নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে কারসাজি

নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে কারসাজি

আব্দুল হাই রঞ্জু : গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ’১৯ জাতীয় এক দৈনিকে ‘ভোজ্যতেলের ডিও বিক্রি বন্ধ, বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। উক্ত খবরে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভোজ্যতেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিও (সরবরাহ আদেশ) বিক্রি বন্ধ রেখেছে। ফলে সরবরাহ সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সংকটের কারণে ভোজ্য তেলের বাজার অস্থির হওয়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। আর শঙ্কা করাটাই স্বাভাবিক। কারণ বাজারে যে কোন পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে, এটাই বাজার অর্থনীতির সূত্র। এ সূত্রের ব্যতিক্রম হওয়ার কোন সুযোগ নেই। জানা গেছে, সরবরাহ সংকটের কারণে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে পাঁচ থেকে আট টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। এই খবরের প্রতিবেদক রাজধানীর পাইকারী বাজারে ঘুরে দেখেছেন, ভোজ্যতেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণে বেড়েছে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। মৌলভীবাজারে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি মণ সয়াবিন তেল ২ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হলেও তা সপ্তাহ পর বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৯৫০ টাকায়। একই অবস্থা পাম ওয়েল এবং সুপার পাম ওয়েলের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

স্বীকার করতেই হবে, আমাদের দেশে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সুযোগ পেলেই ভোক্তার গলা কাটে। এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ২/৪ দিন চাল সরবরাহ সংকটের কারণে কেজিতে ৫-৭ টাকা পর্যন্ত চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। নতুন মন্ত্রীর বিব্রতকর অবস্থায় পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। খাদ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী  চালকল মালিক প্রতিনিধি এবং পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের খাদ্য ভবনে ডেকে দাম কমানোর অনুরোধ করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, নির্বাচনের কারণে চালের সরবরাহ কমায় কেজিতে ২/১ টাকা চালের দাম বেড়েছে। সরবরাহ বাড়লে এই কৃত্রিম সংকট থাকবে না। অবশ্য সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই চালের বাজার নি¤েœ চলে আসে। এখন আবার মানুষের নিত্যপণ্য ভোজ্যতেল, ডিম, ডালের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ডিমের মূল্য অনেক বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ব ইজতেমার কারণে রাস্তায় স্বাভাবিক গাড়ি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ডিমের সরবরাহ কমেছে। ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ডিমের বাজার কমে আসবে। কতটুকু দাম কমে, যা দেখার জন্য হয়ত ক’দিন অপেক্ষা করতে হবে।

বিশেষ করে চাল, ডাল চিনির মতো নিত্যপণ্যের দাম যখন হুহু করে বাড়ে, তখন সাধারণ ভোক্তাদের কষ্ট বাড়ে। যা নিয়ে সরকারের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবার সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে নিত্যপণ্যের মূল্যও বাড়ে। যা অস্বীকার করারও কোন জো নেই। প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে চিনির প্রসঙ্গটি নিয়ে একটু আলোকপাত করছি। চিনি উৎপাদনের কাঁচামাল হচ্ছে আখ। আর একসময় আখের ব্যাপক চাষাবাদ দেশেই হতো। দেশীয় চিনিকলগুলোয় সে আখ মাড়াই করে যে পরিমাণ চিনি উৎপাদন হতো, যা দিয়ে দেশীয় চাহিদার পুরোটাই পূরণ করা সম্ভব হতো। আর দেশে কৃষিভিত্তিক ভারি শিল্প বলতে চিনিকলগুলোই ছিল অন্যতম। সেই কৃষিভিত্তিক চিনিকলগুলো এখন রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় শ্রেণী স্বার্থেই ভ্রান্তনীতি প্রণয়ন করে। ফলশ্রুতিতে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অতি নিত্যপণ্য চিনির বাজার দখল করেছে বিদেশি চিনি। গত এক দশক আগে হাতে গোনা ক’টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দেয়া হয়। যারা বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে পরিশোধন করে বিপণন করছে। বলতে গেলে চিনির পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন কোম্পানিগুলোর হাতে। অনেক সময়ই বাড়তি মূল্যে ভোক্তাদের চিনি কিনে খেতে হয়। দেশীয় চিনিকলগুলো সীমিত আকারে চিনি উৎপাদন করায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং বাড়তি মূল্যে সে চিনি কোন ভোক্তাই কিনে না। ফলে দেশীয় চিনিকলে উৎপাদিত হাজার হাজার টন চিনি অবিক্রিত থেকে যায়। অনেক সময় দীর্ঘদিন মজুদের কারণে চিনি মিলেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার চিনি অবিক্রিত থাকার কারণে কর্তৃপক্ষ শ্রমিক কর্মচারির বেতন ভাতা পরিশোধ করতে পারে না। এমনকি অনেক সময় শ্রমিক-কর্মচারিদের অনুকূলে বেতন-ভাতা কিম্বা অবসর সুবিধার বিপরীতে চিনি সরবরাহ করা হয়। কি অদ্ভুত নিয়ম! সরকার যদি উৎপাদিত চিনি বিক্রি করতে না পারে, তাহলে শ্রমিক কর্মচারি সে চিনি বিক্রি করবে কি ভাবে? জানা গেছে, এখানেও এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী নামমাত্র দামে চিনি কিনে বাণিজ্য করে।  

যেখানে প্রতিবছরই শত শত কোটি টাকা দেশীয় চিনিকলগুলোকে লোকসান গুনতে হয়, সেখানে অপরিশোধিত চিনি আমদানি বন্ধ হয় না কেন? মূলত দেশের সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যে কোন পণ্য সরকার আমদানি কিম্বা রফতানি করে থাকে। হয়ত এক সময় চিনির বাড়তি মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দিয়েছিল। বাস্তবে অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দেয়াটাই ছিল আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। কারণ অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন করতে মিল মেশিনারিজ বসিয়ে নতুন করে কারখানা স্থাপন করতে হয়েছে। সে অজুহাতে এখন হয়তো সরকার মিলগুলোকে বন্ধ করতে পারছে না। কিন্তু এটাও খোঁড়া অজুহাত। কারণ যেখানে দেশীয়ভাবে স্থাপিত সকল চিনিকলগুলোকে পূর্ণ উৎপাদনে আনতে পারলে দেশের মোট চাহিদার চিনি দেশীয় ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেখানে বহুজাতিক কোম্পানির মতো গুটিকতক ব্যবসায়ীর হাতে ভোক্তার গলাকাটার সুযোগ বছরের পর বছর ধরে চালু রাখতে হবে কেন? আগেই বলেছি, শ্রেণীস্বার্থে ক্ষমতাসীনরা গুটিকতক ব্যবসায়ীদেরকে এ ধরনের সুযোগ দিয়ে থাকে। যে সুযোগে অপরিশোধিত চিনি আমদানিকারকরা এখন অর্থে বিত্তে ফুলে ফেঁপে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে দেশের আখচাষীরা মিল গেটে আখ বিক্রি করে পাওনা টাকাটা পর্যন্ত পাচ্ছেন না। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘৭১’ টিভিতে একটি স্বচিত্র প্রতিবেদন দেখলাম। দেখা গেল, ৭ হাজার আখচাষী কুষ্টিয়া সুগার মিলে আখ বিক্রির সাড়ে বারো কোটি পাওনা টাকার দাবিতে মিলগেটে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করছে। এ প্রসঙ্গে আখ চাষি কল্যাণ সমিতির নেতারা বলছেন, মিল গেটে আখচাষীরা আখ বিক্রি করে দীর্ঘদিনেও পাওনা টাকা না পাওয়ায় আখ চাষ ছেড়ে দিচ্ছে। বাস্তবে আমাদের দেশে আখচাষী, ধানচাষী, সবজি চাষীদের একই অবস্থার শিকার হতে হয়। যে কোন কৃষি পণ্যের ভাল ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। ফলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও কঠিন হয়। উল্লেখ্য, উপযুক্ত মূল্য পেলে সে পণ্যের চাষাবাদ বাড়ে, আর সে চাষাবাদে তখন চাষীরা বেশি করে ঝুঁকে পড়ে। তখন বাড়তি ফলনের কারণে ন্যায্য মূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ পরিকল্পিত চাষাবাদের অভাবে চাষীদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

অথচ আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। কৃষির সমৃদ্ধি ব্যতিত সমৃদ্ধ জাতি গঠনও সম্ভব নয়। মান্ধাতা আমলের চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে চিনি উৎপাদন করতে পারলে উৎপাদন খরচও কমে আসতো। আর উৎপাদন খরচ কম হলে দেশীয় চিনি দিয়ে সারা বছরের চাহিদা মেটানোও সম্ভব হতো। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সরল এই সমিকরণ ক্ষমতাসীনরা বুঝেও বুঝতে চান না। ফলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি থেকেও সরে আসে না। আগেই বলেছি, শ্রেণী স্বার্থ রক্ষাই জনস্বার্থের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। তাই অতি নিত্যপণ্য চিনি আমদানি বন্ধ হয় না। একই ভাবে ভোজ্য তেলের ডিও (সরবরাহ আদেশ) গুটিকতক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়াও বন্ধ হয় না।  ফলে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির মত নিত্যপণ্যে গুটিকতক ব্যবসায়ী ভোক্তার গলাকেটে হলেও চুটিয়ে ব্যবসা করে। এ প্রসঙ্গে মৌলভীবাজারের একজন পাইকারী ব্যবসায়ী বলেন, ইচ্ছে করেই কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য নি¤œমুখী ছিল। এখন বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে ডিও বন্ধ করায় ভোজ্যতেলের মূল্য বেড়ে গেছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, স্বাভাবিক অন্য সময়ের মতো এখনও প্রতিদিন ডিও বিক্রি হচ্ছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা একদিনে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু দাম কমলে চুপচাপ থাকে কোম্পানিগুলো। এটাই বাস্তবতা। লাভ লোকসানের যখন প্রশ্ন, তখন ভোক্তার গলাকাটা যায় কি ভাবে, সে দিকেই কোম্পানিগুলোর নজর পড়ে, এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা মনে করি, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিত্যপণ্যের সরবরাহ হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির দখল মুক্ত করা উচিত। তাহলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, আর সরবরাহ বাড়লে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাও কমে আসবে। ফলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থই রক্ষা হবে, এটাই নিখাদ সত্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ’১৯ জাতীয় এক দৈনিকে ‘ভোজ্যতেলের ডিও বিক্রি বন্ধ, বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। উক্ত খবরে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভোজ্যতেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিও (সরবরাহ আদেশ) বিক্রি বন্ধ রেখেছে। ফলে সরবরাহ সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সংকটের কারণে ভোজ্য তেলের বাজার অস্থির হওয়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। আর শঙ্কা করাটাই স্বাভাবিক। কারণ বাজারে যে কোন পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে, এটাই বাজার অর্থনীতির সূত্র। এ সূত্রের ব্যতিক্রম হওয়ার কোন সুযোগ নেই। জানা গেছে, সরবরাহ সংকটের কারণে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে পাঁচ থেকে আট টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। এই খবরের প্রতিবেদক রাজধানীর পাইকারী বাজারে ঘুরে দেখেছেন, ভোজ্যতেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণে বেড়েছে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। মৌলভীবাজারে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি মণ সয়াবিন তেল ২ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হলেও তা সপ্তাহ পর বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৯৫০ টাকায়। একই অবস্থা পাম ওয়েল এবং সুপার পাম ওয়েলের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

স্বীকার করতেই হবে, আমাদের দেশে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সুযোগ পেলেই ভোক্তার গলা কাটে। এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ২/৪ দিন চাল সরবরাহ সংকটের কারণে কেজিতে ৫-৭ টাকা পর্যন্ত চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। নতুন মন্ত্রীর বিব্রতকর অবস্থায় পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। খাদ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী  চালকল মালিক প্রতিনিধি এবং পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের খাদ্য ভবনে ডেকে দাম কমানোর অনুরোধ করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, নির্বাচনের কারণে চালের সরবরাহ কমায় কেজিতে ২/১ টাকা চালের দাম বেড়েছে। সরবরাহ বাড়লে এই কৃত্রিম সংকট থাকবে না। অবশ্য সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই চালের বাজার নি¤েœ চলে আসে। এখন আবার মানুষের নিত্যপণ্য ভোজ্যতেল, ডিম, ডালের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ডিমের মূল্য অনেক বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ব ইজতেমার কারণে রাস্তায় স্বাভাবিক গাড়ি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ডিমের সরবরাহ কমেছে। ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ডিমের বাজার কমে আসবে। কতটুকু দাম কমে, যা দেখার জন্য হয়ত ক’দিন অপেক্ষা করতে হবে।

বিশেষ করে চাল, ডাল চিনির মতো নিত্যপণ্যের দাম যখন হুহু করে বাড়ে, তখন সাধারণ ভোক্তাদের কষ্ট বাড়ে। যা নিয়ে সরকারের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবার সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে নিত্যপণ্যের মূল্যও বাড়ে। যা অস্বীকার করারও কোন জো নেই। প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে চিনির প্রসঙ্গটি নিয়ে একটু আলোকপাত করছি। চিনি উৎপাদনের কাঁচামাল হচ্ছে আখ। আর একসময় আখের ব্যাপক চাষাবাদ দেশেই হতো। দেশীয় চিনিকলগুলোয় সে আখ মাড়াই করে যে পরিমাণ চিনি উৎপাদন হতো, যা দিয়ে দেশীয় চাহিদার পুরোটাই পূরণ করা সম্ভব হতো। আর দেশে কৃষিভিত্তিক ভারি শিল্প বলতে চিনিকলগুলোই ছিল অন্যতম। সেই কৃষিভিত্তিক চিনিকলগুলো এখন রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় শ্রেণী স্বার্থেই ভ্রান্তনীতি প্রণয়ন করে। ফলশ্রুতিতে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অতি নিত্যপণ্য চিনির বাজার দখল করেছে বিদেশি চিনি। গত এক দশক আগে হাতে গোনা ক’টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দেয়া হয়। যারা বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে পরিশোধন করে বিপণন করছে। বলতে গেলে চিনির পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন কোম্পানিগুলোর হাতে। অনেক সময়ই বাড়তি মূল্যে ভোক্তাদের চিনি কিনে খেতে হয়। দেশীয় চিনিকলগুলো সীমিত আকারে চিনি উৎপাদন করায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং বাড়তি মূল্যে সে চিনি কোন ভোক্তাই কিনে না। ফলে দেশীয় চিনিকলে উৎপাদিত হাজার হাজার টন চিনি অবিক্রিত থেকে যায়। অনেক সময় দীর্ঘদিন মজুদের কারণে চিনি মিলেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার চিনি অবিক্রিত থাকার কারণে কর্তৃপক্ষ শ্রমিক কর্মচারির বেতন ভাতা পরিশোধ করতে পারে না। এমনকি অনেক সময় শ্রমিক-কর্মচারিদের অনুকূলে বেতন-ভাতা কিম্বা অবসর সুবিধার বিপরীতে চিনি সরবরাহ করা হয়। কি অদ্ভুত নিয়ম! সরকার যদি উৎপাদিত চিনি বিক্রি করতে না পারে, তাহলে শ্রমিক কর্মচারি সে চিনি বিক্রি করবে কি ভাবে? জানা গেছে, এখানেও এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী নামমাত্র দামে চিনি কিনে বাণিজ্য করে।  

যেখানে প্রতিবছরই শত শত কোটি টাকা দেশীয় চিনিকলগুলোকে লোকসান গুনতে হয়, সেখানে অপরিশোধিত চিনি আমদানি বন্ধ হয় না কেন? মূলত দেশের সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যে কোন পণ্য সরকার আমদানি কিম্বা রফতানি করে থাকে। হয়ত এক সময় চিনির বাড়তি মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দিয়েছিল। বাস্তবে অপরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ দেয়াটাই ছিল আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। কারণ অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন করতে মিল মেশিনারিজ বসিয়ে নতুন করে কারখানা স্থাপন করতে হয়েছে। সে অজুহাতে এখন হয়তো সরকার মিলগুলোকে বন্ধ করতে পারছে না। কিন্তু এটাও খোঁড়া অজুহাত। কারণ যেখানে দেশীয়ভাবে স্থাপিত সকল চিনিকলগুলোকে পূর্ণ উৎপাদনে আনতে পারলে দেশের মোট চাহিদার চিনি দেশীয় ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেখানে বহুজাতিক কোম্পানির মতো গুটিকতক ব্যবসায়ীর হাতে ভোক্তার গলাকাটার সুযোগ বছরের পর বছর ধরে চালু রাখতে হবে কেন? আগেই বলেছি, শ্রেণীস্বার্থে ক্ষমতাসীনরা গুটিকতক ব্যবসায়ীদেরকে এ ধরনের সুযোগ দিয়ে থাকে। যে সুযোগে অপরিশোধিত চিনি আমদানিকারকরা এখন অর্থে বিত্তে ফুলে ফেঁপে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে দেশের আখচাষীরা মিল গেটে আখ বিক্রি করে পাওনা টাকাটা পর্যন্ত পাচ্ছেন না। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘৭১’ টিভিতে একটি স্বচিত্র প্রতিবেদন দেখলাম। দেখা গেল, ৭ হাজার আখচাষী কুষ্টিয়া সুগার মিলে আখ বিক্রির সাড়ে বারো কোটি পাওনা টাকার দাবিতে মিলগেটে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করছে। এ প্রসঙ্গে আখ চাষি কল্যাণ সমিতির নেতারা বলছেন, মিল গেটে আখচাষীরা আখ বিক্রি করে দীর্ঘদিনেও পাওনা টাকা না পাওয়ায় আখ চাষ ছেড়ে দিচ্ছে। বাস্তবে আমাদের দেশে আখচাষী, ধানচাষী, সবজি চাষীদের একই অবস্থার শিকার হতে হয়। যে কোন কৃষি পণ্যের ভাল ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। ফলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও কঠিন হয়। উল্লেখ্য, উপযুক্ত মূল্য পেলে সে পণ্যের চাষাবাদ বাড়ে, আর সে চাষাবাদে তখন চাষীরা বেশি করে ঝুঁকে পড়ে। তখন বাড়তি ফলনের কারণে ন্যায্য মূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ পরিকল্পিত চাষাবাদের অভাবে চাষীদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

অথচ আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। কৃষির সমৃদ্ধি ব্যতিত সমৃদ্ধ জাতি গঠনও সম্ভব নয়। মান্ধাতা আমলের চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে চিনি উৎপাদন করতে পারলে উৎপাদন খরচও কমে আসতো। আর উৎপাদন খরচ কম হলে দেশীয় চিনি দিয়ে সারা বছরের চাহিদা মেটানোও সম্ভব হতো। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সরল এই সমিকরণ ক্ষমতাসীনরা বুঝেও বুঝতে চান না। ফলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি থেকেও সরে আসে না। আগেই বলেছি, শ্রেণী স্বার্থ রক্ষাই জনস্বার্থের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। তাই অতি নিত্যপণ্য চিনি আমদানি বন্ধ হয় না। একই ভাবে ভোজ্য তেলের ডিও (সরবরাহ আদেশ) গুটিকতক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়াও বন্ধ হয় না।  ফলে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির মত নিত্যপণ্যে গুটিকতক ব্যবসায়ী ভোক্তার গলাকেটে হলেও চুটিয়ে ব্যবসা করে। এ প্রসঙ্গে মৌলভীবাজারের একজন পাইকারী ব্যবসায়ী বলেন, ইচ্ছে করেই কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য নি¤œমুখী ছিল। এখন বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে ডিও বন্ধ করায় ভোজ্যতেলের মূল্য বেড়ে গেছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, স্বাভাবিক অন্য সময়ের মতো এখনও প্রতিদিন ডিও বিক্রি হচ্ছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা একদিনে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু দাম কমলে চুপচাপ থাকে কোম্পানিগুলো। এটাই বাস্তবতা। লাভ লোকসানের যখন প্রশ্ন, তখন ভোক্তার গলাকাটা যায় কি ভাবে, সে দিকেই কোম্পানিগুলোর নজর পড়ে, এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা মনে করি, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিত্যপণ্যের সরবরাহ হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির দখল মুক্ত করা উচিত। তাহলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, আর সরবরাহ বাড়লে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাও কমে আসবে। ফলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থই রক্ষা হবে, এটাই নিখাদ সত্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক

০১৯২২-৬৯৮৮২৮

[email protected]