পিতার কাছে একদিন

পিতার কাছে একদিন

ইসলাম রফিক: হুট করেই চাকরিটা হয়ে গেল। ফলে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি চাকরিতে যেতে চাইনি। অভাবের সংসার। চার ভাইকে খাওয়ানো, পরানো আর লেখাপড়ার খরচ দেয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছিল বাবার জন্য। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষ আমাদের বাবা। সহজ-সরল মানুষ, যুগের সাথে মেলে না। চার ভাই আমরা। আমি, জহুরুল, জিয়া আর জিয়াম। ছোটকালে সব পরিবারে যা ছিলো, আমাদেরও তাই। খাবার নিয়ে টানা হেঁচড়া, কাপড় চোপড়ের অভাব, পড়াশোনার কষ্ট। তবে সবকিছুর পরেও চারভাই, মা-বাবা মিলে যখন সকাল দুপুর রাতে খেতে বসতাম, তখন স্বর্গ থেকে সুখ নেমে আসত আমাদের বাড়ীতে, আমাদের খাবারের টেবিলে। আনন্দ-বেদনার কাব্য আমাদের জীবন। পয়সার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হয়না, ভাল কাপড় চোপড়ের অভাবে মুখস্ত পড়াটি কলেজে বলা হয়ে ওঠে না, পাছে আমার রং চটা গেঞ্জিটা বন্ধুদের চোখে পড়ে। এইভাবেই দিনযাপন, ছাত্রজীবন পার করা। স্কুল কলেজে কত ঢংয়ের জীবন চলে। আমার কিছুই ছিলো না। না জীবন না ছাত্র জীবন। তাই চাকরিটা হয়ে গেলে আর না করতে পারলাম না। যখন বাসায় নিয়োগপত্রটা আসে তখন আমি নানা বাড়িতে। আমার নানাবাড়ী পাঁচকাতুলী গ্রামে, গাবতলি উপজেলায়। ছোটবেলার কত খেলনা সময় কেটেছে সেখানে। খালাত ভাইদের সাথে, মামাদের সাথে। গরমকালে  জোসনা ভরা রাতে উঠোনে সব ভাই মিলে ঘুমানো। আহা ! কী আনন্দ। ‘দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় বন্দী’। ভালইতো চলছিল। চাকরিটা এসে বাধ সাধল। আমার আর যুবক হয়ে ওঠা হলো না। কোহিনুরকে পিছনে রেখে, সেই দূর গ্রাম সাগাটিয়ায় ফেলে, আমাকে যেতে হলো গোপালগঞ্জ জেলায়। ৬৪ জেলার এক জেলা। ৬৪ জেলার নামই তখন জানি না। এখনও কি জানি ? যাওয়ার আগে কত প্রস্তুুতি। জেলার অবস্থান কোনদিকে, কীভাবে যেতে হবে, কত সময় লাগবে, আমার সাথে কে যাবে, আরও কত কী। আম্মা তো ভয়ে অস্থির। যে ছেলে কখনও বাড়ী ছেড়ে একদিনও থাকেনি, সে কীভাবে থাকবে চাকরিতে ? মায়ের সে কী কান্নাকাটি। নিরালার সাথে প্রেমটা কেবল জমে উঠছে, সেই প্রেম ছেড়ে দূর দেশে কে যেতে চায় বলো, তবুও যেতে হবে। কোহিনুর, নিরালা আর আমার প্রিয়       
মাকে পিছনে ফেলে যেদিন গোপালগঞ্জে রওনা দিলাম, সেদিন আমার সঙ্গী হয়েছিলো, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মামুন। বর্তমানে ভায়রা ভাই। আমিই বিয়ে দিয়েছি, বন্ধুত্ব টিকাবো বলে, এখনও খুব চমৎকারভাবে আমাদের বন্ধুত্ব টিকে আছে। ৭ নভেম্বর ১৯৯৩ তারিখে ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ গোপালগঞ্জে পৌঁছি। বগুড়া থেকে নগরবাড়ী, নগরবাড়ী থেকে দৌলতদিয়া ঘাট, দৌলতদিয়া থেকে টেকেরহাট, টেকেরহাট থেকে গোপালগঞ্জ। বিস্তর রাস্তা, সময় আর শ্রমে, ক্লান্ত আর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে গোপালগঞ্জে পৌঁছে একটা হোটেলে রাত্রি যাপন। তারপর ভোরে, ঘুরতে ঘুরতে অফিস খোঁজা। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল থানা পাড়ায়। তিনতলা বিল্ডিং, ১ম ও ২য়  তলা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের জন্য ভাড়াকৃত।
জীবনের প্রথম কোন অফিসে যাওয়া। পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা নাই, কী করতে হয়, কীভাবে করতে হয়, জানিনা। শুধু জানি, অফিসে যেতে হবে। প্রথম অফিসে যেয়ে যে মানুষটিকে পেলাম, তার নাম সাইদ ভাই। ক্যাশিয়ার। ভারপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষক। এই লোকটির কথা না বললেই নয়, বিদেশ বিভূইয়ে এরকম একজন মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। লিয়াকত ভাই, হানিফ ভাই, প্রেমাশিষ, ইব্রাহিম সবার কথা আজ মনে পড়ছে। এতদিন পড়ে কাউকেই আর ভুলতে পারছি না। অফিসিয়াল সমস্ত কাজে সাহায্য করতেন সাইদ ভাই। অর্থের প্রয়োজন হলে সাইদ ভাই, অফিসে থাকার ব্যবস্থা করলেন সাইদ ভাই। অফিস শেষে তার সাথে ঘুরে বেড়ানো, সিনেমা দেখা, বিকেলের নাস্তা সব সাইদ ভাই। সাইদ ভাই, আপনাকে কোন দিন ভুলব না। এতদিন পরে, এতদূর থেকে আপনার জন্য অনেক ভালবাসা।
গোপালগঞ্জের আর একজন মানুষের কথা বলতে হয়। শ্রদ্ধেয় বাচ্চু কমিশনার। আমার অফিস ছিল থানাপাড়ায়। পাশেই তার বাসা। অত্যন্ত ¯েœহ করতেন এই ভদ্রলোক । আমি নিশ্চিত এতদিনে তিনি বেঁচে নাই। ২৪ বছর আগেই তার বয়স ৫০ অতিক্রম করেছিলো। গোপালগঞ্জের অনেক স্মৃতি। ভোলা কঠিন। মাত্র ৬ মাসের চাকরি। প্রতিদিন সকালে উঠে হাঁটতাম আর ভাবতাম আমি মারা গেলে আমাকে বগুড়ায় পৌঁছানোর লোক পাবো না। আমার মা বোধ হয় আর কোনদিন আমাকে দেখতে পাবেন না। সেই অল্প বয়সে গোপালগঞ্জ তখন অনেক দূরের জেলা, নক্ষত্রের কাছাকাছি।
সাইদ ভাইয়ের সহযোগিতায় অফিসেই থাকার ব্যবস্থা, খাওয়ার ব্যবস্থা। নিজে রান্না করে খাওয়া। এখন মনে হয়, কোন  মেসে থাকতে পারতাম, আনন্দ আহলাদে দিন কাটিয়ে যেত। কিšুÍ তখন বিষয়টা মাথায় আসেনি, কেননা মেসে কোনদিন থাকিনি, থাকতে হয়নি। ফলে বন্দীর মতো জীবন কাটে। হুমায়ূন আহমদের বই পড়ি। এক বই একাধিকবার পড়ি, বার বার পড়ি। তবুও সময় কাটে না। বাড়ির কথা মনে আসে, প্রেম ভালোবাসা, বাল্যবন্ধু, স্কুল কলেজের বন্ধুরা মাথায় এসে ঢুকে থাকে, মাথায় এসে ভর করে থাকে নিরালা নামে এক ভুত। মা বাবা ছোট ভাইয়ের কথা খুব মনে হয়। আমার সব ছোট ভাই জিয়ামের কথা খুব মনে পড়ে। কেবল পড়াশুনা শুরু করছে। আমাকে চিঠি লিখত, আপনি’র বদলে ’আতনি‘ সম্বোধন করে।
চাকরিতে যোগদানের প্রথম সপ্তাহে দেখতে গেলাম সেই জায়গাটা, যেটা সব বাঙালিই দেখতে চায়। পরম আকাঙ্খিত। যিনি জন্ম না নিলে বাঙালি ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যেতো, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, মহান নেতা, জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর মাজার। আমার অনেক দিনের সাধ পূরণ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অফিসের গাড়িতে গমন। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভাল না, গাড়ি চলতে থাকে স্লথ গতিতে, হেলতে দুলতে দুলতে চলা। গ্রামীণ পরিবেশে পথ চলি। যখন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে গিয়ে নামি, সে এক অন্যরকম অনুভূতি, অন্য রকম অনুরণন।
বঙ্গবন্ধুর মাজারের যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা আমাকে মর্মাহত করে, আমাকে অন্ধকারের অতল গহবরে নেমে আনে। ইটের রাস্তা ঘেঁষে বাউন্ডারী ওয়ালের ভিতর বঙ্গবন্ধুর মাজার। ইটের কর্ণার উঁচু করে কবর চারধার দিয়ে ঘেরা, কবরের উপর ঘাসফুল, পিতাকে ছায়া দিচ্ছে। এত অবহেলা ! সামনে প্রশস্ত জায়গায় খড় বিছানো, রাতে সেই খড়ে বসে সম্ভবতঃ পাড়ার মানুষের আনাগোনা। অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাগে, ক্রোধে, মনটা বিষণœ হয়ে গিয়েছিলো। এত বড় একজন নেতাকে, এত অবহেলায় রাখা হয়েছে ! ভিতরে যন্ত্রনা মোচড় দিয়ে ওঠে, একা একা বক বক করি। কাকে যেন গালি দেই, নিজেকে বোধ হয়। কোন দেশে বাস করছি আমরা। জাতি হিসেবে আমরা কত অকৃতজ্ঞ। দোতলায় গেলাম। পলেস্তারা খসে  পড়ছে, সার করে সাজানো বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের ছবি, যারা নিহত হয়েছেন তাঁর সাথে ১৫ আগস্ট সেই কলংকময় রাতে। নভেম্বর ১৯৯৩ সাল। পরিদর্শন খাতায় কিছু লিখলাম। কী লিখেছিলাম তা আজ আর মনে নাই, তবে এই করুণ অবস্থার কথা যে লিখেছিলাম তা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। অনেক বেদনা নিয়ে ফিরেছিলাম সেদিন।
জাতি হিসেবে আমরা কত বড় অকৃতজ্ঞ হলে এই মহান নেতা, যিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মদাতা তাকে আমরা ভুলে থাকতে পারি। তার সেই ইটে ঘিরে সাদামাটা কবর, যার উপর ছোট ছোট ঘাসফুল ছায়া দিয়ে যাচ্ছে, সেই স্মৃতি যেমন কষ্টের, যেমন বেদনার তেমনি জীবনের একটা বড় সঞ্চয়। চোখে সেই স্মৃতি এখনো লেগে আছে। ২৪ বছর হতে চলল বঙ্গবন্ধুর মাজারে আর যাওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নতুন আদলে সাজিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর মাজারকে। কিন্তু ২৪ বছর আগের সেই বাড়ি, সেই কবর, খড় বিছানো উঠোন, সেই স্মৃতি এখনও আমাকে সময়ে অসময়ে কাঁদায়।
আজ জন্ম শতবার্ষিকীতে পিতা, তোমার প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম।

লেখক ঃ কবি, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক
সভাপতি, বগুড়া লেখক চক্র
[email protected]
০১৭১২-৬২৬৪২৬