দাওয়াত ও তাবলীগ নবীওয়ালা মেহনত

দাওয়াত ও তাবলীগ নবীওয়ালা মেহনত

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক : দ্বীনের দিকে ডাকা ও দ্বীনের কথা প্রচার করাকেই দাওয়াত ও তাবলীগ বলে। গোটা পৃথিবীর মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। বিশেষ এক উদ্দেশ্যে মানুষকে সৃষ্টি করে সকলের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর সেই উদ্দেশ্য ও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য নাজিল করেছেন আল কুরআন। প্রেরণ করেছেন সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) কে। তাঁর একান্ত দাওয়াতী মেহনত ও অবিরাম চেষ্টার ফলে একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বিশ^ মানবতার উৎকর্ষ সাধন, দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সুখ, শান্তি ও সফলতার একমাত্র পথ হচ্ছে ইসলাম। দ্বীনকে টিকিয়ে রাখতে আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সাঃ) কে যে তিনটি মৌলিক দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন তার অন্যতম হল দাওয়াত ও তাবলীগ। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানুষের কল্যাণের জন্যেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। (সূরাঃ আল ইমরান- আয়াত-১১০) নবীজি (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে সমবেত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, হে উপস্থিতগণ! যদি তোমরা আমার থেকে একটি কথাও জেনে থাক বা শিখে থাক তাহলে তা অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দাও। (ইবনে মাজাহ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে দাওয়াত দেয়া এই উম্মতের উপর ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে মঙ্গলের প্রতি দাওয়াত দেবে অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে, আর তারাই হলো সফলকাম”। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াত -১০৪) অন্য আয়াতে বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে? (সূরাঃ হা-মীম সেজদাহ, আয়াত-৩৩) এ থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের সেই কথাই সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট যাতে অপরকে সত্যের দাওয়াত দেয়া হয়।

এতে মুখে, কলমে অথবা অন্য কোনোভাবে সর্বপ্রকার দাওয়াতই শামিল রয়েছে। আল্লাহর পথে দাওয়াত দানকারীদের প্রতিপক্ষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে এমন উত্তম পন্থা অবলম্বন করা উচিত যাতে তার উপর চাপ সৃষ্টি না হয় এবং অধিকতর ক্রিয়াশীল হয় অর্থাৎ হিকমত ও উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দেয়া। দাওয়াতে সর্বপ্রথম হিকমতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবস্থা যাচাই করে তদানুযায়ী শব্দ চয়ন করতে হবে। এরপর এসব বাক্যে শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে পূর্ণ ন¤্রতার সাথে এমন যুক্তি-প্রমাণসহ দাওয়াত দিতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষ নিশ্চিতরূপে বিশ^াস করে যে, সে যা কিছু বলছে, আমারই উপকারার্থে এবং হিতাকাঙ্খী ও শুভাকাঙ্খীবশতঃ বলছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে, উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়। (সূরাঃ নাহল, আয়াত-১২৫) দাওয়াত দানকারীদের একটি বিশেষ গুণ এই থাকা চাই, দাওয়াত দিতে গিয়ে যদি কোন মন্দ বা অনাকাঙ্খী ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়, তবে মন্দের জবাবে মন্দ না করে ক্ষমা করা উচিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন, ভাল ও মন্দ সমান নয়। জবাবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট।

তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে”। (সূরাঃ হা-মীম সেজদাহ, আয়াত-৩৪) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এই আয়াতের নির্দেশ এই যে, যে ব্যক্তি তোমার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করে, তার মোকাবেলায় তুমি সবর কর, যে তোমার প্রতি মূর্খতা প্রকাশ করে, তুমি তার প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন কর এবং যে তোমাকে জ¦ালাতন করে, তুমি তাকে ক্ষমা কর। (মাআরিফুল কুরআন) দাওয়াত ও তাবলীগের গুরুত্ব যেমন বেশি, ফজীলত ও ফায়দাও তেমন বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, কেউ হেদায়েতের দিকে দাওয়াত দিলে তার দাওয়াতে যত মানুষের হেদায়েত হবে, ওই সমস্ত মানুষের ঈমান আমলের সমপরিমাণ সওয়াব দাওয়াত দানকারীরও হবে। অথচ এতে অন্যদের ঈমান আমলের সওয়াব বিন্দুমাত্র কমবে না। (ইবনে মাজাহ) আর নবীওয়ালা এ কাজ না করলে রাসূল (সাঃ) বলেন, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! হয় তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবে অর্থাৎ দাওয়াতের কাজ করবে, না হয় তোমাদের উপর আল্লাহ তাঁর নিজের পক্ষ থেকে আজাব প্রেরণ করবেন। তখন তোমরা আল্লাহর কাছে দুআ করলে তিনি তা কবুল করবেন না। (তিরমিজি)।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০