নকলের ভয়াবহতা ও আমাদের ভবিষ্যৎ

নকলের ভয়াবহতা ও আমাদের ভবিষ্যৎ

মিরাজুল ইসলাম : ছাত্রজীবন শিক্ষার জীবন। শিক্ষা জীবনে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করার জন্য দিতে হয় পরীক্ষা। পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়িত করা হয় তার যোগ্যতার মাপকাঠি। শিক্ষা আমাদের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি। সু-শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। কিন্তু “নকল” নামের জঘন্য  নিন্দনীয় বিষয়টি শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রকৃত শিক্ষাকে আজ কলূষিত করেছে। নকল শিক্ষার লক্ষ্যকে দারুনভাবে ব্যাহত করেছে। এই নকল শব্দটি যে কবে শিক্ষার্থীদের মাথায় চেপে বসেছে তার দিনক্ষণ বলা বাহুল্য। তবে, হলফ করে বলা যায় যে ৪০/৫০ বছর পূর্বেও এই পদ্ধতি ছিল না। আমাদের দাদা ও নানাদের শিক্ষাজীবনের গল্পে শুনেছি, তাদের মধ্য নকল নামক ধারনাই ছিল না।

কিন্তু ১৫/২০ বছর পূর্বে থেকে এই নকলের প্রবণতা বেশ ভালো ভাবেই চলছে এবং বর্তমানে তা মহামারী আকার ধারণ করেছে। নকল বলতে কি বোঝায়, পরীক্ষার হলে যে সকল শিক্ষার্থী নিজেদের মেধাকে কাজে না লাগিয়ে, কাজে লাগায় বাহিরে থেকে নিয়ে আসা কাগজের টুকরো অথবা স্মার্ট ফোনের ভেতরে বই থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে কেবল একটা সার্টিফিকেট সংগ্রহের চেষ্টা করে, তাই নকল। বর্তমান ডিজিটাল যুগে  নকলের মাধ্যমটা পাল্টিয়েছেন অসৎ শিক্ষার্থীরা। মোবাইল ফোনে ছবি তুলে নিয়ে যাওয়া। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে পরীক্ষা হলরুমে তো স্মার্ট ফোন অথবা ইলেবট্রনিক  যন্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষেধ টা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ।

কেউ জুতার ভেতর, কেউ বা আবার শরীরের গোপন অংশের স্থানে নিয়ে প্রবেশ করে। গেটে যিনি চেক করে উনি তো টেরই পান না। অনেকে বোরখার মধ্য কাগজের টুকরো নিয়ে যায়। হয়তো বলবেন, পরীক্ষার হলে তো সেই কাগজের টুকরা আর ফোন তো বের করে না। হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন। কিন্তু পরীক্ষার কেন্দ্রের টয়লেটে গেলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন। দেখবেন, কাগজের বড় বড় পৃষ্ঠা পড়ে থাকে ডাস্টবিনের মতো। আবার কয়েকজন নকল করতে ধরা পড়লেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের সমর্থন পায়। আবার পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের পরই শিক্ষককে ইশারায় বলে দেয় এটা আমাদের দলের ছাত্র। একটু দেইখেন। এর পিছনে কিছু অসৎ শিক্ষকরাও দায়ী, কেননা তাদের শিক্ষাদানের মনোভাব খুবই শিথিলতাপূর্ণ। প্রাইভেট কোচিং শিক্ষকতায় তারা বেশি মনোযোগী। শিক্ষকতাকে বেঁেচ থাকার অবলম্বন হিসেবে বেছে নেয় মাত্র। ফলে শেণীকক্ষে  উপযুক্ত শিক্ষাদানে ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। অর্থের পরিমাণের উপর পরীক্ষার ফলাফল অনেকটা নির্ভর করে। আজ নকলবাজদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছেন। লাঞ্ছিত হচ্ছেন প্রশাসনিক কর্মকতা পর্যন্ত।

 সাম্প্রতিক জামালপুরের ঘটনায় অনেক কিছুই বলে দেয়। নকলবাজদের ডিগ্রি আছে বড় বড় কিন্তু তাদের সেই ছোট্ট বেলা থেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে তাদের হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত আছে। ফলে সমাজে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। কিন্তু কেন, এই নকল প্রবণতার জন্য দায়ী কে? এর দায়ী শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়। দায়ী শিক্ষক ও অভিভাবক মহলও এর দায়ভার এড়াতে পারবে না। অভিভাবকের উদাসীনতা এবং শিক্ষকের পাঠদানে শৈথিল্যকে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা যায়। অভিভাবক চায় সন্তানের ভালো ফলাফল আর শিক্ষক চায় প্রাইভেট বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম। কিন্তু নকলের পিছে ছুটে আমরা কি জয়ী হতে পেরেছি? নকলের হের ফেরে আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় শাসকদের চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য বিদেশে যেতে হয়। ডেঙ্গুর নিধক আনতে হয় প্রতিবেশী দেশ থেকে। আর সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতির কথা বাদ দিলাম। কথা যখন তুললাম, হ্যাঁ দুর্নীতির দায়ে দুদকের পরিচালক আটক হয়। এসব তো নকলেরই কারুকার্য। তাহলে, শিক্ষা ব্যবস্থায় এতো  জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা কোথায় যাচ্ছে। আর কি করছে তারা। তাদের দেশ ও দশের জন্য কাজে লাগানো যাচ্ছে না কেন? একজন ভালো শিক্ষার্থী হতে চাইলে। তাহলে তাকে সর্বদা মনে রাখতে হবে, নকলের মাধ্যমে, অসৎ উপায় অবলম্বন করে কেউ কোনোদিন সফলতা লাভ করতে পারেনি। সকল ধর্মেই বলে পাপ থেকে বিরত থাকো। আর পাপ মানব জীবনের ধ্বংস ডেকে আনে।
লেখক ঃ সংবাদকর্মি, বগুড়া
০১৭৪৪-৭৪৫০৬৯