জেনেভা ক্যাম্পে আটক ৫১

‘পুলিশ যাগোর টাকা খায় তাগোরে তো ধরে না’

‘পুলিশ যাগোর টাকা খায়  তাগোরে তো ধরে না’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ৫১ জনকে আটক করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।  বুধবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া অভিযান প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে।

অভিযানকালে ক্যাম্পে আজমেরি নামে এক মা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘যাগোর টাকা খায় তাগোরে তো ধরে না। আমার ছেলেটা ছোট। ধইরা নিল।’ প্রায় াকেই সময় হাতে একটি বিয়ের দাওয়াত কার্ড নিয়ে ঘুরছিলেন মুন্নি নামের এক তরুণী। তার ভাই রাজুকে ধরে নিয়েছে পুলিশ। মুন্নি একে-ওকে ধরে বলছেন ভাইকে ছেড়ে দিতে। আগামী সোমবার তার ভাইয়ের বিয়ে। মুন্নি বলেন, ‘ভাই সেলুনে কাজ করে। কয়দিন পর বিয়ে। আমার ভাইটারে বিনা দোষে নিয়ে গেল।’ ধরে নিয়ে যাওয়া আরেকজনের স্বজন বলছেন, তার ভাইয়ের হাতে কাটা দাগ দেখে পুলিশ সন্দেহ করে ধরে নেয়। পুলিশের সঙ্গে বাগ্বিতন্ডায় জড়াতে গেলে তাদের বলা হয়, অভিযান শেষে থানায় গিয়ে যোগাযোগ করতে। যাচাই-বাছাই করে ছেড়ে দেওয়া হবে।

অভিযানকালে ক্যাম্পের ভেতরে ঢোকার মুখে পুলিশ সদস্যরা ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন। কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দিচ্ছিলেন না। অভিযান চলাকালে, পুলিশ বিভিন্ন বাসায় গিয়ে একেকজনের নাম জিজ্ঞাসা করে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে নেয়। কয়েকটি বাসায় তালা ভেঙে ঢুকে তল্লাশি চালায়। এর মধ্যে ‘চুয়া সেলিম’ নামের একজনের বাসা খোঁজে পুলিশ। তার বাসা সন্দেহেও একটি বাসার তালা ভেঙে তল্লাশি চালানো হয়। ওই বাসার নিচের তলার বাসিন্দা অবশ্য বলেন, ‘চুয়া সেলিম’ নামের কেউ ওখানে থাকে না।

তল্লাশি শেষে এক পুলিশ সদস্য জানান, ভেতরে কাপড়চোপড় ও আসবাব ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিযানকালে ক্যাম্পে পুরুষের চেয়ে নারীদেরই বেশি দেখা যায়। গলি ও ঘরের সামনে নারীরা বসে ছিলেন। তাদের অভিযোগ, ‘নির্দোষ ব্যক্তিদের ধরা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তারা আগেই পালিয়েছে।’ তাদের দাবি, ঢাকায় অভিযানের খবর পেয়েই মাদক ব্যবসায়ীরা ক্যাম্প ছেড়েছে। কেউ কেউ পুলিশের সাথে ‘সুরাহা’ করে ক্যাম্পের আশপাশে গোপনে অবস্থা নিয়েছে। ক্যাম্পে নীরীহ খেটে খাওয়া মানুষগুলো ‘সাহস করে’ অবস্থান করছিল। আর তাদের উপরই চললো এই অমানবিক নির্যাতন।  অবশ্য মাদকবিরোধী এই অভিযান প্রথমদিকে শতভাগ সমর্থন পেলেও একটি ‘ক্রসফায়ারের’ অডিও প্রকাশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে  সরকারকে অর্জন দেখাতে ‘মাদকসেবীদের মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে ইয়াবা রিকভারি দিয়ে’ মামলা দেওয়া এবং এই সুযোগে ব্যক্তি আক্রোশ মেটানোর মতো অভিযোগ ওঠার পর কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এই অভিযান। এছাড়া অভিযানের মাস কেটে গেলেও এখনও মাদকদ্রব্য সহজলভ্য থাকায় অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


অভিযান শেষে মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ওয়াহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবেই আজকের এ অভিযান। পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের ৩০০ সদস্য এ অভিযানে অংশ নেন। ইয়াবা পাওয়া গেছে ৭০০। সন্দেহভাজন হিসেবে ৫১ জনকে থানায় নিয়েছি। যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা বাসা তালাবদ্ধ করে পালিয়েছেন। যারা পালিয়েছেন, তারা যেন চিরতরে পালিয়েই থাকেন। ক্যাম্পে যাতে তারা ফেরত না আসেন, পুলিশ সেই ব্যবস্থা নেবে। তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দিনের বেলা অভিযান চালানোর ব্যাপারে এই উপকমিশনার বলেন, এ জায়গাটি স্পর্শকাতর। পাশে গণভবন রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে তারা অভিযান চালান।


অভিযানের আগেই পুলিশের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে পালিয়ে যায় কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযানের ব্যাপারে তারা জেনেছেন সকালে। এ ছাড়া আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানাকে জানানো হয়েছে ঘেরাও করার পরে। আগে খবর পাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।