পাটের অতীত-বর্তমান

পাটের অতীত-বর্তমান

আব্দুল হাই রঞ্জু : এককালে আমাদের দেশে কৃষি চাষাবাদের অন্যতম পণ্যই ছিল পাট। সোনালী আঁশ খ্যাত পাট ও পাটশিল্প ছিল রফতানি আয়ের বড় খাত। পাট রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই ছিল রাষ্ট্রের একমাত্র অবলম্বন। ছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজি। শুধু আদমজিই নয়, দেশের নানা প্রান্তে স্থাপিত হয়েছিল পাটশিল্প। যার বদৌলতে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ্যভাবে লাখ লাখ শ্রমিক ও পাট ব্যবসায়ীদের ছিল কর্মচঞ্চল যৌবন। দেশের উৎপাদিত পাটশিল্প ও কাঁচাপাট দেদার রফতানি হতো। পাটের হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্য আমার নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
জন্মসূত্রে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় আমার বেড়ে ওঠা। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে আমার জন্ম। আমার বাপ চাচাদের ছিল পাটের রমরমা ব্যবসা। আর পাট ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল চিলমারী বন্দরটি। এই বন্দর দিয়ে বড় বড় পানশি নৌকা এবং জাহাজে করে পাট আনা নেয়ার কর্মব্যবস্তা খুবই কাছে থেকে দেখেছি। প্রমত্তা নদী ব্রহ্মপুত্রের তীরেই ছিল চিলমারী বন্দরটি। গোটা বন্দর জুড়ে মাড়োয়ারী খ্যাত বড় বড় ব্যবসায়ীদের সুবিশাল পাটগুদাম ও কাঁচাপাট কলের রমরমা ব্যবসার ঐতিহ্য আজও স্মৃতি হয়েই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। শুধু চিলমারী উপজেলাই নয়, কুড়িগ্রাম জেলার তৎকালিন প্রতিটি থানায় (বর্তমানে উপজেলা)  ছিল পাট ব্যবসার জন্য বড় বড় পাটগুদাম। এক থানা থেকে অন্য থানায় এবং চিলমারী বন্দরে পাট আনা নেওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ী। আজকের মত কোন পাকা রাস্তা ছিল না। ছিল না পরিবহনের জন্য ছোট বড় ইঞ্জিন চালিত কোন ট্রাক। একমাত্র ভরসা গরু আর মহিষের গাড়ী। রাত দিন কাঁচা রাস্তা দিয়েই এসব কাঁচাপাটের বেল কিম্বা কাঁচাপাট আনা নেওয়া হতো।
আজ সেসব শুধুই স্মৃতি। ঐতিহ্যবাহি ব্রহ্মপুত্র নদীটি এখন অনেকটাই মরা খালের মতো। নেই কোন পানশি নৌকা কিম্বা কোন জাহাজ। আর ছোট বড় জাহাজ চলাচল করার মতো নদীতে কোনও পানিও নেই। কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে গেছে। এখন ইঞ্জিন চালিত স্যালো বোটই নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা। সেই বন্দরটি স্বাধীনতা যুদ্ধকালিন ১৯৭১ সালে করালগ্রাসি ব্রহ্মপুত্রের গর্ভেই বিলীন হয়ে গেছে। এখন আর মাড়োয়ারীদের বড় বড় পাটের গুদামও নেই, পাটের সেই ব্যবসাও নেই। এ চিত্র শুধু চিলমারী উপজেলায় সীমাবদ্ধ নেই। বলতে গেলে গোটা দেশেই পাটকল ও পাট ব্যবসার সেই চিরচেনা ঐতিহ্য আর নেই। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, লুটপাটের শিকার হয়ে অনেক আগেই পাটকল শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে।
এমনকি বিদেশি প্রিসক্রিপশনে বিএনপি সরকার এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজিকে ধ্বংস করেছিল। বলা হয়েছিল, পাটশিল্পের লোকসান গুনতে গুনতে সরকার ক্লান্ত। দেশে আর বৃহৎ পাটকলের প্রয়োজন নেই। আদমজি বন্ধ করে সেখানে ছোট ছোট আকারের পাটকল স্থাপন করলে আদমজির চেয়েও বেশি পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আদমজি বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ছোট বড় কিম্বা মাঝারি কোন পাটকলই সেখানে আর স্থাপিত হয়নি। উল্টো হাজার হাজার কর্মরত শ্রমিক চিরচেনা আদমজি থেকে চোখের জলে বিদায় নিয়ে আজও মানবেতর পরিবেশে জীবিকা নির্বাহ করছে। শুধু আদমজির শ্রমিকরাই নয় বর্তমানে গোটা দেশে রুগ্ন শিল্প হিসেবে টিকে থাকা ২৬টি পাটকলের অবস্থা তথৈবচ।
সূত্রমতে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জুট মিলস্ কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) আওতায় ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি পাটকল। এর মধ্যে ২২টি পাটকল, আর ৩টি জুট-কারখানা। পাটকলগুলোতে মতান্তরে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক এখন অধিকার বঞ্চিত। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেও তারা প্রাপ্য ও ন্যায্য মজুরি পান না। টানা দশ সপ্তাহের বেশি দিন মজুরি না পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। শ্রমিকরা বলছেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন তারা। চার বছর আগে পাটকল শ্রমিকদের জাতীয় মজুরি স্কেল ঘোষণা করা হলেও আজও তার বাস্তবায়ন হয়নি। গত ৪ বছরে পাটকল শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি বকেয়া পড়েছে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, সরকার প্রতিবছরই পাটকলগুলোতে কোটি কোটি টাকা ভুর্ত্তকী দেয়, অথচ মজুরি পান না শ্রমিকরা। কিন্তু বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দিতে সমস্যা হয় না। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানে যত সমস্যা। গত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সরকার বিজেএমসিকে ভুর্ত্তকী দিয়েছে ৭৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর বিজেএমসি ঐ অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৪৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহ্বান এইচ মুনসুর বলেন, সরকারি পাটকলগুলোর সংকট ও শ্রমিকদের দুদর্শা জিইয়ে রেখে ফায়দা নিচ্ছেন বিজেএমসির কিছু সুযোগ সন্ধানী লোকজন।
তিনি আরো বলেন, পাটশিল্পের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সরকার যখন পাটের হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, তখন বিজেএমসিকে জেগে উঠতে হবে। কিন্তু বিজেএমসির অব্যবস্থাপনার যেন শেষ নেই। তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের কাঁচাপাট এবং বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পুরণে বেসরকারি অনেক মিল মালিক ভালো করলেও বিজেএমসি কেন পারছে না? অবশ্য পাটকলগুলোর অব্যবস্থাপনা দুর্নীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে চলছে। বিজেএমসির কর্মকর্তা এবং শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, সরকারি পাটকলে লোকসানের বড় কারণ কাঁচাপাট কেনার অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি। এমতাবস্থায় পাটকলগুলোর লোকসান বন্ধের কিছু উদ্যোগের কথা তারা বলেছেন। প্রথমত: দুর্নীতি ও অপচয় রোধ। দ্বিতীয়ত: পাটকলের পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন। তৃতীয়ত: ভরা মৌসুমে পাট কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়। চতুর্থত: পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরি করে নতুন বাজারে অনুসন্ধান। সর্বোপরি পাট ও পাট শিল্পের উন্নয়নে সময়োপযোগী নীতি নির্ধারণ করা।
বাস্তবে পাটের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা কাংখিত সুফল অর্জন করতে পারছি না। অথচ বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম পাটের জিন রহস্য আবিস্কার করে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছেন। আবার পাট থেকে উন্নত মানের মিহি সুতা আবিস্কার হয়েছে। যা দিয়ে মুল্যবান কাপড় তৈরি করা সম্ভব। যখন পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন, সিনথেটিকের আগ্রাসনে গোটা দুনিয়া বিপর্যস্ত, তখন পরিবেশ বান্ধব পচনশীল পাটপণ্যের কদর ও চাহিদা দু’টোই বাড়ার কথা। কিন্তু সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দের অভাবে পাট শিল্পে কাংখিত উত্থানতো ঘটছেই না, উল্টো এ শিল্প দিনে দিনে বিপর্যস্তই হচ্ছে। বিপর্যস্ত এ অবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারলে পাট ও পাটজাত পণ্য আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারবে। তবে শংকার বিষয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময়ই সম্ভাবনার সুযোগ থাকলেও কাজে লাগানো সম্ভবপর হয় না।
গত বছরের শেষ দিকে জাতীয় এক দৈনিকে ‘কাঁচাপাটের অভাবে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের আশংকা’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। উক্ত খবরে জানা যায়, কাঁচাপাটের অভাবে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের আশংকা দেখা দিয়েছে। এমন শংকার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান অর্থ বরাদ্দ চেয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সে সময় সাবেক প্রবীণ অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, বিজেএমসি দুর্নীতিগ্রস্ত একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। হতেই পারে বিজেএমসি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। সে জন্য দুর্নীতিবাজদের না ধরে উল্টো এ অজুহাতে বিজেএমসির মত একটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করবেন, সেটা কি যৌক্তিক?
মাথা ব্যথা হলে ব্যথা নিরাময়ে ওষুধ সেবন না করে কেউ কি মাথা কেটে ফেলে? অর্থাৎ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে। হয়ত সাবেক অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মনোভাবের কারণে বিজেএমসিকে যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অবশ্য এখানকার পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন। এখন অর্থমন্ত্রী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী নতুন। আমরা আশা করব, অর্থ মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ সবাই পারস্পরিক সহমতের ভিত্তিতে কাজ করবেন। যেন লোকসানি প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল করে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো যায়।
এ জন্য পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন যেমন জরুরি, তেমনি বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং শ্রমিকদের আন্তরিক হয়ে কাজ করাও জরুরি। অর্থাৎ লোকসানি এ প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধ করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক
-০১৯২২৬৯৮৮২৮