দুর্গাপূজায় হোক অতিমানস চেতনার উন্মীলন

দুর্গাপূজায় হোক  অতিমানস চেতনার  উন্মীলন

জয়ন্ত কুমার : স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন- প্রত্যেক ধর্মেরই তিনটি দিক আছে- দর্শন, পুরাণ (কাহিনী) ও অনুষ্ঠান। দর্শন হলো তত্ত্ব বা আসল রহস্য। কাহিনীর মাধ্যমে তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করা হয়। আর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আরও স্থূল করে বোঝানো হয়। আমাদের প্রায় সকল পূজার জাগতিক, পারমার্থিক বা আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও লৌকিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এই ব্যাখ্যার বহুমাত্রিকতা ও সার্বজনীনতা এই ধর্মের উচ্চ কল্পনা শক্তি ও চেতনার ব্যাপকতা নির্দেশ করে। র্দ্গুাপূজার বিভিন্ন কাহিনী ও অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমরা জানি কিন্তু দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও সমৃদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে কিছু তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টামাত্র। যা আমাদের মানবিক অনুভবকে অতিমানস উপলব্ধির পর্যায়ে রূপান্তর করতে পারে।   
প্রতিটি মানবের মাঝে শুভশক্তি, দেবশক্তি তথা ঐশী শক্তি আছে তা চেতনা রূপে জাগ্রত করা আমাদের জীবনের পরম লক্ষ্য। দুর্গাপূজা সেই চেতনা জাগরণের প্রতীক। আমরা যে ভাব নিয়ে পূজায় রত হব সে রকম চেতনাই আমরা প্রাপ্ত হব। আমরা আসুরিক ও তামসিক আনন্দে পূজা না করে দিব্য চেতনা লাভের জন্য পূজা(পূর্ণ বা পুনর্জাগরণ) করব। দুর্গাপূজায় ব্যক্তি, সমাজ, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, সর্বক্ষেত্রে জনকল্যাণ তথা সমাজ কল্যাণ চিন্তা নিহিত। (মূলত এখানে জগত বলতে মনো জগতকে বুঝলে ভালো হয়।) মনোজগতের কুপ্রবৃত্তির অপসারণ, আত্ম শুদ্ধির মাধ্যমে ঈশ^র প্রাপ্তি ও সামাজিক উন্নতির লাভের শিক্ষা দুর্গা পূজার অন্যতম লক্ষ্য।
দুর্গা-অর্থাৎ আত্মা। আত্মজ্ঞান তথা-পরমাত্ম জ্ঞান লাভ করতে হলে অনেক দুঃখ কষ্টের মাধ্যমে তা লাভ করতে হয়। দুঃখের মধ্য দিয়েই দুর্গাকে বা আত্মাকে পাইতে হয়। মা দুর্গা-দশভুজা। মানব যখন সাধনায় আত্মজ্ঞান লাভ করেন তখন তিনি দশদিকেই জয়ী হন। ‘সাপ’ দেহস্থ কুন্ডলিনী শক্তির প্রতীক।
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের মত আমাদের সমাজ তথা-প্রত্যেক সমাজে চার শ্রেণির মানুষ দেখা যায়। শুদ্ধশক্তি বা বুদ্ধিজীবী হচ্ছে ব্রাহ্মণ(মস্তক), ক্ষাত্রশক্তি বা বীর্যজীবী হচ্ছে ক্ষত্রিয় (হস্ত), বৃত্তিজীবী বা ধনশক্তি হচ্ছে বৈশ্য(উদর) এবং শ্রমজীবী বা জনশক্তি হচ্ছে শুদ্র(চরণ)। এখানে মনে রাখা দরকার- চরণ স্পর্শ করেই আমরা আশীর্বাদ লাভ করে থাকি  এবং চরণই সমস্ত দেহের ভার বহন করে থাকে । এখানে জ্ঞান শক্তি হচ্ছেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ক্ষাত্রশক্তি হচ্ছেন দেব সেনাপতি কার্তিক। ধনসম্পদের দেবী শ্রীলক্ষ্মী। দেবী লক্ষ্মী হলেন ধনশক্তির প্রতীক এবং শ্রীগণেশ হলেন গণশক্তি প্রতীক। জ্ঞান, বীর্য, ধন ও জন এর মাধ্যমেই জাতি পরিপূর্ণ হয়। সুখ ও সমৃদ্ধির পথে নিয়তই এগিয়ে চলে। বস্তুত মা দুর্গা-প্রতিবারই আমাদের জাতীয় প্রতিমা। এই প্রকৃত সত্যটি উপলব্ধি করেই দুর্গাপূজায় আত্মনিয়োগ করা আমাদের একান্ত উচিত। মা দুর্গার বামে থাকে সরস্বতী। দেবী সরস্বতীর হাতে থাকে বীণা ও পুস্তক। বীণা, সুর ও ছন্দের প্রতীক। আর পুস্তক হলো জ্ঞানের প্রতীক। দেবীর বসন সাদা। সাদা, শুদ্ধ ও পবিত্রতার প্রতীক। জ্ঞানসাধককে অবশ্যই শুচি-শুভ্র হতে হবে। হংস সরস্বতীর বাহন। হাঁসের এক অপূর্ব শক্তি আছে যা দ্বারা সে জল মিশ্রিত দুধ থেকে দুধকে গ্রহণ আর জলকে ত্যাগ করতে পারে। জ্ঞান তাপসকে তদ্রুপ সত্য, নিত্য বিদ্যাকে গ্রহণ ও অবিদ্যা, অনিত্য, অসত্যকে ত্যাগ করতে হবে।
এই বিশ্বে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই। অতএব শক্তি চাই, চেতনার শক্তি। সেই শক্তির প্রতীক মা দুর্গা। এই কারণেই দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজা অনন্ত সম্মিলিত শক্তির প্রতীকি পূজা। দুর্গাপূজা আসলে বিশ্বমাতার পূজা। মায়ের মাধ্যমে অনন্ত শক্তির উপাসনা। আমাদের হৃৎ-কন্দরে(কাল্বে) সকল ধরনের অসীম শক্তি রয়েছে। তা কাজে লাগানোর চেতনায় কেন আমরা পূর্ণরূপে জাগরিত হচ্ছি না?
তুমি আমাদের চেতনায়  সদাজাগ্রত হও মা, বাণী প্রচার করে অশুভ, অসুর বা দানব শক্তিকে (বিশ্বব্রহ্মান্ডে ও দেহভান্ডে যা অবস্থিত) বশ করা যায় না। এজন্য দরকার তোমার সংগ্রামী, প্রতিরোধী, বিরাট শক্তির সম্মিলনী চেতনা। দৈহিক, প্রাণিক বা  আবেগিক ও  মানসিক শক্তি দ্বারা সত্যিকার অর্থে সে কাজ করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন মনাতীত দিব্যচেতনা বা অতিমানসিক চেতনা।  ও মা, আমাদের মাঝে  সেই সম্মিলিত অতিমানস চেতনাশক্তিরূপে আমাদের সূক্ষ্ম ও স্থূল উভয় জগতে জাগ্রত হও মা।  বাণী কুমারের ভাষায়-জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা,/জাগো দশপ্রহরণধারিণী,/অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।/প্রণমি বরদা অজরা অতুলা/বহুবলধারিণী রিপুদলবারিণী জাগো মা।/শরণময়ী চন্ডিকা শংকরী জাগো, জাগো মা,/জাগো অসুরবিনাশিনী তুমি জাগো।
লেখক : প্রভাষক ও গবেষক
[email protected]
০১৭১৭-১৪৩৩৮৯