দিনবদলের প্রাথমিক শিক্ষা ও বর্তমান হালচাল

দিনবদলের প্রাথমিক শিক্ষা ও বর্তমান হালচাল

শিবলী বেগম: শিশুর শারীরিক, মানসিক, মানবিক, সামজিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, নান্দনিক ও আবেগি কবি কাশসাধন এবং শিশুকে দেশাত্ববোধে, সৃজনশীলতায়, বিজ্ঞান-মনস্কতায়ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন র্দশনে উদ্বুদ্ধ করা”। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। এর মাধ্যমেই একটি শিশু পরিপূর্ণতা লাভ করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, কর্মব্যস্ততার যুগে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা পরিবারের কাছে কম সময় পাচ্ছে। সে কারণে সমাজে নানা অবক্ষয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। খুব অল্পবয়সেই অনেক শিশু বিপথগামি হচ্ছে। সামাজিক এই অবক্ষয় সমাজের সবার জন্য হুমকি স্বরুপ। আমরা জানি, আজকের কোমলমতি শিশুরাই আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তাদের হাতেই সূচীত হবে সোনার বাংলাদেশ। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। সে সকল কোমলমতি শিশুদের সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুদ্ধা চারচর্চা কৌশলের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। যা তাদের আদর্শ ও সু-শৃঙ্খল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি চর্চা ও সৃজনশীলতা এবং দেশাত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে নেয়া হয়েছে নানামূখী পদক্ষেপ। ইতোমধ্যে বিজয়ফুল উৎসব প্রতিযোগিতা, জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতা, পহেলা বৈশাখ উদযাপন, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের নানাকর্মসূচীর আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনে নেতৃত্বদানে পটু করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে (৩য় থেকে ৫ম) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিবছর স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠনে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। এ নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ পেয়ে থাকে। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে এরা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যা তাদের আদর্শ নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে যেমন সহায়তা করে তেমনি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে। তাছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (৩য় -৫ম) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাব-স্কাউট দল গঠিত হয়। কাব স্কাউট সদস্যরা বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একজন সৎ, সুঠাম, সুন্দর ও সু-শৃঙ্খল মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করে। ইতোমধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয়গুলোতে হলদে পাখির দল গঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে মেয়ে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী হিসেবে সমাজে বেড়ে উঠছে।  শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নের পথে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যেন অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, সে লক্ষ্যে প্রতিবছর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় কৃমিনাশক ট্যাবলেট এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর ওজন, উচ্চতা ও দৃষ্টিপরীক্ষা করা হয় প্রতিটি শিক্ষার্থীদের। এ কাজে শিশুরা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং আত্মবিশ্বাসী হতে পারে তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে ১৫ জন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ক্ষুদে ডাক্তারের দল। প্রতিটি শিশু হবে সৎ ও সুন্দর। তাদের চরিত্র বিকশিত হবে পবিত্র ফুলেরমত। নৈতিকতার দিক থেকে সে হবে আদর্শবান, সৎ ও নিষ্ঠাবান। এটি আমাদের সকলের কাম্য। কোন অন্যায়ের মাঝে সে যেন বড় না হয়। কোন অপরাধ যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে। কোন অন্ধকার যেন তার মনকে আচ্ছাদিত করতে না পারে। তার জন্য দরকার ছোটবেলা থেকে তার বেড়ে উঠার পরিবেশটিকে পবিত্র রাখা। শিশুর সম্পূর্ণ বিকাশ সাধন হয় তার শিক্ষা স্থলে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি বিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে, ‘‘সততা স্টোর’’ । এ যেন সৎ মানুষ গড়ার এক অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ। শিশুদের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে প্রতিমাসে শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে হোমভিজিট করা হয়। এছাড়া মোবাইল ভিজিট, উঠান বৈঠক, সভাসমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা হয়ে থাকে। এছাড়া বিদ্যালয় গুলোর ভৌত অবকাঠামোগুলোর সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে উ”” শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দকে। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের নানা সময়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বই উৎসরের মধ্য দিয়ে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যে নতুন বই তুলে দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে মিড ডে মিল কার্যক্রম।  শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, দারিদ্রপীড়িত এলাকায় বিস্কুট প্রোগ্রাম ইত্যাদি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শ্রেণিকক্ষে স্থাপন করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর আদলে প্রণয়ন করা হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক কারিকুলাম ও সু-সজ্জিত শ্রেণিকক্ষ। এভাবে সকল প্রকার প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর ও সুদূর প্রসারী হোক, এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।    
লেখক : প্রধান শিক্ষক,
ডাংগারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
সৈয়দপুর, নীলফামারী।