দুর্যোগের পর ক্ষতি কমাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ

দুর্যোগের পর ক্ষতি কমাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ

দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পাশ্ববর্তী দেশসমূহের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (ইওসি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর হোটের ইন্টারকন্টিনেন্টালে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয়ের মাধ্যমে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিজিওনাল কন্সালটেটিভ গ্রুপের ৪র্থ সভার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

ইওসি প্রতিষ্ঠা বিষয়ে এর আগে বুধবার (২৩ জানুয়ারি) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব সচিব শাহ কামালও সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তেজগাঁওয়ে জমি পেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে আমরা ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (ইওসি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। ফলে নিরবছিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর মানবিক সহায়তা পরিচালনা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আমরা দুর্যোগ প্রতিরোধ করতে পারব না। তবে আমাদের দূরদর্শী কাজের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করতে পারি। বাংলাদেশে আমরা ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে প্রশমন কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করেছি।

দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কার্যকরভাবে মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ প্রণয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি আমরা বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন করেছি। এ পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১০০ বছরের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলাসহ দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে টানা তিনবার মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত কয়েক বছরে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২৩৬ কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয়পূর্বক আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন ও অন্যান্য সংস্থাকে হস্তান্তর করেছে।

তিনি বলেন, এর পাশাপাশি আমরা যানবাহন দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন বা সেতু ধস, সন্ত্রাসী আক্রমণের মতো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগকেও উপেক্ষা করতে পারি না। এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের সফলতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আমাদের বিনিয়োগ, দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদানের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং দুর্যোগের প্রস্তুতি ও উদ্ধার কার্যক্রমে সিপিপি স্বেচ্ছাসেবীদের নিবেদিত প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের ফলে সাম্প্রতিককালে যেকোন দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল হিসেবে পরিচিত এবং বাংলাদেশ দুর্যোগ স্থিতিস্থাপকতা অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বাংলাদেশ সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়, বিশেষ করে জরুরি প্রস্তুতি এবং সাড়াদানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সমাজের সকলকে নিয়ে কাজ করার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে মানবিক সহায়তার কাজে আমরা সব সময় স্বেচ্ছাসেবক এবং সুশীল সমাজের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে থাকি।

বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ আনসার ভিডিপি সদস্য, ১৭ লাখ স্কাউট, ৪ লাখ বিএনসিসি এবং গালর্স গাইডের ৪ লাখ সদস্য, ৩২ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক এবং ৫৬ হাজার সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের এই ধরিত্রীমাতা অধিকমাত্রায় দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। জার্মানওয়াচ কর্তৃক প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০১৭ অনুযায়ী ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। এরফলে প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এসব দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৪৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯ম। ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে পরপর দু’বার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬ষ্ঠ।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও ক্ষতির তালিকায় উপরের দিকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও ভৌগোলিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, টর্নেডো, বজ্রপাত, ভূমিধসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক।

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্যোগ ব্যবস্থাপণা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমানসহ দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিরা সভায় বক্তব্য রাখেন। বিভিন্ন দেশের দেড়শোর মতো প্রতিনিধি এ সভায় অংশ নেন।