নীরব ঘাতক অতিরিক্ত আলো ও শব্দ দূষণ

নীরব ঘাতক অতিরিক্ত আলো ও শব্দ দূষণ

রায়হান আহমেদ তপাদার : অবাঞ্ছিত কোন শব্দ, যা পরিবেশ এবং মানুষ বা অন্য কোন জীবের ভারসাম্য বিনষ্ট করে তাকেই আমরা শব্দ দূষণ বলে থাকি। শব্দ দূষণের ফল তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। এটি সাধারণত পরোক্ষভাবে এবং ধীরে ধীরে মানব শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। শব্দ দূষণের প্রধান শিকার মানুষের কান। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দের মধ্যে অবস্থান করলে মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এতে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার আশপাশে নিয়মিতভাবে কর্মরত ব্যক্তিদের শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের কানই শব্দ দূষণের একমাত্র শিকার নয়। শব্দ দূষণের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের উচ্চরক্তচাপ দেখা দেয় এবং বেড়ে যায় হৃদযন্ত্রের কম্পন। সাময়িকভাবে অনেকের মাথা ঘুরা বা বমি বমি ভাব দেখা দেয়। শব্দ দূষণের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে বাড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। মানুষের মেজাজ হয় খিটখিটে। কোলাহলকে সংজ্ঞার দিক দিয়ে দেখলে বলা যায় অপ্রয়োজনীয় শব্দ। এটি ক্রমশ বাড়ছে। বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রধান ভূমিকা নেয়। শব্দ বায়ুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় ফলে বাতাসের গুণমান দিয়ে এর প্রভাব বোঝা যায়। শব্দ মাপা হয় ডেসিবল দিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন প্রতিনিয়ত ৯০ ডেসিবলের ওপর শব্দ উদ্গিরণ হলে তা শোনার ক্ষমতার ওপর বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর পাকাপাকি প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) একটি শহরের ক্ষেত্রে ৪৫ ডেসিবলকে নিরাপদ শব্দমাত্রা হিসাবে স্থির করেছে। ভারতে মেট্রোপলিটান এলাকায় শব্দের মাত্রা অনেক সময়ই গড়পড়তা ৯০ ডেসিবলের বেশি থাকে। বিশ্বের মধ্যে কোলাহলের দিক দিয়ে মুম্বাইকে তৃতীয় দূষিত শহর হিসাবে গণ্য করা হয়। দিল্লী তার খুবই কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু আলো দূষণ ও শব্দদূষণ নিয়ে আলোচনা একেবারেই কম।
ভুলে গেলে চলবে না, এ দুটো দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক। উন্নয়নের গতির সঙ্গে সঙ্গে এ দূষণ বাড়ছে। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই ফলাফল ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কারণে বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হচ্ছে। অধিক ভোগবিলাসিতার জন্য আলোদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের মাত্রা ঊর্ধ্বমুখী। আলোদূষণ উন্নত বিশ্বে বেশি। রাসায়নিক বা পারমাণবিক দূষণের মতো এখনো এত গুরুত্ব না পেলেও আলোকদূষণ পৃথিবীতে এক সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন আর আকাশগঙ্গা ছায়াপথ দেখতে পায় না বলে তারা বলছেন। পৃথিবীর কিছু অতি আলোকিত জায়গা, যেমন সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সানমারিনোতে যেসব নক্ষত্র আমরা খালি চোখে দেখতে পাই, তার প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ নক্ষত্র আর দেখা যায় না। ২০১৭ সালের এক গবেষণা বলছে যে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে আলোকদূষণ ২ শতাংশ হারে বেড়েছে। রাতে ঘুম, দিনে জাগা আর কাজ এভাবে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে। আলোর সঙ্গে আমাদের শরীরের সরাসরি স¤পর্ক আছে। আলোর ফোটন কণা আমাদের চোখের রেটিনায় গিয়ে পড়ে। ফলে সিগন্যাল গিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনে পৌঁছায়। ফলে মেলাটনিন হরমোন তৈরি হয়। মেলাটনিন স্বাভাবিকভাবে সূর্যাস্তের সময় তৈরি শুরু হয়ে মাঝরাত নাগাদ তুঙ্গে পৌঁছায়। এ হরমোনের কাজ হচ্ছে আমাদের ঘুম-জাগরণের বৃত্ত, শরীরের অধিক তাপ কমানো, বিপাক প্রক্রিয়া বা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে সব ঠিক রাখা।কিন্তু এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মেলাটনিন হরমোনের বিপর্যয়ের ফলে।
এছাড়া কম্পিউটারের স্ক্রিন, বাথরুমের উজ্জ্বল আলো, রাস্তার অতি উজ্জ্বল আলো, ঘরের বা বাইরের বৈদ্যুতিক আলো, মেলাটনিনের স্বাভাবিক নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত করে। এ ঘটনার এক অন্যতম ফল হচ্ছে ওজন বেড়ে যাওয়া, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, অবসাদ বাড়ছে। এসব প্রবণতা বেশি দেখা যায় রাতের শিফটে কাজ করা কর্মিদের মধ্যে। ২০০৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রাতে কাজ করাকে ক্যানসারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। শব্দ প্রাণিকুলের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু এর সীমা থাকা দরকার, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবল সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয় আর ১০০ ডেসিবল শব্দ হলে চিরতরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাজধানী ঢাকার অনেক স্থানে ১০৭ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ থাকে বা আছে। আল্লাহ মনে হয় আমাদের সহ্যক্ষমতা বেশিই দিয়েছেন! প্রতিনিয়ত ভেজাল খাদ্য খেয়ে সহ্যক্ষমতা মনে হয় বেড়েই গেছে। না হলে শব্দদূষণে আরো ক্ষয়ক্ষতির হার বেড়ে যেত। শব্দদূষণের সঙ্গে বধিরতার স¤পর্ক রয়েছে।আকস্মিক তীব্রশব্দ কানের ভয়াবহ ক্ষতি করে। সম্পূর্ণ বধিরও করতে পারে। আমাদের যানবাহন ও শিল্প-কারখানা থেকে ভয়াবহ শব্দদূষণ হয়। শব্দদূষণের ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগ, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়া রোগ হয়ে থাকে। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট, মাথা ধরা, বমি বমি ভাব ও মানসিক অস্বাভাবিকতা হতে পারে। একটানা গাড়ির শব্দ বা উচ্চশব্দ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পুরো ঢাকা শহরটাই এখন ভয়াবহ শব্দদূষণের শিকার। রাজধানীর সব এলাকায় শব্দ সহ্যসীমার অনেক বেশি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণ মাত্রার দ্বিগুণ বা তিন গুণ পর্যন্ত রয়েছে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ লোকের শ্রবণশক্তি কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬-এ বলা হয়েছে, শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও ক্ষতিকরের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা আছে। এ আইনে বলা আছে, প্রতি ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কী কী করবে। এসব কর্তৃপক্ষের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকা শনাক্ত করতে হবে। যেমন নীরব এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা, আবাসিক এলাকা প্রভৃতি। নীরব এলাকায় থাকবে হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত হবে। ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, লিফলেট ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণকে সজাগ করার কথা বলা আছে। এসব থাকলে জনগণ কোথায়, কী করতে হবে জানবে। কিন্তু এই আইন সম্পর্কে তেমন কোনো প্রচার নেই। এ আইন বাস্তবায়ন করলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আইনের প্রচার ও বাস্তবায়ন, সচেতনতা সৃষ্টি, হর্ন বাজানো থেকে বিরত, জেনারেটর ও যন্ত্রপাতির শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে বা রাখতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা আছে, যা কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্প এলাকায় কম শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। যন্ত্রপাতিগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব মাইকের ব্যবহার কম করতে হবে। এড়িয়ে চলতে পারলে খুব ভালো হবে। না হলে কম শব্দ সৃষ্টি করে এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। উন্নত দেশের লোকেরা কথা কম বলেন। কাজ বেশি করেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। আমরা ধীরে ধীরে এ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি।

এদিকে কৃত্রিম আলোতে বিশ্ব ভরে গেছে। বাংলাদেশও ভরে যাচ্ছে। শহরে রাত আর দিনের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে অনেক সময়। অনেক শহর কৃত্রিম আলোয় দিনের ফ্লেভার পায়। উন্নত দেশের বেশির ভাগ শহর তো এ রকমই। কায়রোকে তো বাজারের শহর বলা হয়। রাতের বেলায় জাঁকজমক বেশি হয়। বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো এমনকি জেলা বা মফস্বলের অনেক শহরে আলোর খেলা চলে রাতে। কসমেটিক বা বিপণিকেন্দ্রগুলোয় রাতেই উপচে পড়া ভিড় হয়। কর্মব্যস্ত মানুষ রাতেই বাজার বা মার্কেট করতে যায়। বাচ্চারাও কৃত্রিম আলোর নাচুনিতে মুগ্ধ হয়ে অভিভাবকদের বাইরে যাওয়ার জন্য প্রভাবিত করে। এ সংখ্যা এখন বেড়েই চলেছে। দেখা যায়, অনেক শহরে দিনের আলোর চেয়ে রাতে কৃত্রিম আলোয় আকাশ জ্বলজ্বল করে। রাতের বেলা আকাশ বা গ্রহ-তারা কৃত্রিম আলোকচ্ছটায় পরিষ্কার দেখা যায় না। লোকালয়ের অনেকদূরে দেখতে যেতে হয়। তখনই আমরা ধরে নেব আলোদূষণ চরম মাত্রায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ শহর আলোদূষণের শিকার। আমেরিকা আর ইউরোপের শতভাগ (৯৯ শতাংশ) শহর আলোদূষণের শিকার। কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর সবচেয়ে বেশি আলোদূষণের শিকার। আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাদসহ দারিদ্র্যপীড়িত দেশ কম আলো দূষণের শিকার। দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নের একই গতিতে আলোদূষণের হার বেড়েই যাচ্ছে। জার্মানির কোলন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হ্যারাল্ড বার্ডেন হাগেন পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান থেকে বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই রাতের আলোর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

বিশ্বে উৎপাদিত বিদ্যুতের এক-চতুর্থাংশ কৃত্রিম আলো তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। অতিরিক্ত আলোর এলাকায় বিলবোর্ডের আলোর ঝলকানিতে গাড়ির চালক নিশানা ভুল করতে পারেন। আলোকসংকেত নাও দেখতে পারেন। আমাদের রাজধানীর বা বড় শহরের রাস্তার দুই ধারে অনেক আলোক বিলবোর্ড আছে। কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যবহার করা হয়, তার ৩০-৬০ ভাগ পর্যন্ত অপচয় হয় বলে জানা যায়। সড়কবাতি, বিলবোর্ড ইত্যাদি ব্যবহারের প্রয়োজনে আলো যাতে কম ছড়ায়, তা খেয়াল রাখতে হবে। অনেক দেশেই আবিষ্কৃত (যেমন জার্মানি) হয়েছে লক্ষ্যব¯ু—ুতে আলোকিত করার বাল্ব। এতে চারদিকে আলো ছড়িয়ে যাবে না। কিন্তু আমাদের অনেক অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য থাকে লোক দেখানো বা জাঁকজমক করা। এতে আলোর অপচয় হবে। আলো দূষিত হবে। সচেতনতাই কেবল পারে আমাদের দেশে শব্দদূষণ ও আলোদূষণ কমাতে। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আমরাও এগিয়ে আসব। ব্যর্থ হলে আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই খারাপ হবে। আলো দূষণ ও শব্দ দূষণ নিয়ে আলোচনা একেবারেই কম। কিন্তু এ দুটো দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক। উন্নয়নের গতির সঙ্গে সঙ্গে এ দূষণ বাড়ছে। মানুষ্যসৃষ্ট কারণেই ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কারণে বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হচ্ছে। অধিক ভোগ-বিলাসীতার জন্য আলো দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে শব্দ দূষণের মাত্রা উর্ধ্বমুখী। আলো দূষণ উন্নত বিশ্বে বেশি। শব্দ দূষণ নীতিমালা অনুযায়ী শুধু নীরব এলাকা নয়, আবাসিক, বাণিজ্যিক, মিশ্র, শিল্প এলাকাও চিহ্নিত করে স্ট্যান্ডার্ড সঙ্কেত বা সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। কিন্তু তা শুধু নীতিমালাতেই রয়ে গেছে, বাস্তবায়ন নেই। জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ন্যস্ত আইনসিদ্ধ দায়িত্ব ও কর্তব্য আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
                                         লেখক ঃ  কলামিস্ট
                                   [email protected]