্তিকর ধোঁয়া গিয়ে নাকে-মুখে লাগায় অনেকে প্রতিবাদ করলে তাদের কেউ কেউ আবার উল্টো ধমকের স্বরে জবাব দেন। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। গর্ভের সন্তানও এই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। পরম নির্ভরতায় শিশুটি বাবার পাশে বসে খেলছে। আর ধূমপায়ী বাবাই কিনা শিশুটির সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হচ্ছে না বুঝেই। শিশুরা এতে হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই শুধু পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন নয়, বাসায়ও ধূমপান পরিহার করা উচিত। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, একজন ধূমপায়ীর ধূমপানকালীন সময়ে কোন অধূমপায়ী উপস্থিত থাকলে তারও একই সমস্যা দেখা দেবে। সিগারেটের ধূমপানে নিকোটিনসহ ৫৬টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিরাজমান। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৬,০০,০০০ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১,৬৫,০০০-ই হলো শিশু। শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের কারণে নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার সহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগও দেখা দেয়। তামাক ও মাদক যে কোন মারণাস্ত্রের চাইতে ভয়াবহ। তামাক ও মাদকের নেশা যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধূমপান ও তামাকের নেশার মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করছে। এতে একদিকে তারা অসুস্থ্য হচ্ছে, কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে তাদের সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও ধূমপান বিরোধী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন স্তর মারফত জানা যায়, ধূমপান আইন মেনে না চলার প্রবণতা, জরিমানার পরিমাণ কম হওয়া এবং তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপট এসব কারণে আইন প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ২০১৩ সালের তামাক আইনের  আইন অনুযায়ী ওই সব স্থানে ধূমপায়ীকে অনধিক মাত্র ৩০০ টাকা জরিমানা করতে হবে। যা আইনের মধ্যেই শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে আইনের বিচারে এমন জরিমানা কঠিন পদক্ষেপের কোন অংশই হতে পারে না। আইন প্রয়োগকারি কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতার কারণেই আইনের প্রতি অনেকেই শ্রদ্ধাশীল হচ্ছেন না। একমাত্র বিড়ি, সিগারেট বা তামাক জাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো হয়ত সরকারি আইনের প্রতি লোক দেখানো শ্রদ্ধার অংশ হিসেবে প্যাকেটের গায়ে ধূমপানের কুফল সংক্রান্ত ২/১ টা ছবি ও বাক্য লিখে থাকে।
অন্যদিকে পাকিস্তান, ফিলিফাইন ও শ্রীলঙ্কায় প্রকাশ্যে ধূমপান করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুণতে হয়। এছাড়া তামাকজাত দ্রব্য বেচাকেনা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রথম দেশ হিসেবে রেকর্ড করেছে তুর্কমেনিস্তান। মূলত তামাকের ব্যবসা বৈধ হলেও অনৈতিক। তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সব তামাকের উপর উচ্চহারে কর বাড়াতে হবে। সচেতন জনসাধারণ চায় সরকার যেন দ্রুতই প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন-যাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
লেখক : প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক
nazmulhussen@yahoo.com
০১৭৭২-৩৯১৪৯১