নিরাপদে ভোট দিতে চাই

নিরাপদে ভোট দিতে চাই

আতাউর রহমান মিটন : আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আয়োজনে সকল প্রস্তুতিই প্রায় সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ভোটে নিজেদের প্রার্থী বেছে নেয়ার জন্য তৈরী দেশের সর্বস্তরের জনগণ। ভোট উৎসবে মেতে উঠেছে গোটা দেশ তবু একটা ভয়, একটা সংশয় যেন পিছু ছাড়ছে না। ‘ভোটটা শান্তিতে দিতে পারব তো’ - এ্ই প্রশ্ন সবার মনে। সবাই চায় শান্তিতে ও নিরাপদে ভোট দিতে। এটা তাদের অধিকার। শুধু ভোটের দিনই নয়, ভোটের পরেও যেন কোন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করি। আমরা নিরাপদে ভোট দিতে চাই।

নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতি ভোটাধিকার সচেতন। ‘ভোট পাগল’ বললেও ভুল বলা হবে না। আমরা ভোট দিয়েই প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চাই। যদিও বারবার আমাদের সেই অধিকারের উপর আঘাত এসেছে। সত্তরের নির্বাচনে ভোটে জিতেও আমরা ক্ষমতার অধিকার পাইনি, আবার ২০১৪ সালে আমরা সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগেরই সুযোগ পাইনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাই বাংলার মানুষ যেন তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘেœ প্রয়োগ করতে পারে সেটাই সকলের কামনা। মানুষ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যত নির্ধারণের নিশ্চয়তাটুকু চায়। সুক্ষ্ম কারচুপিহীন, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনই সকলের কাম্য। নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হতে পারে এমন যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে সকল মহল বিরত থাকবেন সেটাই আমাদের অনুরোধ।  

বাংলার জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। ১৯৯০ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন বাদ দিলে অতীতের প্রায় সবগুলো নির্বাচনই কমবেশি প্রশ্নের জন্মের দিয়েছে। আমরা সবাই জানি, কত চড়াই-উৎরাই পার করে এবারের নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনমনে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা বিরাজমান। সারাদেশে ষ্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী নামায় কিছুটা আস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আশাকরি, জনমনে বিরাজমান ভয় ও সংকোচ কাটিয়ে সকলকে নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগে সকলেই সহযোগিতা করবেন। কোন বিশেষ সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর উপর অহেতুক হামলা বা আক্রমণের ভয় দূর করবেন।  সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল মহল তাদের পূর্ণ পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধ থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাবেন। জনগণ স্বস্তি চায়, শান্তিতে ভোট দিতে চায়।

সবাই জানেন, নির্বাচনে অধিক ভোট পাওয়া এবং অধিক আসন পাওয়া এক নয়। অনেকেই মনে করেন, এর ফলে নির্বাচনী সহিংসতা উৎসাহিত হয়। কারণ তখন চর দখলের মত করে আসন দখলের একটা প্রবৃত্তি তৈরি হয়। যদি এমন হতো যে দল সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সেই দলই ক্ষমতা পাবে তাহলে বেশি ভোট পাবার দিকেই সকলের মনযোগ থাকত। উৎসাহিত হতো ভোটার তুষ্টির কর্মসূচি। ভোটের সংখ্যানুপাতিক আসন বন্টন ব্যবস্থাও সে কারণে আলোচনার দাবি রাখে। নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও সহিংসতা মুক্ত করার জন্য আমাদের সামগ্রিক ভোট পদ্ধতির মধ্যে সংস্কার আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ বন্ধ করা হয়েছে কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো হাতে নেয়া হয়নি। ফলে একটা ভয়, একটা সংশয়বিহীন নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তুলতে নির্বাচন কমিশনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতার উৎস। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ হলেও তারা সেই মালিকানা ভোগ করতে পারে না। বর্তমান ব্যবস্থায় আসন গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সারাদেশে পেশি শক্তি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে, গায়ের জোরে ব্যালট বাক্স ভরে তথাকথিত আসন জয় নিশ্চিত করার প্রবণতা উৎসাহিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থার বদল হওয়া দরকার। আমাদের ভবিষ্যত আমাদেরই দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে আমরা জনগণ যেন ভুল না করি। আমরা যেন জেনে, শুনে, বুঝে ভোট দেই। সন্ত্রাসকে আমরা ‘না’ বলি। সন্ত্রাসীদের গডফাদার, মাদক স¤্রাট, দুর্নীতির বরপুত্ররা যাতে এবারের নির্বাচনে জিততে না পারে তার জন্য সচেতনভাবে ভোট দেই। আমরা জনগণ যদি জেগে না উঠি তাহলে এই দেশ নতুন সাজে সাজবে না।

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়। আগামীতেও দেশের মানুষ উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। সহযোগিতা করবে সরকারকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু তারা পেশিশক্তির কাছে নতজানু নয়। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার জন্যেই সন্ত্রাসী ও তাদের গডফাদারদের রুখতে হবে। সন্ত্রাসীরা কখনই কোন দলেরই সম্পদ নয়। বরং এরা দলের জন্য ‘বিষফোঁড়া’। এই দুষ্টচক্রকে রুখে দিতে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আসুন, আগামীকাল আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করি।

সকল ভয়, দ্বিধা দূর করে আগামীকাল দয়া করে সবাই দলে দলে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিবেন। ভোটের ফল পাল্টে দেবার মত ‘সুক্ষ্ম কারচুপি’ যাতে না হয় তার জন্য সজাগ থাকবেন। তরুণ ভোটার বন্ধুরা, আবেগাশ্রিত না হয়ে বরং জেনে, দেখে, শুনে বুঝে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আগামীর বাংলাদেশ হবে তরুণদের দেশ! আপনারা যেভাবে এই দেশ গড়তে চান, সেই বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আপনি আপনার জীবনের প্রথম ভোটটি প্রয়োগ করবেন। ভয়ে সংকুচিত নয়, দাঁড়াতে হবে মেরুদন্ড সোজা করে, বুক টান করে! মনে রাখবেন, সংকোচ মানে নিজেকে অপমান। আপনারা সেই অপমানের হাত থেকে জাতিকে রক্ষায় সাহসে বুক বাঁধবেন। জনগণের ভোটে যাঁরাই নির্বাচিত হবেন তাঁদের প্রতি অগ্রীম শুভেচ্ছা রইল। আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব তরুণদের হাতে থাকুক। মন্ত্রীসভায় একজন অভিজ্ঞ মন্ত্রীর সাথে একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হোক যাতে করে তাঁরা ভবিষ্যতে সুষ্ঠুভাবে বাংলাদেশের হাল ধরতে শেখে। সামনে আসবে শুভদিন, তরুণদের সুযোগ দিন। জয় জনতা! জয় হোক তারুণ্যের!

লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯