পিতা-মাতার হক

পিতা-মাতার হক

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক : আল্লাহর হক আদায় করা যেমন ফরজ, বান্দার হক আদায় করাও তেমন ফরজ। আর বান্দার হকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হল পিতা-মাতার হক। পিতা-মাতা আমাদের দুনিয়াতে আসার ওসিলা। তারা যে আদর-যতœ করে আমাদের লালন-পালন করেছেন। ওই আদর যতœ না পেলে আমরা বেঁচে থাকতে পারতাম না। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালবাসা অকৃত্রিম ভালবাসা, নি:স্বার্থ ভালবাসা। মহানবী (সাঃ) বলেন, “সত্যিকার মুসলমান সেই, যার জবান ও হাত দ্বারা কোনো মুসলমান কষ্ট পায় না”। (মুসলিম শরীফ) তাই নামাজ, রোজা যেমনি ফরজ মুয়াশারাত রক্ষা করাও তেমনি ফরজ। অথচ আমরা লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত। বিধায় পিতা-মাতার হক আদায়ে যথেষ্ট ত্রুটি করি এবং তাদের আনুগত্যের আবশ্যকতা জ্ঞাপক কুরআন ও হাদিসের বর্ণনাসমূহকে উপেক্ষা করে তাদের হক অনাদায়ের অভিশাপ নিজেদের মাথায় চাপিয়ে নিই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা আমানত তার হকদারকে পৌঁছে দিতে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায় পরায়ণতার সাথে বিচার করবে”। (সূরা: নিসা,আয়াত: ৫৮) আর রাসূল (সাঃ) বলেন, “নিশ্চয় তোমার আত্মারও তোমার কাছে প্রাপ্য হক রয়েছে”। (মিশকাত)
তাই প্রত্যেকেরই হক আদায় করতে হবে। তবে পিতা-মাতার হক অন্যতম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করনা এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।
তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপণীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলনা এবং তাদেরকে ধমক দিওনা এবং বল তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, ন¤্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল, “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগীরা” অর্থাৎ “হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন”। (সূরা: বনী ইসরাঈল, আয়াত:২৩-২৪) ইমাম কুরতুবী (রাঃ) বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার আদব, সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সাথে একত্রিত করে ফরজ করেছেন। যেমন, সূরা লোকমানে নিজের শোকরের সাথে পিতা-মাতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করেছেন। এতে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার ন্যায় পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও জরুরি। (মাআরিফুল কুরআন) জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রশ্ন করল, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, সময় হলে নামাজ পড়া। তারপর কোনটি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। (বুখারী) সমস্ত মানুষের মধ্যে মাতা-পিতার অধিকার সবচেয়ে বড়। মুসলিম শরীফে আছে “মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত”। নবীজি (সাঃ) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত। (তিরমিজি) অন্য হাদিসে বলেন, পিতা-মাতার ব্যাপারে আল্লাহর অনুগত হয়ে যার সকাল হয়, তবে তার পিতা-মাতা উভয়ে জীবিত থাকলে তার জন্য জান্নাতের দুটি দরজা খোলা হয়। আর যদি তাদের একজন জীবিত থাকে তবে জান্নাতের একটি দরজা খোলা হয়। পক্ষান্তরে সে যদি পিতা-মাতার বিরুদ্ধাচারী হয় তবে তার জন্য জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা হয়। আর তাদের একজনের বিরুদ্ধাচারী হলে জাহান্নামের একটা দরজা খোলা হয়। একথা শুনে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, জাহান্নামের এই শাস্তিবাণী কি তখনও প্রযোজ্য যখন পিতা-মাতা ওই ব্যক্তির প্রতি জুলুম করে? তিনি তিনবার বললেন, যদি পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি জুলুম করে তবু পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে। (মিশকাত শরীফ) এতে প্রমাণিত হয় পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সন্তানের নেই এবং তারা জুলুম করলে সন্তান তাঁদের খেদমত ও আনুগত্য করা ছাড়তে পারবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবীজি (সাঃ) বলেছেন, যে সেবাযতœকারী সন্তান পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে, তার প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে সে একটি মকবুল হজে¦র সওয়াব পায়। লোকেরা আরজ করল, সে যদি দিনে একশবার এভাবে দৃষ্টিপাত করে? তিনি বললেন, হ্যাঁ! একশবার দৃষ্টিপাত করলে প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে এই সওয়াব পেতে থাকবে। সুবহানাল্লাহ। তাঁর ভান্ডারে কোন অভাব নেই, (মাআরিফুল কুরআন) পিতা-মাতার অবাধ্যচরণ করা প্রসঙ্গে হুশিয়ারি দিয়ে রাসূল (সাঃ) বলেন, সমস্ত গুনাহের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেগুলো ইচ্ছা কিয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু পিতা-মাতার হক নষ্ট করা এবং তাদের প্রতি অবাধ্য আচরণ করা এর ব্যতিক্রম। এর শাস্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরকালের পূর্বে ইহকালেও দেয়া হয়। (ফয়জুল কালাম) এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, সন্তানের উপর পিতা-মাতার হক কি? তিনি বললেন, তারা উভয়ই তোমার বেহেশত অথবা দোযখ। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের আনুগত্য ও সেবাযতœ জান্নাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে বেআদবী ও তাদের অসন্তুষ্টি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। (মিশকাত) কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে পিতা-মাতার হক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সফর করা এমনকি জিহাদের মত পবিত্র ইবাদতও যদি ফরজে আইন না হয় তাহলে পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়। আবু উসাইদ বদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় এক আনসার এসে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাদের কোন হক আমার জিম্মায় আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ!  তাঁদের জন্য দু’আ ও ইসতেগফার করা, তাদের কৃত ওয়াদা পূরণ করা, তাদের আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের বন্ধুদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা তোমার জিম্মায় অবশিষ্ট রয়েছে। (মিশকাত) নবীজি (সাঃ) আরও ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি প্রতি জুমায় তাঁর পিতা-মাতা বা কোনো একজনের কবর যিয়ারত করে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং তাকে সদাচরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (বায়হাকী)
মায়ের খেদমত করতে গিয়ে হুযুর (সাঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে সাহাবী হতে পারেনি ওয়ায়েস কুরুনী (রহঃ)। তারপরও হুযুর (সাঃ) হযরত ওমর (রাঃ) কে অসিয়ত করলেন, তুমি ওয়ায়েস কুরুনীর থেকে দুআ নিও! আসহাবে রকীমের একজন পিতা-মাতার খেদমতের ওসিলা নিয়ে দু’আ করে সেই আটকা পড়া গুহা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। হযরত বায়জিদ বোস্তামী (রহঃ) এত বড় ওলী হয়েছিলেন মায়ের দুআয়। মায়ের দুআয় বড় দার্শনিক হয়েছিলেন ইমাম গাযযালী (রহঃ)।
এ রকম শত শত ঘটনা হাদিস ও তারীখের কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। তাই আসুন পিতা-মাতার হক জেনে আমল করি। জীবিত অবস্থায় পিতা-মাতার হকগুলো হচ্ছে ঃ
পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। মনে প্রাণে মুহাব্বত করা। সব সময় তাদেরকে মেনে চলা।  তাদের খেদমত করা। তাদের প্রয়োজন মিটানো। তাদের সর্বদা আরাম দেওয়ার চিন্তা-ফিকির করা। নিয়মিত তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা ইত্যাদি। আর মৃত্যুর পরের হকগুলো হলঃ পিতা-মাতার জন্য মাগফেরাতের দুআ করা। সাওয়াব রেছানী করা। তাদের সঙ্গী সাথী ও আত্মীয় স্বজনদের সম্মান করা। তাদের সঙ্গী-সাথী ও আত্মীয় স্বজনদের সাহায্য করা। তাদের ঋণ পরিশোধ করা এবং আমানত আদায় করা। মাঝে মাঝে তাদের কবর জিয়ারত করা প্রভৃতি।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০