নরপশু, সভ্যতা এবং ধর্ষণ...

নরপশু, সভ্যতা এবং ধর্ষণ...

মীর আব্দুল আলীম:বনানীতে ফের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সাভারে ধর্ষিতা বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। কোথায় ধর্ষণ, নারী নির্যাতন হচ্ছে না? ধর্ষণ হচ্ছে বনানীতে, ধর্ষণ হচ্ছে টেকনাফ থেকে তেতুলীয়ায়। সাভার, টাঙ্গাইল, বরিশাল, নোয়াখালীসহ সারা দেশে ধর্ষণ চলছে। ধর্ষিত হচ্ছে শিশু, যুবতী, গৃহবধূ, বিধবা, বৃদ্ধা। ধর্ষক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, পুলিশ, মাওলানা, ড্রাইভার, হেলপার, রাজনৈতিক সংগঠনসহ সকল শ্রেণী পেশার নরপশু। কিছুতেই ধর্ষণ থামছে না। ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশয়সহ বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায় বলেই ধর্ষণ থামছে না। কতক মানুষরূপী নরপশু সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে সারাদেশে হায়েনার নখ মেলে বসে আছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানীর একটি গেস্ট হাউসে জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ডেকে নিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে কয়েক যুবক। যদিও সেদিন আদৌ কারো জন্মদিন ছিল কি-না সে প্রশ্নের জবাব মিলছে না। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। এর আগে গত বছরের ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছিল। এরপর একই বছরের ৪ জুলাই বনানীর একটি বাসায় জন্মদিনের কথা বলে ডেকে নিয়ে একই কায়দায় তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ দিকে সাভারে ধর্ষণের বিচার না পেয়ে এক স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সাভারের আমিনবাজার সালেহপুর পশিচমপাড়া এলাকায় এ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। নিহত ওই স্কুলছাত্রী আমিনবাজার পশ্চিমপাড়া এলাকার ট্রাক চালক আমিনুল ইসলামের মেয়ে। সে স্থানীয় মিরপুর মফিদ-ই- আম স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো।

পত্রিকার খবরে জানতে পারি, স্কুলে আসা যাওয়ার পথে পাশের গ্রামের আমিনবাজার আসলামের বখাটে ছেলে রিহাবের সাথে পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে রিহাব প্রেমের ফাঁদে ফেলে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম এর বিচারের দায়িত্ব নেন। কিন্তু কোনো মীমাংসা ছাড়াই ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হলে ধর্ষণের বিচার না পেয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। নিত্যই ব্যভিচার ও ধর্ষণকামিতার ঘটনা ঘটছে তো ঘটছেই। রোধ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। রাতবিরাতে নয় শুধু, দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে তা হাল আমলের ধর্ষণের চিত্র দেখলেই বেশ টের পাওয়া যায়। যৌন হয়রানি শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও চরম অপরাধ। ভারত ও বাংলাদেশে ধর্ষণের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। খুন, ধর্ষণ বর্তমান পৃথিবীর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আমাদের দেশে এর মাত্রা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাই এ জন্য দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯(২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ-পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে।’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।’ ভারতে এক্ষেত্রে শুধু যাবজ্জীবনের কথা বলা আছে।


মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে জানা যায়, নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে অযোগ্য লোক থাকায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়াও এর আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে। শুধু আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মহামারী ব্যাপক রূপ নিয়েছে। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান বেশ কঠিন। সব কিছুতেই আজ দলবাজি চলে। তাতে কিছু মানুষ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। যৌন নির্যাতনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। নারীর ওপর বলপ্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও দেখা যায়, সামাজিকভাবে কোণঠাসা কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার আশায় অলীক কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু কাঙ্খিত সমাধান না পেয়ে, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর আগ্রাসী যৌন আচরণ, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ সবই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোতে নারীর অধস্তনতাই প্রকাশ করে নানারূপে। তাই ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, নারীর সম্মতি ছাড়া তার ওপর যে কোনো ধরনের আগ্রাসী যৌন আচরণ ক্ষমতা প্রদর্শনের, দমন-পীড়নের, কর্তৃত্ব করার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক বলেই নারীকে তারা গণ্য করে অধস্তন লৈঙ্গিক পরিচয়ের বস্তু হিসেবে, যা পীড়নযোগ্য। এটা খুবই আশঙ্কার কথা যে, সমাজে বেশিরভাগ নারীই নিরাপদ নয়। যারা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপরতলার মানুষ, এ জাতীয় বিপদ তাদের ছুঁঁতে পারে কম। এদেশে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি। যারা নিম্নবর্ণের বাসিন্দা, তারা সম্ভবত এখনও ধর্ষণকে স্বাভাবিক জ্ঞান করেন। ভয়ে চুপ থাকেন। ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন, আইন-আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধীরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ঈমানি শক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৌন কামনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শাস্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌন কামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে হৈচৈ পড়ে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের জনগণ একেবারেই নীরব। সচেতন কম। প্রতিবাদ হয় না, হলেও খুবই সামান্য।

ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা- নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, তা বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে।ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিজ নিজ পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতিচর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন রায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক তাদের দ্রুত আটক করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।সর্বোপরি, সরকারকে নারীর মর্যাদার আসন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বদলে যেতে হবে। আসুন আমরা নারীর ওপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়া-মমতার দৃষ্টিতে তাকাই। পরনারীকে কখনও মা, কখনও বোন, কখনোবা মেয়ে ভাবতে হবে। তবেই ধর্ষণ, নারী নির্যাতন কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৭৩৩-৩৬১১১১