বালুচরে বোরোর চারা লাগাতে ব্যস্ত কৃষক

পানিশূন্য পঞ্চগড়ের নদ-নদী

পানিশূন্য পঞ্চগড়ের নদ-নদী

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড় : ‘আমাদের ছোট নদী চলে একে বেঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’ সেই বৈশাখ আসতে আরও ঢের সময় বাকি। কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সকল নদ-নদী। নদীর মাঝ বরাবর কোনমতে বয়ে চলেছে শীর্ণকায় পানিপ্রবাহ। যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা ক্যানেলের মত। নদীর দু’পারের খাঁ খাঁ বালু সরিয়ে সেখানে কিছুদিন আগে কৃষকরা বোরো ধানের বীজতলা করেছিল। এখন সেই চারা দিয়ে বোরো ধান লাগাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে নদী পাড়ের কৃষকরা। অথচ আজ থেকে অর্ধশত বছর আগেও এসকল নদীতে এ সময়টাতে অনেক পানি থাকত। সেই পানি দিয়ে নদী পাড়ের কৃষকরা কয়েক মাস ধরে ফসল আবাদ করত।

পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ছোট বড় ২৭টি নদী। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নদী করতোয়া। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর মধ্যে করতোয়া, চাওয়াই, তালমা, পাঙ্গা, কুড়–ম, পাম, ভেরসা, ডাহুক, তীরনই, রণচন্ডি, বেরং, জোড়াপানি, ঘোড়ামারা, নাগর, সিঙ্গিয়া, ঘাগরা, পাথরাজ, বুড়িতিস্তা, ছোট যমুনা অন্যতম। বাকি অনেক নদীর দেখা মেলে শুধ্ইু বর্ষাকালে। এ সকল অধিকাংশ নদীর উৎসমুখ প্রতিবেশী দেশ ভারতে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নদী শাসন আইন অমান্য করে নদীগুলোর উৎস এবং প্রবেশ মুখে বাঁধ, স্লুইস গেট, জলাধার, ফিডার ক্যানেল ও রেগুলেটর নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করায় এ নদীগুলো ধীরে ধীরে মরা খালে পরিণত হচ্ছে।
 
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী ভারত জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা সীমান্তের বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহানন্দা নদীর ওপর বিশাল     বাঁধ নির্মাণ করেছে। যা ‘ফুলবাড়ি ব্যারাজ’ নামে খ্যাত।  এ ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে বর্ষার পরই মহানন্দা মরা নদীতে পরিণত হচ্ছে। ১৯৮৬ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘তিস্তা-মহানন্দা’ নামের বাঁধটি নির্মাণ করে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে এই নদী থেকে পানি নিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাসহ বিহার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের মরু কবলিত এলাকায় সেচ কার্য চালাচ্ছে। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালেই পশ্চিম-উত্তরকোণে দেখা যাবে মহানন্দা নদীর ওপর ভারতীয় অংশের বিশাল বাঁধ। শুধুমাত্র ফুলবাড়ি ব্যারজই নয়, ভারত থেকে আসা পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সকল নদীর উৎসমুখে ভারত বাঁধ বা স্লুইজ গেইট দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে।

আবার নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে ইরি-বোরোসহ বিভিন্ন ফসল চাষে অনীহা প্রকাশ করছেন কৃষকরা। সেচ দেয়ার কিছু সময়ের পরই জমিতে পানি থাকছে না। এতে করে ফসল আবাদে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে বর্ষার পর নদীতে পানি না থাকায় মাছসহ নদীর অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে দেশীয় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোও বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ ব্যাপারে জেলা পরিবেশ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বোদা পাথরাজ কলেজের সহকারী অধ্যাপক আলতাফ হোসেন জানান, নদ-নদীগুলোর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে।
এতে এলাকায় মরুকরণসহ কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এছাড়া জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।