দায় এড়ানো যাবে না কোনো মতেই

দায় এড়ানো যাবে না কোনো মতেই

মাহমুদ হোসেন পিন্টু : পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে দগ্ধ অন্ততঃ ৬৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার এবং অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা যেন আমাদের বাকরুদ্ধ করেছে। সব মৃতদেহ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, হলে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। আগুনে পুড়ে যে ৪১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। বিষয়টি নিছক বেদনার নয়, যথেষ্ট ক্ষোভ সঞ্চারীও। আগুনের পোড়া লাশের মিছিল দেশের মানুষের হৃদয়কে ব্যথাতুর করেছে। একথা অনুমান করা কঠিন নয় যে সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত ব্যর্থতা দায়িত্বহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বরাবর এ ধরনের অগ্নিকান্ড ও আগুনে পুড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। এ মৃত্যু জবাবহীন এখানে মরার জন্য কোন কারণ লাগে না। বৃষ্টিতে মরে, বজ্রপাতে মরে, জলে ডুবে মরে, গাড়ি চাপায় মরে, ক্রসফায়ারে মরে, ভবন ধসে মরে, নকল ঔষধ খেয়ে মরে, উড়াল সেতু ভেঙ্গে মরে, পায়ের তলায় পিষে মরে, ত্রাণ নিতে মরে, জলোচ্ছ্বাসে মরে, গাছের ডাল ভেঙ্গে মরে, সড়ক পথে মরে, রেল পথে মরে। এ মরে যাওয়া কি এমনি এমনি মরার কোন শেষ নেই। শুধু মরে যাওয়া নিয়তি। কারো কোন দায় নেই। সরকারের নেই দায়িত্ববোধ। পাবলিক ধুকে ধুকে মরে।

যে কোন আবাসিক এলাকায় একটি নিয়মকানুন আছে, সড়ক ও ভবন নির্মাণের জন্যও রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইন। এখানে সেই আইন পদে পদে অগ্রাহ্য করা হলেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চকবাজারের যে পাঁচতলা ভবনটি থেকে আগুনের উৎপত্তি সেই ভবনের মালিক সেটি ভাড়া দিয়েছিলেন রাসায়নিক পদার্থ, স্প্রের কৌটা ও প্লাষ্টিকের গুদাম হিসাবে। শুধু এই ভবনের নয়, মহল্লার আর পাঁচটি বিশাল ভবন আগুনে পুড়ে গেছে। পুরান ঢাকার অনেকস্থানেই এ ধরনের বিপজ্জনক পদার্থের বহু গুদাম রয়েছে। একই ভবনে গুদাম ও মানুষের অবস্থান। এটা স্পষ্ট যে, এসব কেমিকেল কারখানা, গুদাম না থাকলে এতো ক্ষয়ক্ষতি দেখতে হতো না ও এতো মৃত্যু গলার উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে মুহূর্তে ভস্ম করতে পারতো না।

দূর্ঘটনা সময়ে-অসময়ে ঘটতেই পারে আমাদের উচিত সবকিছূক অতিরঞ্জিত না করে ফেলা। শোককে শোক হিসেবে গ্রহণ করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিতে হবে। কিছু কিছু ব্যাপার শিখতে হয়। এ দোষ আমাদের নিজেদেরও। আমাদের লোভ এবং পার্থিব চাওয়া পাওয়া মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহেরও পরিণতি। ৯ বছর আগের নিমতলার ঘটনার পর সরকার গঠিত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। যার মধ্যে ছিল পুরান ঢাকার ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে ফেলা। এরপর তৎকালিন  শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কমিটি গঠন পর্যন্তই শেষ। নিমতলীর ঘটনার পর গুদাম সরানো নিয়ে কিছুদিন লোক দেখানো তৎপরতা চললেও পববর্তী সময়ে সবকিছু হিমাগারে চলে যায় মন্ত্রী চলে গেছেন- গুদাম কারখানা ঠিকই রয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ইকবাল খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি অগ্নিকান্ড রোধে ১৭ দফা সুপারিশ করেছিলেন। পুরান ঢাকার প্রতিটি ভবন এখনো অরক্ষিত ও অনিরাপদ। এগুলো করা হয়েছে নির্মাণ আইন বা বিল্ডিং কোড না মেনে। কেবল এলাকার মিটফোর্ড সড়কটি ছাড়া সব সড়ক সরু, দুটো গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারেনা।

 এরই মধ্যে বিদ্যুতের লাইন, গ্যাসের লাইন, ওয়াসার লাইন। আর এসব ভবনের নীচতলা, দোতলা রাসায়নিক পদার্থের দোকান-গুদাম। তার উপর পাশেরই মানুষের বসবাস। এই অগ্নিকান্ডের একটি ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে মানুষের মোবাইল থেকে মোবাইলে। দোকানপাট পুড়ে কালো হয়ে গেছে। পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া মটর সাইকেল, রিক্সা, পিক-আপ, ভ্যান, প্রাইভেট কার, ইত্যাদির কঙ্কাল। বডি স্প্রে, আফটার সেভ লোশন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজ¯্র প্রসাধনীর টিউব। অসংখ্য প্লাষ্টিকের গুটি, দানা।

অপশক্তির লোভ-লালসার আঘাতে আমাদের সত্য ছোঁয়া সুন্দর জীবনের স্বপ্নের উদ্যোগগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কেন মানুষ মৃত্যুর মিছিলে। কেন আমার স্বপ্নের সবুজ মাতৃভূমির পবিত্র মাটি অসাধু অতিলোভী কিছু অশিক্ষিত অ-মানুষ কেমিকেলে দাহ্যপদার্থ নিয়ে মৃত্যুর হোলি উৎসব খেলছে। আমরা কি পচে গেছি? পচে গেছে কি আমাদের মনুষ্যত্ব? পচে গেছে কি আমাদের স্বত্ত্বা। ৬৭ টি আগুনবিদ্ধ প্রাণ জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিল এ নিষ্ঠুর পৃথিবী তাদের নয় তারা শুধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠির মুনাফার বলি।
দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কেউ পদত্যাগ করবে না জানি। তবে অন্ততঃ নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করুক।

 চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকান্ডে যে ৬৭ জন মানুষ অতি আকষ্মিকভাবে অকাল মৃত্যুর শিকার হলেন, তাঁদের স্বজনদের জন্য কোন সান্ত¡না, কোন ক্ষতি পুরণই যথেষ্ট হবে না। সন্তান হারানো মায়ের কান্না সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের মত সন্তানদের নেই। সরকার যদি এস আলম গ্রুপের ৩ হাজার কোটি টাকার কর মাফ করে দিতে পারেন, কেন শুধু পারে না কিছু ‘ফায়ার হাইড্রেট’ রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাগানোর ব্যবস্থা করতে। ১৮১০ সালে ফায়ার হাইড্রেট আবিষ্কার হয়। এটি একটা দেশের সিটির আনাচে কানাচে থাকার কথা, এখানে-সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে পানি সরবরাহ করার জন্য। ২১৮ বছর পরও এটি বাংলাদেশের কোথাও স্থাপন করা হয়নি। এই অগ্নিকান্ড বড় মর্মান্তিকভাবে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, নিমতলী অগ্নিকান্ড থেকে আমরা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করিনি।
লেখক: সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৮৭৫৬৮৮