নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোন বড় সম্পদ নেই

নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে  জীবনে আর কোন  বড় সম্পদ নেই

গোলাম মোস্তফা ঠান্ডু : আজ ২১শে জুলাই। বাঙালি জাতির এক মহাবীরের মহাপ্রস্থান। ২১শে জুলাই ১৯৭৬ সাল ভোর রাতে প্রহসনের আদালতে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে পরাধীন ঔপনিবেশিক কায়দায় গড়ে উঠা সেনাবাহিনী কখনোই স্বাধীন দেশের উপযোগী হতে পারে না। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পূর্বশর্ত হিসাবে তিনি আমলাতান্ত্রিক, উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন, শাসকের হাতিয়ার ও ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙ্গে জনতার কাঠামো, জনতার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে পা হারানো একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম বীর সেনা নায়ক, ১১নং এর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম কে নিজ দেশে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ক্ষুদিরাম বসু, সূর্য সেনের নামের সাথে আর একটি নাম যুক্ত হলো কর্নেল আবু তাহের। সময়ের সাহসী পুরুষ, যার কাছে স্বাধীনতার মানে ছিল সামগ্রিক মুক্তি। মুক্তিকামী নিপীড়িত বাঙালি জাতিকে মুক্ত করার জন্য তিনি পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ঔপনিবেশিক শোষণ মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত একটি জনযুদ্ধ হিসাবে দেখেছিলেন। অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার পর তিনি দেখতে পেলেন, পরাধীন দেশের ঔপনিবেশিক কায়দায় গড়ে উঠা সেনাবাহিনী কখনোই স্বাধীন দেশের উপযোগী হতে পারে না। তিনি একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার কাজলা গ্রামে বাংলাদেশের প্রথম বিপ্লবী, গণঅভ্যূত্থানের মহানায়ক লে. কর্ণেল আবু তাহের বীর উত্তম জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম থেকে এস.এস.সি ও ১৯৫৯ সালে সিলেট এম.সি কলেজ থেকে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এর পর কিছুদিন মিরসরাই উপজেলার দূর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬০ সালে সমাজকল্যাণ ইন্সটিটিউটে ১ম পর্ব পর্যন্ত অধ্যায়ন করেন। এর পর তিনি সেনাবাহিনীতে চলে যান। কর্ণেল আবু তাহের ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত এমন একজন সামরিক কর্মকর্তা যিনি সচেতনভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মূলত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই তার সেনাবাহিনীতে যোগদান। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েই তিনি সবচেয়ে ভালো ও চৌকস প্রশিক্ষণ নেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। অন্যান্য বাঙালি সৈনিক ও সেনা কর্মকর্তাকে তিনি উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তাহের সিনিয়র টেকনিক্যাল কোর্স করছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশে কোয়েটার ইনফেন্ট্রি  স্কুলে। ১৯৭১ সালের ২৬মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি চরম প্রতিকূলতা জয় করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে আসেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কর্ণেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাকে সক্রিয় করেন। ১৫ই আগষ্টের খলনায়করা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিচক্র ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মজিব নগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করে পরিস্থিতি জটিল করে ফেলে।

 এমন পরিস্থিতিতে কি করা যায় তা নিয়ে ১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে জাসদের নেতাকর্মি ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অবিরাম বৈঠক চলে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতারা মনে করেন তাদের যেটুকু শক্তি আছে তা নিয়েই যদি সৈনিক জনতার অভ্যূত্থান সংগঠিত করা যায় তবে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে তা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথকে সুগম করতে পারবে এবং ষড়যন্ত্রকারী দেশি-বিদেশি চক্র ও ১৫ই আগস্টের খলনায়ক খন্দকার মোস্তাককে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তেনের পথ বন্ধ করতে পারবে। সেই কারণে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মোস্তাকের বিকল্প হিসেবে নেতৃত্বে বসালে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করলেন। শুধুমাত্র কর্ণেল তাহেরের শুভানুধ্যায়ী হওয়ায় জিয়াকে নিয়ে জাসদের বিপ্লবী প্রক্রিয়ার পক্ষে সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা সমস্যা হবে না। (তখন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস ছিল না) বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পরিকল্পনা ও সমন্বয় অনুযায়ী সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান সূচিত হলো ৬ই নভেম্বর দিবাগত রাতে অর্থাৎ ৭ই নভেম্বর। সিদ্ধান্ত মোতাবেক বন্দি জিয়াউর রহমানকে পাল্টা অভ্যূত্থানের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয় কর্ণেল তাহেরের নির্দেশে। অত:পর মুক্ত জিয়াউর রহমান দুই সপ্তাহের মাথায় জাসদের নেতৃবৃন্দ সহ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও কর্নেল তাহেরকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেফতার করেন। এই ঘটনার ছয় মাসের মাথায় জেলখানার অভ্যন্তরে প্রহসনমূলক মিথ্যা মামলায় ২১শে জুলাই ১৯৭৬ সালে তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয় এবং অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করেন। ’৭৬ এর ক্ষুদিরাম- কর্ণেল তোমায় লাল সালাম।
লেখক ঃ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাসদ,
 বগুড়া জেলা ও কেন্দ্রীয় সদস্য
০১৬৮৭-১৬১৪৪৯