পোশাকশিল্পের উন্নয়নে উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবি

পোশাকশিল্পের উন্নয়নে উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবি

 পোশাকশিল্পের উন্নয়নে নগদ সহায়তার অর্থকে যেকোনো ধরনের করের আওতামুক্ত রেখে ধার্য করা ১০ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।


একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পোশাক রপ্তানির মূল্য সংযোজনের ওপর (রপ্তানি মূল্যের ২৫ শতাংশ) ডলারপ্রতি অতিরিক্ত পাঁচ টাকা বিনিময় হার প্রদানের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠনটি।

সম্প্রতি গার্মেন্টসশিল্পে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা পণ্য রপ্তানিতে ক্লিয়ারেন্স, জাহাজীকরণ, ব্যাংক লোনে উচ্চ সুদসহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীরা ডলারের মূল্য পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পোশাক খাতে অস্থিরতা থাকায় ব্যবসায়ীরা কাজের অর্ডার পাওয়ার জন্য দাম কমিয়ে দেন। ফলে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের লোকসান গুণতে হয়। এসব সমস্যার কারণে গত ৯ মাসে ৫৯টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছে অনেক শ্রমিক। আর এ সঙ্কট দূর করতে গার্মেন্টস খাতের উন্নয়নের জন্য অন্যান্য দেশের মতো বাড়তি প্রণোদনা চেয়েছে সংশ্লিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা।

এরমধ্যে কোনো ধরনের শর্তবিহীন সব পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য ১ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তা প্রদান, দশমিক ২৫ শতাংশ হারে হ্রাসকৃত উৎসে কর ১ জুলাই ২০১৯ থেকে কার্যকর করা, সরকার কর্তৃক স্বীকৃত ও গেজেটকৃত এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের আওতাধীন বিবেচনাযোগ্য ১৩৩টি রুগ্ন শিল্পকে সম্পূর্ণ মূল ঋণ (২৩৮ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা) এবং সকল আরোপিত ও অনারোপিত সুদ ও কস্ট অব ফান্ডসহ সব চার্জ মওকুফ করা, বিপর্যস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষার জন্য ঋণ পুনঃতফসিলি করণের মেয়াদ দ্বিগুণ করা এবং বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাবনা দিয়েছে বিজিএমইএ।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আমরা জানিয়েছি তৈরি পোশাক খাতে উন্নতি করতে হলে পণ্য রপ্তানিতে ক্লিয়ারেন্স ও জাহাজীকরণে সময় এবং ব্যয় কমাতে হবে। ব্যাংক লোনে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা এবং ডলারের মূল্য পুনর্মূল্যায়নসহ আমরা বেশ কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছি। এছাড়া আয়করের পরিধি বাড়িয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে কর আদায়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তা নাহলে বায়াররা (ক্রেতারা) অন্য দেশে চলে যাবে। ফলে বাধ্য হয়েই আমাদের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বেকার হয়ে গেছে অনেক শ্রমিক। তবে আমরা কোথাও কোনো কর্মী ছাঁটাই করছি না। মূলত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছেন। বায়াররা অন্যদেশে চলে যাচ্ছে। অর্ডার না থাকায় আমরা লাইন বন্ধ করে দিচ্ছি। স্কিল লেভেলের শ্রমিকরা বেকার হচ্ছে। শ্রমিকদের বেকার হওয়ার বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। আমাদেরও ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।

জানা গেছে, প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে পোশাক খাতে প্রণোদনা হিসেবে ভারত সরকার রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য রেইমবারসমেন্ট অব ট্যাক্সেস অ্যান্ড ডিউটিস ফর এক্সপোর্ট প্রমোশন স্কিম বাবদ ৫০ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে এবং এই শিল্পের ওপর আরোপিত গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্সেস সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করেছে।

ভিয়েতনাম সরকার তাদের পোশাকশিল্পের জন্য করপোরেট কর প্রথম ৪ বছরের জন্য শতভাগ, পরবর্তী ৯ বছরের জন্য ৫০ ভাগ এবং পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য ১০ ভাগ রেয়াত দিয়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য এক্সপোর্ট রিফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করেছে।

এবিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় আমাদের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বায়ারদের মতে, আমরা দামের কারণে প্রতিযোগিতায় যেতে পারছিনা। ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে যে সাহায্য চেয়েছে সেগুলো ছাড় দিলে আমাদের প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে আশা করি। আমাদের সমস্যা হয় ক্লিয়ারেন্সের জন্য, জাহাজীকরণের জন্য অনেক সময় লাগে, বন্দরে দীর্ঘসময় থাকে। এ সবগুলো সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যাপারে কাজ করে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনা এবং বিক্রির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এজন্য ব্যবসায়ীরা ডলার রিভেলিউশনের কথা বলেছে। আর ব্যাংক ইন্টারেস্ট একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে গেছে। সেটা কীভাবে কমানো যায় এ বিষয়ে অর্থসচিব বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে কিছু বিষয় দেখবেন।

বৈঠকে উপস্থিত অর্থসচিব বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাংক ঋণ ও সুদের বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন।

এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, এসব ছোটখাটো সমস্যা যখনই আসবে আপনারা আমার কাছে আসেন। আমি তাৎক্ষণিক সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করবো। আর ট্যাক্সের বাড়তি চাপ কমাতে এ খাতে ট্যাক্স কিছুটা কমানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৯৬ শতাংশ বা ১২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩৪ শতাংশ বা ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। পোশাক খাতে নানাবিধ সমস্যার কারণেই প্রতিনিয়ত এই খাতের প্রবৃদ্ধি কমছে।

বিগত পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮) যুক্তরাষ্ট্রর বাজারে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ও ইউরোপের বাজারে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ পোশাকের দরপতন হয়েছে। সর্বশেষ অক্টোবরে পোশাকের সব আইটেমে মূল্যহ্রাস পেয়েছে। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অনেক কম।

ভিয়েতনামের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ভারতের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২৫ শতাংশ, পাকিস্তানের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ আর বাংলাদেশের দশমিক ৩৩ শতাংশ।

সার্বিকভাবে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চার বছরে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩০ দশমিক ১ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ ও চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা প্রধান ৩০টি পোশাক পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের ১৬টি প্রধান পোশাক পণ্য রয়েছে। এই ১৬টি পণ্যে বিগত ৫ বছরে দেশের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ১২ শতাংশ। যেখানে ভিয়েতনামের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭ শতাংশ।