নতুন ধানে নবান্ন

নতুন ধানে নবান্ন

মোঃ মুরশিদ আলম : অগ্রহায়ণের প্রথম দিন নবান্ন। নবান্ন বাংলাদেশে শস্য ভিত্তিক একটি লোক উৎসব। বাঙালি জীবনের নানা পার্বণের মধ্যে নবান্ন একটি অনন্য পার্বণ। বলতে গেলে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনুষঙ্গ। এই সংস্কৃতি আবহমানকাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। আদিতে বাংলাদেশে নবান্ন উৎসব পালন করতে প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়। হেমন্তকালে ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ মাসে গৃহস্থরা এই উৎসব পালনে মেতে ওঠে। উৎসবের প্রধান অঙ্গ ছিল নতুন চালে পিতৃ পুরুষের শ্রাদ্ধ করা। তারপর দেবতা, অগ্নি, কাকা, ব্রাহ্মণ ও আত্মীয় স্বজনদের নিবেদন করে গৃহকর্তা ও তার পরিবার বর্গ নতুন গুড় সহ নতুন চালের অন্ন গ্রহণ করত। এ উপলক্ষে বাড়ির প্রাঙ্গণে আল্পনা আঁকা হতো। পিঠা পায়েসের আদান প্রদান ও আত্মীয়স্বজনের আগমনে পল্লীর প্রতিটি গৃহের পরিবেশ হয়ে উঠতো মধুময় মুখরিত। হিন্দু সম্প্রদায় ছাড়া মুসলমানরাও এই উৎসব পালন করত। মুসলমানরা নতুন চালের ক্ষীর রান্না করে মসজিদে শিরনি দিত। পাড়ার বয়োবৃদ্ধকে সম্মান দেখিয়ে তাদেরকে নানা ধরনের পিঠা, পায়েস নতুন চালের ক্ষীর খাওয়ানোর পর অন্যরা খেতেন। নবান্নকে কেন্দ্র করে সব বাড়িতেই বিশেষ ও উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করা হতো। গ্রামে গরু মহিষ জবাই করা হত। ধনী দরিদ্র সবাই মাংস কিনত। যারা মাংস কিনতে সামর্থ রাখত না তাদেরকেও। মাংস দেওয়া হত।

যাতে করে তারা ও নবান্নের আনন্দ সমানভাবে ভোগ করতে পারে আর দশজনের ন্যায়। নতুন জামাইকে দাওয়াত দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে আনা হয়। এ ছাড়া আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে নতুন চাল, নারিকেল, গুড়, দুধ সহ নানা ধরনের খাবারের জিনিস পাঠান হয় বা হতো। গ্রামে এটাকে সাজন বলা  হয়। সাজন এর আভিধানিক কোন অর্থ নেই। তবে যেহেতু মাটির পাতিল ও বাঁশের তৈরি ডালাকে নানা রকম রং দিয়ে সাজন্ত বা সজ্জিত শোভিত করা হত এবং ওই সাজন্ত ডালা আর পাতিল ভরে দুধ, মিষ্টি, নতুন চাল, গুড় সহ নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য পাঠান হত। আর এই সাজন্ত এর অপভ্রংশ সাজন হয়ে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হত বলে অনুমান করলে ভুল হবে না। নবান্নের দিন নিজ বাড়ির মুরব্বী বা বয়োবৃদ্ধদের ছাড়া ও পাড়া প্রতিবেশী মুরব্বী বা বয়োবৃদ্ধদের জন্য নতুন চালের তৈরি নানা রকম খাবার পাঠানো হতো। এটা কেবল লোক দেখানোর জন্য করা হতো না। এটা করা হত অন্তরের অন্তস্থল থেকে উদগত ভক্তি শ্রদ্ধা প্রীতি আর ভালবাসা থেকে। আর ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দলবদ্ধভাবে এ বাড়ি ও বাড়ি গিয়ে খাবার খেত। নবান্ন উপলক্ষে বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন করা হত। মেয়েরা মাটি আগুনে পুড়ে সেই মাটি পানিতে ভিজে রেখে ইটের রং এর মত রং তৈরি করত। সাথে থাকত নীল রং আর চালের গুড়ি দিয়ে তৈরি সাদা রং। এই সব রং দিয়ে তারা ঘরে দেওয়ালে নানা রকম নকশা আঁকত। এই নকশা ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব কল্পনা আর ভাবনার বহি:প্রকাশ নবান্ন উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় বসত কীর্তন, পালাগান, কবি গান ও জারিগানের আসর। অনেক জায়গায় মেলা বসত। কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করে নিজের ও পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জন্য নতুন জামা কাপড় কিনত।
এমন উৎসবের নদীতে বর্তমানে আনন্দের ভাটা পড়েছে। চর জেগেছে নিরানন্দের। আমরা সবাই এখন খুবই আত্মকেন্দ্রিক হয়েছি। সময়, সুযোগ আর ব্যস্ততার কারণে সামাজিক দায়বদ্ধতা আর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বন্ধনের সুতাটা ছিড়ে যাবার উপক্রম হয়েছে। কেউ সময় দিতে পারছি না। আবার কেউ কারো আনন্দ বেদনায় আনন্দিত বা সমব্যাথি হতে পারছি না। অনেকেই চাকরির কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরবাসি হয়েছেন। এ ছাড়া একক পরিবার আর সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে কেউ সংযুক্ত থাকতে পারছি না। এই জন্য নবান্ন সহ গ্রামের অন্যান্য অনুষ্ঠান আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে বা গেছে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে এই উৎসব এখন রাজনীতি বা শহর কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সেখানে নবান্ন উৎসব পালনের নামে বা আদলে যা পালন করা হয় তাতে আনন্দ পাওয়া গেলেও হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জাত, আদিম অকৃত্রিম গ্রামের মত আনন্দ পাওয়া যায় না। আর পাওয়া যায় না গ্রামের খোদামাটি গন্ধ আর অগ্রহায়ণের ঘরে ওঠা নতুন ধানের সোনালি আভা আর সুবাস।
লেখক ঃ উন্নয়নকর্মি  
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬