নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার স্বার্থ

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার স্বার্থ

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্য। খাদ্য ব্যতিত মানুষ বাঁচতে পারে না। সেই খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে ভেজাল খাদ্য খেয়ে মানুষের জীবনহানিও ঘটতে পারে। ফলে প্রতিটি মানুষই নিরাপদ ভেজালমুক্ত খাবার খেতে চায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে যেভাবে ভেজালের আগ্রাসন চলছে, তাতে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ভেজালমুক্ত ও উন্নত পরিবেশে তৈরি খাবার সরবরাহে কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করতে পারছেন না। এ জন্য মানুষকে বিবেকসম্পন্ন হতে হবে। ভাবতে হবে, নিরাপদ খাদ্যকে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হবে। অতি সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোয় ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালায়। এতে দেখা গেছে, কম-বেশি প্রতিটি হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার মান এবং খাবার তৈরির পরিবেশের বড়ই অভাব। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালত জেল, জরিমানা করেছেন। আবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হোটেল রেস্তোরাঁগুলোকে গ্রেডিং পদ্ধতির আওতায় আনার উদ্যোগও নিয়েছেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গ্রেডিংয়ে ‘ভালো’ স্বীকৃতি পাওয়া তিনটি রেস্তোরাঁ খাদ্যে ভেজালের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জরিমানার মুখেও পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে উন্নত পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশনে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ অনেক পুরোন। এ প্রসঙ্গে কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত সার্বিক বিষয়ে তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা রাখে। তবে কারও একার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আইনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ৫টি সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী সেভাবে কাজ না হওয়ায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তিনি আরো বলেন, ব্যবসায়ীদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি সহজ হবে না।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এখন সারা দেশে ছোট-বড় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার রেস্তোরাঁ আছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ঢাকার ৫৭টি রেস্তোরাঁকে মান বিবেচনায় ‘এ প্লাস’ (উত্তম) ও এ (ভালো) গ্রেডের স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পরদিনই ‘ভালো’ মানের তিনটি রেস্তোরায় অভিযান চালিয়ে বাসি খাবার আর নোংরা পরিবেশ পায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, আমরা ২০১৮ সালে গোটা দেশে প্রায় দুই হাজার চারশত হোটেলে অভিযান পরিচালনা করেছি। পাশাপাশি ৬ মাসে প্রায় এক হাজার বাজার মনিটরিংয়ে গিয়েছি। আবার তিনি এও বলেছেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যে গ্রেডিং সিস্টেম চালু করেছে, সেটা আমাদের অফিসিয়ালি জানানো হয়নি! অথচ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ১৯টি মন্ত্রণালয় ও ৫টি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সমন্বয়হীনতার অভাবে অনেক সময়ই এক প্রতিষ্ঠানকে সরকারের একাধিক বিভাগের পরিদর্শনের সময় সহযোগিতা করতে হয়। এমনকি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যে রেস্তোরাঁকে এ গ্রেডের সনদ দিয়েছেন, তার একদিন পর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানকালে জরিমানার মুখে পড়তে হয়েছে। এ জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করলে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে বাজারে মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে গতিও আসবে।

গত ৩ জানুয়ারি রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্যে ভেজাল দিয়ে মানুষের জীবন ধ্বংসের অধিকার কারও নেই। খাদ্যে ভেজাল দেয়াও এক ধরনের দুর্নীতি, এটা বন্ধ করতেই হবে। তিনি বলেন, খাদ্যে ভেজাল রোধে আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছি। যারা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করবেন। যেহেতু খাদ্যে ভেজালও দুর্নীতি, সেহেতু ভেজাল রোধে অভিযানকে আরো জোরদার করতে হবে মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে যারা যেখানে দায়িত্ব পান, সে সুযোগকে তিনি কাজে লাগিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। ফলে সরকারি এমন বিভাগ আছে, যেখানে স্বল্প বেতনের একজন কর্মকর্তা কিম্বা কর্মচারি অঢেল অর্থে বিত্তে সমৃদ্ধ হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা কার অজানা আছে? যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন সেখানেই দু’হাতে কামিয়ে নিচ্ছেন। ভেজালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ফলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুন্নই হচ্ছে। কোথায় নেই ভেজাল? বাজারে মাছ, মাংস, শাক সবজি থেকে শুরু করে ফলমূল, এমনকি নিত্যদিনের স্বাভাবিক খাবার দ্রব্য বিষ আর ভেজালে সয়লাব। অতি সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘সরকারের অন্তত ১১টি মন্ত্রণালয়সহ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ কাজ চালিয়ে গেলেও খাদ্যে ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে শুধু জনস্বাস্থ্যই হুমকির মুখে পড়েনি, ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অতি মুনাফালোভী অসৎ এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী জীবনবিনাশী কর্মকান্ড চালালেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেজাল রোধ করতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন, এতে নামিদামি খাবার রেস্তোরাঁও ভেজালবাসী খাবারের অপরাধে দন্ডিত হয়। কিন্তু এরপর যে যেমন ভাবে পারে, নকল-ভেজালের আগ্রাসন ঠিকই চালিয়ে যায়।

 এ জন্য মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, ভাল ও মন্দের সুফল সম্পর্কে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে বিত্ত বৈভবে বড় হওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলে। ফলে যে যেখানে পারছে মানুষের গলাকেটে হলেও আয় রোজগার বাড়াচ্ছে। পরিণামে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু সে দিকে সুযোগ সন্ধানীদের তিলমাত্র অনুভূতি নেই। তাদের চাই শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। অথচ ভেজাল-নকলের পাল্লায় পড়ে দেশের কম-বেশি প্রতিটি মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমনকি যারা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে দেদার ব্যবসা করছেন, তাদেরও পরিবার-পরিজন কিম্বা ভবিষ্যত প্রজন্মও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। সেদিকে ভেজালকারীদের বলতে গেলে কোন খেয়ালই নেই। অর্থাৎ নিজের অপকর্মের শিকার হচ্ছেন নিজের ভবিষ্যত প্রজন্ম। এ জন্য প্রতিটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে, বাড়তি লাভের আশায় ভেজাল, নকল কিম্বা কৃত্রিম কিছু মিশিয়ে হয়ত চুটিয়ে ব্যবসা করা যাবে, কিন্তু নিজেদের সন্তানদেরও সেই ধকল থেকে রক্ষা করা যাবে না।
শুধু খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মধ্যেই যে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে, তা নয়। এর বাইরেও উৎপাদনকৃত খাদ্যদ্রব্যের মাঝেও ভেজালের প্রমাণ মিলেছে। যেমন আমাদের দেশে শস্য উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দেদার ব্যবহার চলছে। এমনকি ক্ষেতে বাড়তি ফলন ও তাড়াতাড়ি পাকানোর ক্ষেত্রে বিষাক্ত ক্যামিকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ জন্য দেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অর্গানিক চাষাবাদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

 সাধারণভাবে জৈব খাদ্য অথবা অর্গানিক ফুড বলতে কোন ধরনের রাসায়নিক, হরমোন বা কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত খাদ্যকে বোঝায়। এ কারণে অর্গানিক খাবার শতভাগ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। ফলে গোটা বিশ্বেই এখন সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে অর্গানিক চাষাবাদ বাড়ছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। সারা বিশ্বে যে সব দেশে ১ শতাংশের কম জমিতে অর্গানিক চাষাবাদ হচ্ছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। সূত্রমতে, এখন আমাদের দেশে মাত্র ৬ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে নিরাপদ অর্গানিক চাষাবাদ হচ্ছে, যা মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র দশমিক ১ শতাংশ। কৃষিই আমাদের অন্যতম অবলম্বন। অথচ বাংলাদেশের চাষযোগ্য জমির বিশাল অংশে জৈব উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিতে অপরিকল্পিত নিবিড়করণ, পরিকল্পনাহীন শস্য আবর্তন, নানা উচ্চফলনশীল শস্যের চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি হয়েছে। যা বিশেষজ্ঞরা বারংবার স্মরণ করে দিচ্ছেন। এরপরও সচেতনতার অভাবেই রাসায়নিক সারের ব্যবহার, কীটনাশকের ব্যবহার এখনও আশানুরুপ ভাবে কমেনি।

 উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে লবণাক্ততার কারণে এরই মধ্যে দেশের ১৮ জেলার ৯৩ উপজেলায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কৃষি জমির মাটি কম-বেশি দুষিত হয়ে পড়েছে। আর জৈব উপাদানের ঘাটতি ধরা পড়েছে ৫২ লাখ হেক্টর জমিতে। সাধারণত সুষম মাটিতে ৪৫ শতাংশ খনিজ বা মাটির কনা, ৫ শতাংশ জৈব এবং ২৫ শতাংশ করে পানি ও বাতাস থাকার কথা। এর মধ্যে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান যোগান দেয় মাটিতে থাকা ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ। অথচ মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের  পরিমাণ কমে আসছে। এ জন্য এখন খাদ্যশস্যের গাছ, ডাল পালা ভাল হলেও দেখা দেয় ফলন বিপর্যয়। মুলত চাষের জমিতে কোন উপাদান কি পরিমাণ আছে, তা পরীক্ষা করে কৃষিবিদদের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক জৈব সার এবং কি পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করা উচিত, সে নির্দেশনা মোতাবেক চাষাবাদ করতে হবে। অর্থাৎ এখন মাটি পরীক্ষা করে অর্গানিক চাষাবাদের দিকেই আমাদের এগোতে হবে। তা না হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। আর নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যতিত নিরাপদ খাদ্যের যোগান পাওয়াও কঠিন হবে। অর্থাৎ সুস্থ দেহে বেঁচে থাকতে হলে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ব্যতিত অন্য কোন বিকল্প পথ নেই। এটাই নিখাদ সত্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮