নিমতলী থেকে চকবাজার শিক্ষা নেইনি

নিমতলী থেকে চকবাজার  শিক্ষা নেইনি

রবিউল ইসলাম (রবীন) : আনন্দের বার্তা প্রচার করা যায়, ছড়িয়ে দেওয়া যায় স্বচ্ছন্দে সবখানে, কিন্তু একটা দুইটা নয় ৮১ জন মানুষের মৃত্যুর কথা কী ভাবে লিখি? কী ভাবে বর্ণনা করি? বুক ভেঙে যায়, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরনো ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক আগুনে ১২৪ জন মারা যাওয়ার সময়ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল সারা দেশ। এবারও সম্ভবত রাসায়নিক আগুনে ছাই হয়েছে ৬৭টি তাজা প্রাণ। ২০১০ থেকে ২০১৯। এই নয় বছরেও গণমৃত্যু থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনি আমরা। ফেসবুকে দেখলাম,  চকবাজারের ঘটনায় একজন মা তাঁর শিশু সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আছে। দুজনেই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। আহা-হা! সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো না। অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন ৬৭ জন মানুষ আর ৬৭ টি পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেল। মাঝে মাঝে আমাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে কান্নার রোল পড়ে। বাতাস ভারী হয়ে উঠে চারপাশ। ২০১০ সালেও এমনটি হয়েছিল। ঘটনার পর তদন্ত কমিটিও হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি ১৭টি সুপারিশ করেছিল। ১নং সুপরিশই ছিল জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়াও বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু পুরানো ঢাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের কোনটিই বাস্তবায়ন হয়নি। এবারো হয়তো তদন্ত কমিটি গঠন হবে, সুপারিশ হবে, প্রশ্ন হচ্ছে, সুপারিশ বাস্তবায়ন হবেতো? নিমতলী, চকবাজার  বা অন্য কোথাও মৃত্যুর মিছিল দেখতে হবে নাতো? ইস! কী মানবিক বিপর্যয়।

 আগুনের সূত্রপাত হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে, অনেকে বলছেন, রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থেকে। আগুনের সূত্রপাত যেভাবেই ঘটুক না কেন, এটি প্রতিয়মান যে, পুরো গলিটাতেই অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি খুব বেশি বলে মত এসেছে । পুরান ঢাকার সেই চকবাজার এলাকায় আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি। এমন ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়ি, দোকানপাট ইত্যাদি স্থাপনায় ঠাসা শ্বাসরুদ্ধকর একটি স্থান। গত বুধবার চুড়িহাট্টায় যে আগুন লেগেছিল সেই আগুনে যারা মারা গেছে তারা হয়তো কোনরকম সুযোগই পায়নি বাঁচার। যানবাহনের দুর্ঘটনায় নয়, কেউ মারা গেছে রিকসায়, কেউ প্রাইভেট কারে, কেউ দোকানে। পথ চলতে চলতে একসঙ্গে এত মানুষের অঙ্গার হওয়ার ঘটনা দেখা যায়নি কাছে কোন সময়ে। পুরান ঢাকায় চকবাজারের পুড়ে যাওয়া ভবন ওয়াহেদ ম্যানশনের ভূগর্ভস্থ তলায়  বিভিন্ন ধরনের বিপুল পরিমান অক্ষত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। অগ্নিকান্ডের সময় এগুলো আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ  ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তরা।

 বন্ধ গুদামটি নিয়ম না মেনেই তৈরি করা হয়েছিল।  এ দেশে অনেক বিত্তবানদের ভবন তৈরির অনুমোদন লাগে না, ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিতে নিয়মনীতি লাগে না, ঘুষ খেতে বুক কাঁপে না। তাইতো এদেশে তাজরিন ট্র্যাজেডি, নিমতলি ট্র্যাজেডি, সর্বশেষ চকবাজার ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চরিত্রই মনে হয় এরূপ। দেশে গত ১০ বছরে অন্তত ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৫৯০ জন। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের একটি  অংশ হলো ফায়ার কোড। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বাধা নিষেধের কথা রয়েছে। ফায়ার কোড অনুযায়ী আবাসিক এলাকার মধ্যে রাসায়নিক গুদাম থাকার কথা  নয়। চকবাজারের রাসায়নিক উপাদান যেভাবে মজুত থাকার কথা, সেভাবে করা হয়নি। রাসায়নিক ষ্টোরেজের নিরাপত্তা একেবারেই রক্ষা করা হয়নি। চকবাজারের চুড়িহাট্টার ধ্বংসস্তূপ এখন ধোঁয়া-মোছার কাজ চলছে। তা হয়তো অনায়াসে করা যাবে। কিন্তু মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হলো তা মনে হয় সহজেই মোছা যাবে না। এখন আমাদের জরুরি কর্তব্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত, নিহত-আহত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক
[email protected]
০১৭২৫-০৪৫১০৫