নববর্ষের রঙের বৈশাখ

নববর্ষের রঙের বৈশাখ

আলহাজ্ব মোঃ নূরবক্ত মিঞা : আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি মূলত: নবান্ন উৎসব থেকে। আগের দিনের রাজা-বাদশাহ, জমিদার গণ খাজনা আদায় ও কৃষি কাজের সুবিধার জন্য বাংলা সনের প্রবর্তন করে। ব্যবসায়ীরা সারা বছরের বাকী বা পাওনা আদায়ের জন্য বাংলা সনের পহেলা বৈশাখে হাল-খাতা প্রচলন করেন, যা আজও ব্যাপক ধুম-ধামের সাথে পালিত হচ্ছে। বৈশাখ কেবল একটা মাস নয়, বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির নববর্ষ। বৈশাখ যখন আসি আসি করে, বাঙালি তখন মেতে উঠে বৈশাখ উদ্যাপনে। পহেলা বৈশাখের এসব আয়োজনের জন্য চাই নতুন পোশাক। বৈশাখ উদ্যাপনের জন্য বাঙালিরÑনতুন জামা-কাপড়, মজাদার খাবার, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ-গান-নাটক, বিভিন্ন আনন্দের আয়োজন থাকে। বৈশাখ নিয়ে অনেক গান, কবিতা রচিত হয়েছে, তন্মধ্যে ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ...’Ñএই গানটি বাঙালির বৈশাখ-বন্দনার উল্লেখ্যযোগ্য উৎস। বাঙালি উৎসবমূখর জাতি এবং উজ্জ্বল রঙেই তার প্রকাশ। যেকোনো সার্বজনীন উৎসবে এই অঞ্চলে ঐতিহ্যগত রঙের ব্যবহারেই বেশী হয়। প্রকৃতিতে বৈশাখের নিজস্ব একটা রঙ আছে, তার প্রকাশ ঘটলে বদলে যায় বাঙালির রূপ। নতুন রঙে বাংলার জীবনকে রাঙিতে আসে বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ নিয়ে বাঙালিদের উৎসাহ ও ব্যস্ততা অন্য আর সব উৎসবের আমেজকে ছাড়িয়ে যায়। অন্যান্য অনেক আয়োজনের সঙ্গে নতুন পোশাক পরাও পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের প্রধান একটি অনুষঙ্গ। উৎসবের পোশাকে রঙের ছটা তো থাকেই। রঙ সবসময়েই দেশ-কাল-পাত্র ভেদে একেক ধরনের অর্থ বহন করে। আমাদের কাছে সাদা পবিত্রতা, কালো শোক, লাল উৎসব। আমাদের দেশে লাল-সবুজ মানেই পতাকা, যা কিনা প্রকাশ করে স্বাধীনতা বা দেশ প্রেমের চেতনা, অপরদিকে কালো মানেই একুশে ফেব্রুয়ারি, তেমনি পহেলা বৈশাখ মানেই লাল-সাদা। বৈশাখ চিরায়ত রং সাদা-লালের চল কেন বা কবে থেকে, এ বিষয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বৈশাখের প্রধান  আয়োজন হালখাতা, যার মোড়কের অংশ লাল এবং ভেতরের পাতার রং সাদা, সেখান থেকে লাল-সাদা আসতে পারে।
যদিও এসব কারণের পিছনে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তেমন পাওয়া যায় না। কারণ, সাধারণভাবেই অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাল পেড়ে সাদা শাড়ির প্রচলন ছিল। বাস্তবতা হলো, ধীরে-ধীরে তা উৎসবের পোশাকে পরিণত হয়েছে। বাঙালির যেকোনে উৎসবেই একটা লাল রঙের প্রাধান্য সবসময় ছিল এবং আছে। ধারণা করা হয়, যেহেতু বৈশাখের প্রথম দিন বেশ গরম থাকে, তাই স্বস্তির কথা ভেবে সাদা ও উৎসবের চিহ্ন হিসেবে লাল রঙের ব্যবহার করা হয়। বৈশাখের রং লাল-সাদা হওয়ার কারণে যা-ই হোক, তা শুরু থেকে সার্বজনীনভাবে মানা হয়েছিল। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আনুষ্ঠানিক বর্ষবরণের মাধ্যমে এর কিছুটা বিস্তৃতি ঘটে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের বৈশাখী আয়োজনে লাল-সাদাকেই প্রেরণা হিসেবে বেচে নেওয়ার ধারাটি গতিশীল থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বৈশাখের রং হিসেবে লাল-সাদা ফ্যাশনে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব পেয়ে যায়। শুরুটা লাল-সাদা দিয়ে হলেও বৈশাখের পোশাকে ২০০৬Ñ০৭ এর দিক থেকে অন্যান্য রং যেমনÑহলুদ,পেষ্ট, গোল্ডেন, কালো, মেরুন, ম্যাজেন্টা, সবুজের বিভিন্ন রংয়ের ব্যবহার দেখা যায়। অন্য সব উৎসবে বিচিত্র রং ব্যবহার করার এবং সেসব পাল্টে নেয়ার সুযোগ আছে কিন্তু বৈশাখের ফ্যাশনে তা নেই এবং এটাই ভালো।
সুপ্রাচীনকাল থেকে নববর্ষ উদ্যাপনের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করা এখন জাতীয় চেতনার লক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নববর্ষ জীবনকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করে, এর আনন্দের স্পর্শ প্রেরণা সঞ্চার করে। তাই নববর্ষ এখন অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎসব। নববর্ষ আসে আনন্দের পসরা নিয়ে। তাই উৎসবের মাধ্যমে তাকে বরণ করে নেওয়া হয়। এই আনন্দের প্রভাবে জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারলেই নববর্ষ উদ্যাপন সার্থক হতে পারে। সমাজ ও জাতীয় জীবনে নববর্ষ যে আনন্দের জোয়ার বয়ে আনে তা ধরে রাখতে হবে। নববর্ষের মানবিক মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হতে হবে, জাতীয় জীবনে স্বকীয় চেতনা বিকাশে তৎপর হতে হবে। সেই মানুষে মানুষে সম্প্রীতি সৃষ্টির জন্য কবির ভাষায় বলতে হবেÑ
বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও/ ক্ষমা করো
আজিকারমত/ পুরাতন বছরের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।
জীর্ণ পুরাতন সবকিছু পিছনে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে আবার এলো বৈশাখ। শুরু হলো আরও একটি নতুন বছর; ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। দেশে স্থায়ীভাবে বিরাজিত হোক শান্তির সুবাতাস। বাংলা নববর্ষের এই শুভ লগ্নে সবার প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন। শুভ নববর্ষ।
লেখক : সাংবাদিক
০১৭১৬-২৪৯৮৫৯