‘নিপীড়ক পুরুষেরা আমাদের ভয় পায়’

‘নিপীড়ক পুরুষেরা আমাদের ভয় পায়’

 কর্মক্ষেত্রে সংখ্যার দিক থেকে নারীরা পিছিয়ে আছে প্রায় সবখানেই। অনেকে শিক্ষা-দক্ষতার অভাবের কথা বললেও এর জন্য সমানভাবে নারীদের নিরাপত্তাহীনতাকে দায়ী করা হয়। কিছুদিন আগেই বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলেছিল #মিটু আন্দোলন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির লোমহর্ষক সব ঘটনা বেরিয়ে আসছিল একে একে। কিন্তু, তাতে কাজের কাজ হয়েছে কতটুকু! বেশিরভাগ ক্ষমতাশালীরাই থেকে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।


তবে, এদিক থেকে ব্যতিক্রম উগান্ডার রাজধানী কামপালার নাকাওয়া বাজারের নারী কর্মীরা। নিজেদের সুরক্ষায় তারা তৈরি করেছেন অনন্য এক বলয়। সৃষ্টি করেছেন আদর্শ উদাহরণ।

সেখানে নারী কর্মীদের গায়ে আপত্তিকর স্পর্শ করলেই বিপদ! গুনতে হবে বিপুল অংকের জরিমানা, অপরাধ বেশি হলে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে বাজারে আসাই। এ কারণে, বাজারটিতে ঢুকলে সাধারণত সভ্য-শান্ত হয়েই থাকেন পুরুষেরা। 

নাকাওয়া বাজারে কলা বিক্রি করেন নোরা বাগুমা। তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, কিছু পুরুষের অভ্যাস আছে নারীদের স্পর্শ করা। আমরা তাদের ‘বায়ায়ে’ বলি। এ কাজের জন্য তাদের সাজা দেই।

কামপালার সবচেয়ে বড় বাজার নাকাওয়ায় প্রায় সাত হাজার নারী কর্মী কাজ করেন। তাদের প্রতিনিধি নোরা। 

তিনি বলেন, কেউ ঝামেলা করলে তাকে অফিসে নিয়ে যাই। তারা ওই ব্যক্তিকে এক সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য বহিষ্কার করতে পারে। এ কারণে, তারা আমাদের ভয় পায়।

ছোটবেলা থেকেই নাকাওয়া বাজারে কাজ করছেন ক্যাথরিন। 
নাকাওয়া বাজারে নারীদের যৌন হয়রানি রোধে সচেতনতার কাজ করছে ‘ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন’ নামে একটি স্থানীয় সংস্থা। আগে, কেউ হেনস্তার শিকার হলে অনানুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানাতে পারতো। এখন, যৌন হয়রানির জন্য নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। 

বাজারটিকে মোট ছয়টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি জোনে আছে ৪০টি বিভাগ। প্রতি বিভাগে আছে একজন করে নারী প্রতিনিধি। যৌন হেনস্তার শিকার হলে প্রথমেই তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে হয়। এরপর জোন লিডার, সবার শেষে বাজার শৃঙ্খলা কমিটি।

কাউকে হয়রানির শাস্তির বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন মাছ বিক্রেতা ক্যাথরিন নানজিগে। তিনি বলেন, যৌন হয়রানি করলে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ উগান্ডান শিলিং (মুদ্রা) জরিমানা দিতে হবে। জরিমানা দেওয়ার পর যদি আবারও একই কাজ করে, তাহলে এক মাসের জন্য বহিষ্কার। যদি এরপরও না থামে, বাজার থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার।

ছোটবেলায় মাকে দোকানের কাজে সাহায্য করতেন ক্যাথরিন। এখন নিজেই দোকান চালান। তিনি বলেন, তারা আমাকে দেখলে ভয় পায়। কারণ তারা জানে, যদি কাউকে স্পর্শ করতে দেখি, যা অনভিপ্রেত, এক লাখ শিলিং জরিমানা দিতে হবে।

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাজারের বেশিরভাগ নারী এগিয়ে এলেও এখনো মুখ খুলতে ভয় পান অনেকেই। এদের বেশির ভাগেরই বয়স কম।

যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন সুজান।
নাকাওয়া বাজারের আরেক বিক্রেতা সুজান টাফুম্বা বলেন, এখানে খাবার পরিবেশনকারীদের বয়স কম, বড়জোর ১২-১৩ বছর। কাস্টমারদের কাছে খাবার নিয়ে গেলে তারা তাদের হেনস্তা করে।

‘টাকা দেওয়ার আগে তারা (কাস্টমার) বক্ষ ছুঁতে পারে, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতে পারে বা কিছু বলতে পারে। কিশোরী মেয়েরা জানে না তারা সাহায্য পেতে পারে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত তারা চুপই থাকে।’

বিশ্বের ৬১ শতাংশ ও উগান্ডার ৮০ শতাংশের বেশি কর্মী এ ধরনের ছোটখাট খাতেই কাজ করে থাকেন। আর তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার। এ কারণে, এ খাতের কর্মীদের যৌন নিরাপত্তায় নাকাওয়া বাজারের এমন পদক্ষেপ প্রশংসিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।