দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানুন

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানুন

নাজমুল হক : চলমান রমজান মাসকে কেন্দ্র করে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে যা সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের বাহিরে অতিক্রম করছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট পণ্য মজুদ করে আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে যার দরুন প্রতিটি দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আর রীতিমত দূঃখ-দূর্দশা পোহাতে হচ্ছে এদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষদের। আয় না বাড়লেও, অকস্মাৎ বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম। আর এটি যেন সাধারণ মানুষদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এ পরিস্থিতি যে শুধু এই বছরে পোহাতে হচ্ছে এমনটি নয় বরং এটা যেন প্রতি বছরের অভ্যাসে পরিণত হয়ে আসছে। এজন্য সাধারণ ক্রেতাদের  মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়,বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে। আর এ সকল সাধারণ মানুষ মেনেই নিয়েছে যে এটি পরিবর্তন করার সাধ্য তাদের নেই। তাদের মতে,দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে,এটাই স্বাভাবিক তবে এত বেশি বৃদ্ধি পাওয়া সমীচীন নয়। পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের দাম কমিয়ে স্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করে। এক্ষেত্রে যেহেতু চাহিদা বাড়ে,তাই বেশি বিক্রি হওয়ায় মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যায়। যেমন: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যবসায়ীগণ রমজান উপলক্ষ্যে দাম কমিয়ে এনে ভোক্তাদের মধ্যে বেশি পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম ঘটে। এই দেশে রমজান মাস আসলেই ব্যবসায়ীরা “টার্নিং পয়েন্ট” হিসেবে বিবেচনা করে দ্রব্যমূল্যের দাম  ইচ্ছামাফিক বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করে। তবে সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তা কিন্তু নয়,বরং যেগুলোর বাড়তি চাহিদা রয়েছে সেগুলোর মূল্যে তফাৎ লক্ষ্যনীয়। মূলত যে কয়েকটি কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ে তার মধ্যে অন্যতম হলো-চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকা। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে,বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অতিরিক্ত মুনাফালোভী মনোভাব দায়ী। কখনও চাহিদা বেড়েছে, কখনও সরবরাহ নেই—ইত্যাদি এরকম নানান অযুহাত দিয়ে কৌশল অবলম্বন করে থাকে তারা।
হিসাব অনুযায়ী, গত মাসে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছিল ৫০-৫৫ টাকা দরে,যা এখন ৬০-৬৫ টাকা অর্থাৎ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ বিশ্ববাজারে তা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আগে যে চিনি প্রতি টন ২৯০ মার্কিন ডলার বিক্রি হতো, তা গত মার্চ মাস থেকে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ মার্কিন ডলার। তবুও এদেশে চিনির দাম কমেনি।
এদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে জনমনে স্বস্তি প্রদান করতে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে,রমজানে ভোজ্য তেলের চাহিদা থাকে ২.৫ থেকে ৩ লাখ টন,চিনি ৩ লাখ টন,ছোলা ৮০-৯০ হাজার,খেজুর ১৮ হাজার টন এবং পেঁয়াজ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টন এবং মসুর ডাল ৫০-৬০ হাজার টন। এছাড়াও চাল,গম,আদা ও রসুনও চাহিদার চেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে। আর এরই মধ্যে এই পণ্যগুলোর পর্যাপ্ত  মজুদ রাখা হয়েছে। আর রমজানের আগে থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলে আসছে, রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। অযৌক্তিকভাবে কোন দাম বাড়ানো যাবে না। কিন্তু   তারপরেও কিছু কিছু পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখানে আমার প্রশ্ন হলো, এত পণ্য মজুদ থাকার পরেও কেন পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়লো? এক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যবসায়ীর নিকট থেকে অভিযোগ শোনা যায় যে,পণ্য পরিবহনের পথে বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজির কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় যার অর্থনৈতিক প্রভাব চূড়ান্তভাবে গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধেও পণ্যবাহী যানবাহনের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। সরকারকে এগুলো যে কোন মূল্য বন্ধ করতে হবে। এর পাশাপাশি খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরবরাহজনিত ব্যবস্থার মান উন্নত করতে হবে। সর্বোপরী,বাজারকে অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করে সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সুচিন্তিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে বিকল্প বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেতন নাগরিক মহলকে তৎপর ও মনোযোগী হতে হবে আরও।
লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৭৫২-৬০৭২২৩