দেখার শক্তি লোভের চেয়ে বড়

দেখার শক্তি লোভের চেয়ে বড়

আতাউর রহমান মিটন: পুনরায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লি মসনদে ফিরেছেন আম আদমি পার্টি নেতা কেজরিওয়াল। দিল্লিতে ৭০টি আসনের মধ্যে ৬২-তেই বিজেপিকে ধরাশায়ী করে জয়ী হয়েছে তাঁর দল। সোমবার রাজধানী দিল্লীর রামলীলা ময়দানে তিনি শপথ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যো দিয়ে মাফলারওয়ালা নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল তৃতীয়বারের মত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। কেজরিওয়ালের শক্তি জনগণ। বিশেষ করে সমাজের স্বল্প আয়ের মানুষেরা তাঁর একান্ত শক্তি। দল হিসেবে এই জনতারা সবাই আম আদমি পার্টি না করলেও সরকার হিসেবে তাদের পছন্দ কেজরিওয়াল। সে কারণেই কেজরিওয়ালের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অটো চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মি, পড়–য়া ভাল শিক্ষার্থীরা। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বিরোধিদলের সদস্যদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যা দলটির রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিচয় তুলে ধরে।

বিভাজন ও বৈষম্যের উর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করতে চাইলে দিল্লির কেজরিওয়াল এর কাছে শিক্ষা নেয়া যায়। তাঁর কাছে কাজ অর্থাৎ জনগণের জন্য কাজ করাটাই বড়। দিল্লিবাসীও তার কাজের রাজনীতিকেই সমর্থন জানিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে নিজের দলের পুনরায় বিজয়ের পরে অহঙ্কারে ডুবে না গিয়ে তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘‘দিল্লির জন্য আরও অনেক কাজ বাকি। আমি একা করতে পারব না। সকলে মিলে করতে হবে। নির্বাচন শেষ। যেমন রাজনীতি হয়, হয়েছে। আমাকে অনেক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিরোধীরা আমাকে যা বলেছেন, সব ক্ষমা করে দিয়েছি আমি। অনুরোধ, রাজনীতিতে যা হয়েছে সব ভুলে যান। সকলের সঙ্গে মিলে দিল্লির উন্নতি করতে চাই আমি।’’
নিজে দুর্নীতিমুক্ত হলে যে জনকল্যাণে অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। একুশ শতকের উপযোগী করে দিল্লিকে গড়ে তুলতে তাই স্বল্প আয়ের মানুষদের বিনামূল্যে ১০০-২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ দিয়েছেন, সরকারি স্কুলে শিক্ষার মানোন্নয়ন করেছেন, হাসপাতালগুলোতে সেবার মান ও পরিধি বৃদ্ধি করেছেন। যারা সব সময় সীমিত সম্পদের অজুহাতে গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষের উপর করের বোঝা বৃদ্ধির কথা ভাবেন তাদের উচিত কেজরিওয়ালের কাছে শিক্ষা নেয়া। তিনি সরকারে গিয়ে উন্নয়নের প্রচলিত ধারাই পাল্টিয়ে দিয়েছেন। মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন উন্নয়নের কাজে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পাওয়া যায় না, এই ধারণা পাল্টাতে চাইলে দিল্লিকে দেখুন। কেজরিওয়াল বিশ্বাস করেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু অমূল্য, ¯্রষ্টা তা বিনামূল্যেই দিয়েছেন। শিক্ষা বা চিকিৎসা সেবা দিয়ে কেন টাকা নিতে হবে, কেন সরকারি বিদ্যালয় বা হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে সেবা পাওয়া যাবে না?’ মানুষকে ভালবেসে তিনি সরকারি পরিসেবাগুলোকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছেন আর দিল্লির মানুষও তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রতিদান দিয়েছে তাঁকে বিজয়ী করে। দিল্লির মানুষ নিশ্চয় বিশ্বাস করে ‘নেতা আসবে যাবে, দল আসবে যাবে, কিন্তু উন্নতির চাবিকাঠি থাকবে মানুষের হাতেই।’
রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলার একটা হিংসাত্মক প্রয়াস বহুদেশেই লক্ষ্য করা যায়। যদিও খেলার মাঠে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকলে যেমন খেলা জমে না ঠিক তেমনি রাজনীতিতেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকলে দলের ভেতরেও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের জন্ম নেয়, ফলে গণতন্ত্রের সত্যিকার সুফল থেকে বঞ্চিত হয় জনগণ। তাই কোন দেশ বা জাতি যদি সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন তাহলে গণতন্ত্রের বিকাশের স্বার্থেই তাদের উচিত বিরোধিদলের জন্য স্পেস তৈরী করা। গৃহপালিত বিরোধিদল দিয়ে আর যাই হোক, গণতন্ত্রের কোন বিকাশ হবে না।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘জগতের ইতিহাসে সর্বত্রই দেখা গেছে, এক পক্ষকে বঞ্চিত করিয়া অন্য পক্ষের ভালো কখনোই দীর্ঘকাল স্থায়ী হইতে পারে না।’ একদল দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা দেশের সাধারণ মানুষ সব সময়ই প্রতারিত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রতারণার এই ধারা কখনই স্থায়ী হবে না। একদিন না একদিন নির্যাতিত, নিরস্ত্র জনতা জেগে উঠবে এবং তারাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। দুর্বৃত্তদের সা¤্রাজ্য তারাই একদিন বিনাশ করবে। কালের ইতিহাস সেই স্বাক্ষ্যই বহন করে।
রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, ‘লোভ যখন বেশি হয় তখন দেখিবার শক্তি আরো কমিয়া যায়।’ ক্ষমতার লোভে অন্ধ শক্তির পক্ষে জনগণের কষ্ট আর সেই কষ্ট লাঘবের প্রত্যয় যে দিনে দিনে সঞ্চিত হয় তা দেখার মত শক্তি এদের থাকে না। ক্ষমতার চেয়ে দেশের সংবিধান, আইন ও নিজেদের নেয়া শপথকে বড়ো করে দেখার শক্তি তাদের মধ্যে লোপ পায়। অশুভ রাজনৈতিক শক্তি সাধারণতঃ নিজের শক্তিকে সংহত করার লক্ষ্যে দেশের ভেতরে অনৈক্যের খেলা জিইয়ে রাখে। মানুষ যেন সংগঠিত না হয়, তারা যেন সব সময় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থাকে তার একটা চেষ্টা সচেতনভাবেই এই শক্তি করে থাকে। এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে বিভেদের ফাঁকে নিজেদের টিকে থাকার চারা রোপণ করা। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে, কল্যাণবোধের চেতনায় সংগঠিত হলে অশুভ শক্তি কিভাবে ক্ষমতায় থাকবে? সেটা তারা চায় না আর জনগণও সেটা বুঝতে পারে না বলেই দেশে দেশে অশুভ শক্তির এত দাপট। রাজনীতির কুঞ্জবনে তাই এখন আর ভুবনমোহন ফুল ফোটে না, সেখানে তেজ নিয়ে বেড়ে ওঠে অশুভ কাঁটাবন!
এগিয়ে চলার জন্যে সব সময় নিজের শক্তিতেই ভরসা রাখা উচিত। অপরের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে কিন্তু সেটা পাওয়ার অপেক্ষায় নিশ্চেষ্ট থাকা সমীচিন নয়। যদি কোন জনগোষ্ঠী নিজের ক্ষমতার উপর ভরসা হারিয়ে অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে তখন তার পক্ষে নিজের স্বাতন্ত্র্য বা নিজের মত করে ভাল-মন্দ ঠিক করার অধিকার থাকে না। শাসনের সেই কালটাকেই আমরা বলি দুঃসময়। যে কাজ আমাকেই করতে হবে তার জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। ঠিক তেমনিভাবে যে কাজের জন্য স্বার্থত্যাগ করা দরকার তার জন্য কেবল কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে কোন লাভ নেই। জীবনে দুঃখ-কষ্ট আসে নিজের মধ্যেকার শক্তিকে উন্নীত করার তাগিদ হিসেবে। জীবনে দুঃখ নামলেও যারা নিজের শক্তিতে ভরসা করে না তাদের পক্ষে আসলে দুঃখের শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। তাই সবার আগে আমাদের ভাল করে বুঝতে হবে যে আমরা জনগণ শক্তিমান। আমাদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য যত বেশি থাকবে আমরা ততই সঙ্কুচিত হয়ে থাকব। অপমান বারে বারে ফিরে আসে, আসতেই থাকে। আমরা নিজেরাই যদি দুর্বল হিসেবে নিজেদের মনে করি তাহলে পরিবর্তনের জন্য যে সম্মিলন দরকার তা আমরা পাব কোথায়?
স্বামী বিবেকানন্দ একদা বলেছিলেন, “জনসাধারণকে যদি আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানো না যায়, তবে জগতের সমগ্র ঐশ্বর্য ভারতের একটি ক্ষুদ্র গ্রামের পক্ষেও পর্যাপ্ত সাহায্য হবে না।” বিবেকানন্দ আত্মনির্ভরশীল হতে বলছেন অথচ দেখুন, আমরা টেকসই উন্নয়নের কথা বলছি কিন্তু উন্নয়নের নামে সকল কিছু করে দেয়ার ভার সরকারের হাতে দিয়ে দিয়েছি, নিজেরা নিজেদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছি না। এটা তো সত্যি যে স্বার্থান্বেষী মানুষের পদচারণা আজ দিকে দিকে। সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে সীমাহীন লোভ ও স্বার্থ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। মানুষ খাটো হয়ে যাচ্ছে লোভের কাছে। আমরা কেবল ভোট দেয়ার নাগরিক হয়ে লাভ কী? আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে যদি আমাদের অংশগ্রহণই না থাকে, ভোটদানের সময়টুকু ছাড়া যদি আমাদের আর কোন মূল্য না থাকে তাহলে সমাজকে আমরা কিভাবে এগিয়ে নেব?
টেকসই উন্নয়ন চাইলে জনগণের মধ্যে প্রণোদনা জাগিয়ে তুলতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে উৎসাহ যোগাতে হবে। নিজের শক্তিটুকুর উপর আস্থা রেখে চলতে শেখাতে হবে। নিজেদের দ্বারা নিজেদের উন্নতি সাধনের মন্ত্র আমাদের সকলেরই শিখতে হবে। বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যতক্ষণ শিক্ষিত হয়ে নিজেদের অভাব দূরীকরণের দায়িত্ব না নেবে, যতক্ষণ না তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে এগিয়ে আসবে, ততদিন আমাদের পক্ষে টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব হবে না। কেউ এসে আমাদের উন্নয়ন করে দেবে সেই আশায় না থেকে বরং আমরা নিজেরা নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামর্থ্যগুলোকে সম্মিলিত করে কিভাবে এগিয়ে যাব সেই উপলব্ধিকে জাগ্রত করে পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ তরুণ প্রজন্মের বিকাশের মাধ্যমে, জনতার জাগ্রত উপলব্ধির মাধ্যমেই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি সম্ভব। নৈরাজ্যের বাতাবরণে দেশের গতি শ্লথ হয়ে যাবে এটা মেনে নেয়া যায় না। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য জাতীয় জীবনে আত্মশক্তি ও প্রেরণার জাগরণ প্রয়োজন।
আমাদের সকল অনুষ্ঠান, আয়োজনে আমরা সেই চেতনার জাগরণ চাই। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সমাগত। সকল শহীদ ভাইদের প্রতি সালাম ও শ্রদ্ধা জানাই। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকতার আবরণের বাইরে এসে আমরা যেন নিজেদের আত্মশক্তির জাগরণ ঘটাতে পারি সেই প্রত্যয় গ্রহণের জন্য সকলের প্রতি, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানাই। মাতৃভাষার অধিকার সকল মানুষেরই জন্মগত অধিকার। আমার ভাইদের আত্মদানে আজ বিশ্বের সকল মানুষের সেই মানবাধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে। ত্যাগ আমরা করেছি বটে কিন্তু অর্জনের ফল ছড়িয়েছে বিশ্বময়। আমাদের সত্যিকারের গৌরব সেখানেই। সেখানেই আমরা শ্রেষ্ঠ, আমাদের আত্মদানের স্বার্থকতাও সেখানেই!
মায়ের ভাষার সূত্র ধরেই জাতীয়তা প্রকাশ পায়। ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায় সংস্কৃতি। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে পরম যতেœ লালিত সে ভাষার সম্মানরক্ষা তাই নিজের সংস্কৃতি, স্বকীয়তা ও জাতীয়তা বিকাশেরই সমার্থক। কিন্তু এর সাথে সাথে আমাদের আরও আলোচনা করতে হবে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্যকে কেবল ভাষার জন্য সংগ্রামের বৃত্তের বাইরেও এটা যে মুক্তির সংগ্রামের ভিত্তিভূমি ছিল এবং আগামীতেও এটা যে আমাদের জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন হয়ে উঠতে পারে সেই আলোচনা করতে হবে।
সমাজটা কলুষিত হয়ে পড়েছে, দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে শুধু এটুকু বলাই আজকের দিনে যথেষ্ট নয়। বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে সমাজকে বাঁচাতে হবে। আমাদের জাতীয় জীবন ও কল্যাণের মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজেদের মতভিন্নতা ও বিরোধের দূরত্ব কমাতে হবে। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে অবশ্যই। বিভেদের রাজনীতি ভুলে সবাইকে সম্প্রীতির বন্ধনে এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে দায়িত্বশীলদেরই। বিরোধিপক্ষ অভিমানে মুখ ফিরিয়ে থাকতেই পারে কিন্তু তাই বলে দায়িত্বশীলরাও ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকবেন এটা জনগণের চাওয়া নয়। রাজনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিতে হবে যেখানে মনুষ্যত্ব ও মানবতা থাকবে সবার উপরে। সেখানে বাঙালিও বড় নয়, বাংলাদেশিও নয়! সকলেই মোরা সকলের তরে!
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯