পিতামাতার ভরণপোষণে অনীহা দন্ডনীয় অপরাধ

পিতামাতার ভরণপোষণে অনীহা দন্ডনীয় অপরাধ

এড. মোঃ মনতেজার রহমান মন্টু :সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টির সেরাজীব হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। সেই সেরাজীব মানুষের মধ্যে আবার পিতামাতাই সেরা। পিতামাতা ছাড়া আমরা পৃথিবীর আলোর মুখ দেখতে পারতাম না। সেই পিতামাতা যখন অর্ধাহারে অনাহারে থাকে মানুষের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ, চাকরের কাজ করে, ভিক্ষাবৃত্তি করে, বাড়ি ছাড়া করেÑআর তাদের সন্তানেরা এসি দিয়ে বড় বড় বিল্ডিংয়ে ঘুমায় তখন পিতামাতা বড় দুঃখ কষ্টে বলে আগে যদি জানতাম এই সন্তানদের দ্বারা আমাদের এই দশা হবে তাহলে শিশু কালেই মুখে লবণ দিয়ে মারতাম। এইরূপ উপলব্ধি আমরা করলেও পিতা মাতা কোনদিন সন্তানের অমঙ্গল কামনা করে নাÑএটাই পিতামাতার ধর্ম মহৎ গুণ। আমাদের এই উপমহাদেশ এক সময় বৃটিশেরা শাসন করতো। তারা শাসন করতে এসে দেখেছে এই অঞ্চলে মুসলিম হিন্দুদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে বৈধ সন্তান জন্ম দেয়। আর শেষ বয়সে সন্তানেরা পিতা মাতাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় কোন ভরণপোষণ দেয় না। এজন্য সর্ব প্রথম ১৮৯৮ সালে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৪৮৮ ধারায় স্ত্রী সন্তানাদির ভরণপোষণের আইন করেছিল। এই আইনটি প্রশংসাও পেয়েছিল। কিন্তু পিতামাতার ভরণপোষণের আইন করে যায় নি। স্ত্রী তার স্বামীর নিকট থেকে, শিশু সন্তান তার বাবার নিকট থেকে, ভরণপোষণের দাবি করতে পারতো এবং এর ফলও পেতো। কিন্তু বৃদ্ধ পিতা মাতা ভরণপোষণ কার নিকট থেকে চাইবে? বৃটিশ আমলে স্বামী ভয়ে স্ত্রীর এবং শিশু সন্তানের ভরণ পোষণ দিতো। কেননা এই আইন পালনে ব্যর্থ হলে প্রতি মাস ভরণপোষণের ব্যর্থতায় দায়ে ১ মাস করে কারা দন্ডের বিধান ছিল। স্ত্রী শিশু নাবালক সন্তানের আইন থাকলেও পিতামাতা অবহেলা অনাদরেই পড়ে থাকতো।

পরবর্তীতে এরশাদ সাহেবের শাসন আমলে ১৯৮৫ সালে একজন সহকারী জজকে দিয়ে ৫টি বিষয় বিচারের জন্য পারিবারিক আদালত গঠন করা হয়েছিল। সেই ৫টির মধ্যে ১টি হলো ভরণপোষণ। এই ভরণপোষণের মোকর্দ্দমা করতো স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধেÑএকই সাথে শিশু নাবালক সন্তানদেরও ভরণপোষণ চাইতো। আমার ওকালতি বয়সে কোন বৃদ্ধ পিতামাতাকে সন্তানদের বিরুদ্ধে ভরনণপোষণের মোকর্দ্দমা করতে দেখিনি। আর আইনও আছে কিনা কেউ জানতো না। আর এই আইন দেখিয়ে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের ৪ জন জাদরেল বিচারপতি। এই ৪ জন বিচারপতির মধ্যে প্রথম ৩ জনও ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি। তারা হলেন প্রধানপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি আব্দুর রউফ। তারা ১টি মোকর্দ্দমার রায়ে বলেছেন শুধুমাত্র স্ত্রী সন্তানের ভরণপোষন নয় পিতামাতা দাদাদাদী এমন কি নানা নানীও ভরণপোষণের জন্য পারিবারিক আদালতে মোকর্দ্দমা করতে পারবে। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিক দেওয়ানী অর্থাৎ সিভিল আইন দেখে ভয় করে কম।

 এজন্য বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বিষয়টি উপলব্ধি করে পিতা মাতার ভরণপোষণের জন্য একটি চমৎকার আইন করে নাম দিয়েছেন “পিতা মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩” এই আইনের ৪ ধারায় ছেলে মেয়েদের সাবধান করে দিয়ে বলা হয়েছে বৃদ্ধ পিতা মাতা যেন কোন ক্রমেই বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাস না করে। আবার ৪(ক) ধারায় বলা হয়েছেÑপিতার সাথে দাদা দাদীকেও এবং ৪(খ) ধারায় মাতার সাথে নানা নানীকেও ভরণপোষণ দিতে হবে। এমনকি বৃদ্ধদের সন্তান জীবিত না থাকলে নাতিরা তাদের ভরণপোষণ করতে বাধ্য। শুধুমাত্র প্রচলিত আইন নয় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই আইন দেশের আলেম সমাজ প্রশংসা করেছেন। এই আইন ফৌজদারী জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টে দায়েরের বিধি ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপযুক্ত সন্তানেরা বৃদ্ধ পিতামাতাকে কিভাবে ভরণপোষণ দিবে তা আলোচনা করে নিবে। যদি ভরণপোষণে ব্যর্থ হয় তাহলে এই আইনের ৫(১) ধারা মত ১ লক্ষ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ০৩ মাসের কারাদন্ডের বিধান করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে দন্ডিত সন্তানের চাকুরী করা ভাল জায়গায় অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়বে। সর্বোপরি কোন সন্তানের পিতা মাতা যদি আদালতে বিচার চায় সেই পিতা মাতা যেমন দূর্ভাগা আবার যে সন্তান আসামী হলো সেই সন্তান আরও দূর্ভাগা। তাই সন্তানের সজাগ থাকা প্রয়োজন যে, আদালতে যেন বিচারের সম্মুখীন হতে না হয়।
লেখক ঃ সাবেক স্পেশাল পি. পি.
বগুড়া এবং কলামিষ্ট
০১৭১১-৪২৫৯৮১