দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ও সরকারের অঙ্গিকার

দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ও সরকারের অঙ্গিকার

মোহাম্মদ নজাবত আলী : এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচনার বিষয় দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। ক্যাসিনো, জুয়ার আসর বসিয়ে যারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব জব্দ করাও হয়েছে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি একসাথে চলতে পারে না। এ দু’টোই আমাদের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। দুর্নীতির কারণে বিগত বছরগুলোতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। জাতিগত দিক থেকে আমাদের মর্যাদা সম্মানকে কলঙ্কিত করেছে। তাই দুর্নীতি সমাজ উন্নয়নে সম্ভাবনাকে শুধু বাধাগ্রস্তই করে না, দুর্নীতি সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড়ধরনের অন্তরায়।
সরকারের এই দুর্নীতি বিরোধি অভিযান নির্বাচনী অঙ্গিকার ছিল। সে অঙ্গিকার পূরণে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাচ্ছেন। এই অভিযানকে সমাজের অধিকাংশ মানুষই সমর্থন করেন। কারণ অনেকেই আছেন যারা দলের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আবার কিছু নেতা আছেন যারা আগের মতই অর্থাৎ তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ সমস্ত নেতা যে কোন দলের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টিকে নজরে আনেন। শুধু ছাত্রলীগ, যুবলীগই নয় মুল দলের ভিতরেও আনেকেই এ অভিযানে ভীত সন্ত্রস্ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিষয়ে কাউকে ছাড় দিবে না। চতুর্থ বারের মতো সরকার পরিচালনায় দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ হাসিনা। এমনিতেই বর্তমান যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে সে মন্ত্রিসভায় বিগত সংসদের অনেক মন্ত্রী বিশেষ করে নানা কারণে বিতর্কিত এমন মন্ত্রীদের বাদ দেয়া হয়েছে। তবে আমরা আশা করবো জনগণের আস্থা অর্জনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজি এ নেতিবাচক কর্মকান্ড যে কোনো সরকারের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
তাই বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দেশের যেমন উন্নতি হয়েছে তেমনি বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আসায় দেশের উন্নতি- অগ্রগতি হয়েছে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা যোগাযোগ সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে সার্বিক দিক থেকে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের জন্য, দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য, পেছনে ফেলার জন্য নয়। দুর্নীতির জন্য নয়। কোনো রাষ্ট্রে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকে অর্থাৎ দলীয় নেতাকর্মিদের কোনো কর্মকান্ডের জবাবদিহিতা করতে না হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে সে রাষ্ট্রে দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষ যেমন শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করবে তেমনি সেক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দুর্নীতি অবশ্যই আমাদের উন্নতির প্রধান প্রতিবন্ধক। সঙ্গত কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছেন। শুধু ক্যাসিনোই নয় সরকারি অফিস-আদালত বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হচ্ছে কিনা তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। তবে প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে দুর্নীতির সাথে যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে দুর্নীতি দমন কঠিন হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, দুর্নীতির সাথে যারাই জড়িত হোক না কেন এমন কি নিজ দল বা আত্মীয় স্বজন জড়িত থাকলেও তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতি বিরোধি এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। অতিতে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সে সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই দুর্নীতির এ ব্যাপকতা বলে অনেকেই মনে করেন। আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে দুর্নীতি রোধ করে একটি সমৃদ্ধ ও আত্ম নির্ভরশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।  
আমাদের স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দেশে উন্নয়ন হয়েছে। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটা যেমন সত্য তেমনি দুর্নীতিও থেমে নেই। মাঝে মধ্যে টিআইবি রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টর ও প্রশাসনে দুর্নীতির সূচক তুলে ধরেন তা সম্পূর্ণ অসত্য বা অযৌক্তিক নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার দুর্নীতি, ন্যায় বিচার, সুশাসনের ঘাটতি এ বিষয়গুলো যেকোনো রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক। তবে আশার কথা এই যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। যার বড় প্রমাণ সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। এটাও আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে দেশের উন্নয়ন ও পদ্মাসেতুর মত বড় বড় প্রকল্পগুলো নিজ অর্থায়নে বস্তবায়ন হচ্ছে যা আমাদের রাষ্ট্রের গৌরব। বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিজ অর্থায়নে নির্মাণ করা প্রধানমন্ত্রী এ সাহসি উদ্যোগ বিশ্ববাসির প্রশংসা অর্জন করেছে। জনগণের টাকাই পদ্মা সেতুর মতো একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সে রাষ্টে দুর্নীতি কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। অস্বীকার করা যায়না যে, স্বপ্নের পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অনেক সুবিধা হবে, ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে।
তবে দেশে সমতা ভিত্তিক উন্নয়ন, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ভাগ্যের পরিবর্তন, দরিদ্রতা কমাতে, কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ সহ বিপুল জনগোষ্ঠির উন্নয়নের জন্য সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষা, পুলিশ প্রশাসন, চিকিৎসা সহ রাষ্ট্র যন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে যে দুর্নীতি রয়েছে তা সুশাসন দিয়ে রোধ করতে না পারলে দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষের শিকড় শাখা প্রশাখা আরো বিস্তার লাভ করবে। দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশ ও জনগণের উন্নয়নের জন্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই দুর্নীতি রোধে দলীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে থেকে দলমত নির্বিশেষে সমভাবে আইনের প্রয়োগ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। তাহলে আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। দুর্নীতি রোধকল্পে আমাদের যে, লক্ষ্য রয়েছে সে লক্ষ্যে নির্লোভভাবে পৌঁছতে না পারলে দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন হবেনা। তাই আইনের প্রয়োগ ও সুশাসন দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন একটি সুখী সমৃদ্ধশালী ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে দুর্নীতি যে কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক। এখানে উল্লেখ্য যে দুদক কোন দুর্নীতিবাজের বিচার করতে পারে না। তারা শুধু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা মারফত নানা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন, আর তা প্রমাণ ও বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও সুশাসনের অভাবে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ আছেন যারা রাজনীতিকে এক ধরনের ব্যবসা মনে করেন। লুটপাট ক্ষমতার অপব্যাপারে তারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হন। রাজনীতিতে সততা আদর্শের জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু রাজনীতিক আছেন নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের অধিকারী। জনস্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিচারের আওতায় আনা আবশ্যক। এমনকি বড় বড় প্রকল্পগুলোতে কোনো দুর্নীতি হচ্ছে কি-না সে বিষয়েও সরকারকে নজর দেওয়া দরকার। দুর্নীতি রোধের ব্যাপারে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান বা দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন একে অপরের পরিপূরক যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নাম কিছুটা পরিবর্তনের মধ্যে বর্তমানে তা দুর্নীতি দমন কমিশন যা সংক্ষেপে দুদক নামে পরিচিত। আমরা মনে করি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু তা অনেকটা ক্ষমতাসীনদের ওপর নির্ভর করে। তবে দুদক পরিপূর্ণ স্বাধীন ভাবে দুর্নীতিবাজ যারা আছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অবৈধভাবে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন তাদের সনাক্ত করছে। এতে করে দুর্নীতি অনেকটা দমনও সম্ভব। ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির কারণে দেশে আইনের শাসন সুশাসন প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব হচ্ছে না তেমনি জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটায় না ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড় অন্তরায়। এ বৃত্ত থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। নইলে দেশের কাংখিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। দুর্নীতির কারণে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পায়। সরকারের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হয়, তেমনি সরকারেরও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যায়। এমতাবস্থায় দেশের কাংখিত উন্নয়নে এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী অঙ্গিকার বাস্তবায়নে যে সাহসি পদক্ষেপ নিয়েছেন তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক।  এ অভিযান অব্যাহত থাক।
 লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১