তৈরি পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হবে

তৈরি পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হবে

রায়হান আহমেদ তপাদার :তৈরি পোশাক খাত আমাদের দেশে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। এই খাতটি শুধু দেশের অর্থনীতির গতি প্রবাহ সচল রাখতেই ভূমিকা রাখেনি, বেকার সংখ্যা কমিয়ে আনতেও বিশেষ অবদান রেখেছে। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতে অনেক তৈরি পোশাক কারখানা মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার কিছু চলছে ধুঁকে ধুঁকে। অথচ অপার সম্ভাবনা নিয়েই এই খাতটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। যারা দায়িত্বে ছিলেন এই খাতটির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার তাদের সঠিক তদারকির অভাব থাকায় পদে পদে প্রতিকূলতার কবলে পড়তে হয়েছে এই শিল্পটিকে। দিন দিন তা আরো প্রকট হয়ে উঠছে। ৫ জানুয়ারি সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে দেড় সহস্রাধিক তৈরি পোশাক কারখানা উৎপাদনে না থাকায় সামগ্রিকভাবে পোশাক খাতে রফতানি আয়ের গতি কমে আসছে-এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অপার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই খাতটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ মাথায় রেখে অনেকে তাৎক্ষণিক এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও আবশ্যিক অনেক শর্তই তারা তখনো মানেননি। যেমন অধিকাংশ শ্রমিকের সার্বিক নিরাপত্তা, ভবনের ওজন বইবার সক্ষমতা কতখানি কিংবা বিপদকালীন সময়ে শ্রমিকদের নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়গুলো উপেক্ষিতই হয়েছে। যে কারণে রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে এবং এরই জের ধরে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে ক্রেতা মহলের কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব এসেছে। তাদের সাফ কথা ছিল, সংস্কার কাজ সম্পন্ন না করলে তারা নতুন করে পণ্য ক্রয়াদেশ দেবে না। অনেক কারখানা মালিক সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে কাজ না থাকায় সেগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিক।

অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সিঅ্যান্ডএফ পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরেও অনেকে হাল ছেড়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো কারখানা উৎপাদনে না থাকায় মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষই বিপদে পড়েছে। একটা ব্যবসা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া মানে অর্থনৈতিক ভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানায় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা প্রাপ্তি গভীর অনিশ্চয়তার কবলে পড়ে যায়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর নিয়মিত উৎপাদনে না থাকাসহ অন্যান্য কারণে ৫৫০ কারখানার সদস্যপদ বাতিল করেছে বিজিএমইএ। আয়-ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ৩০০ কারখানা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে মালিক পক্ষ। নিয়মিত উৎপাদনে না থাকার কারণে ১৮০ কারখানার সদস্যপদ বাতিল করেছে বিকেএমইএ। বিকেএমইএভুক্ত ২০০ কারখানা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এ পর্যন্ত ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ২৩২ কারখানা। এসব কারখানার সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন ক্রেতারা। এ কারখানাগুলো দুই জোটের কোনো ক্রেতার রফতানি আদেশ পাচ্ছে না। কার্যত এসব কারখানা এখন বন্ধ-প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই তুলে ধরা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বেকার সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা এবং নারী সমাজের একাংশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত গড়ে দিতে এই শিল্পের অবদান অনন্য। দায়িত্বশীল মহল এখনো যথাযথ ব্যবস্থা নিলে বিদ্যমান অনেক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।

 আমরা আশা করি, এ ব্যাপারে সরকার অচিরেই যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। রফতানি আয়ের বড় খাত এখন পোশাক শিল্প। রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে, যার ৭০ শতাংশই নারী এবং যাদের কর্মদক্ষতা, নৈপুণ্য আর আন্তরিকতায় খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে পোশাক শিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তের নিভৃত পল্লীর কর্মহীন বেকার নারীদের রুটি-রুজির দ্বার উন্মোচিত করেছে সম্ভাবনা এ খাত। মূলত যাদের শ্রমের মূল্যের বিনিময়ে গ্রামীণ অর্থনীতি এখন অনেকটাই চাঙ্গা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এমনভাবে ঘটবে, যা কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করবে। তবে এ শিল্পে বর্তমান সময়ে নানাভাবে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, যা দেখে ভয় হয় এ শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে না তো? প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্ভাবনাময় এ খাত কি টিকে থাকতে পারবে? এমনই নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে পোশাক খাতটি। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দিন দিন খাতটির প্রবৃদ্ধি বাড়ার বদলে শুধুই কমছে। সূত্র মতে, গেল ১০ মাসে নতুন বাজারে রফতানি প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ২১ শতাংশ। অথচ কয়েক বছর আগেও প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশ। এ হিসাবে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি কমার হার এ শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।

 অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি ও গ্রামীণ গতিশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হলো পোশাক শিল্প। এ শিল্পের সমৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে মধ্যম আয়ের দেশ বিনির্মাণের পথে আমরা কতটুকু সফল হতে পারব এমন এক সময় ছিল, যখন প্রতিবেশী দেশ ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তানে তেমন কোনো পোশাক কারখানা ছিল না। আজ কিন্তু সে দিন অতীত হয়েছে। এসব দেশের পোশাক শিল্প তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিবেশী এখন অনেক দেশ। সেসব দেশের সরকারের দেয়া নানামুখী সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ক্রেতা দেশের তরফে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। যেমন প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকার পোশাক শিল্পের ওপর অর্পিত ‘এক্সাইজ ডিউটি’ প্রত্যাহার করে নেয়ায় পোশাক শিল্পের মালিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার আরেক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা দেয়ায় দেশটির পোশাক রফতানির হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অথচ খোঁড়া অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে। যদিও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিনা শুল্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কখনও ঢুকতে পারেনি, উল্টো ১৫-১৬ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি করতে হয়েছে। অর্থাৎ কোনো কালেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়নি। তবে ইইউভুক্ত দেশগুলোয় বিনাশুল্কে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হচ্ছে। ইইউভুক্ত দেশগুলোয় বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের প্রায় ৬০ শতাংশই রফতানি হয়ে আসছে। বলতে গেলে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইইউভুক্ত দেশগুলো। অতিসম্প্রতি ইইউ বিমানের কার্গো ফ্লাইট ও নৌপথের কার্গোয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যে নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ থেকে বিমান ও নৌ পথে কোনো কার্গো সরাসরি ইইউভুক্ত দেশগুলোয় প্রবেশ করতে পারবে না।
 
মূলত নিরাপত্তাজনিত কারণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সিভিল অ্যাভিয়েশনকে বিমানের কার্গো কমপ্লেক্সে দুইটি উচ্চমাত্রার স্ক্যানিং মেশিন বসানোর শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু সিভিল অ্যাভিয়েশনের একটি চক্র তাদের পছন্দের কোম্পানি কাজ না পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে টালবাহানা করছে। যেহেতু ইইউভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার, তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে যতদ্রুত সম্ভব তাদের সুপারিশকে বাস্তবায়ন করা জরুরি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়াতে হবে। তা না হলে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি সৃষ্ট জটিলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ওপর বাংলাদেশের পোশাক খাতে দেশি-বিদেশির নানা ষড়যন্ত্র তো আছেই! অতিসম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা খুবই উদ্বেগের। প্রতিবেদনটিতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে দুইটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পৃষ্ঠ পোষকতায় বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সন্দেহজনক কর্মকা  চালাচ্ছে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করতে বিদেশিদের অপচেষ্টা রোধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করেছে। শুধু তা-ই নয়, শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টাকারী হিসেবে তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নামও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। আমরা মনে করি, সংস্থাটির দেয়া তথ্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারের নেয়া উচিত।

বিশেষ করে ক্রেতা দেশগুলোর তরফে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের দেয়া নানা শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। আগে যেখানে পোশাক রফতানিতে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতো, এখন সেখানে অর্জিত হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। এ লক্ষণ কোনোভাবেই পোশাক খাতের জন্য শুভ নয়। অথচ কোনো কারণে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এ খাত সংকটের মুখে পড়লে কাজ হারাতে হবে লাখ লাখ শ্রমিককে। এমনকি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও কঠিন হবে। আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। এমনিতেই এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সংকটময় পরিস্থিতির কারণে রেমিট্যান্স-প্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এর ওপর যদি রফতানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্পের বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি হয়, তাহলে চরম মাশুল গুনতে হবে। উপসংহারে এটুকুই বলতে চাই, দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাতকে যে কোনো মূল্যে আমাদের বাঁচাতে হবে। এজন্য এ খাতকে চাঙ্গা করতে রফতানির ওপর নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি করের জাল থেকে এ শিল্পকে রেহাই দিতে হবে। কারণ প্রতিবেশী প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে এক্সাইজ ডিউটি প্রত্যাহার করে পোশাক শিল্পবান্ধব নীতিমালার বাস্তবায়ন করছে, সেখানে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে পোশাক খাতের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না।
                                   লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]