খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কঠোর আন্দোলনের প্রস্তাব

তৃণমূলের সাথে বিএনপির বৈঠক

তৃণমূলের সাথে বিএনপির বৈঠক

রাজকুমার নন্দী : বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পক্ষে জোরালো মতামত তুলে ধরেছেন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। তারা মনে করেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চলমান নরম কর্মসূচিতে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। সেজন্য আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজপথের কঠোর আন্দোলন প্রয়োজন। এই বিষয়ে ঈদুল আজহার পর দলের হাইকমান্ডকে শর্টটার্মে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। এছাড়া ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন সফলে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ-বিকল্পধারাসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে কাছে টানার উদ্যোগ গ্রহণেরও প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

 

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকে তৃণমূলের নেতারা এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে পরামর্শক্রমে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বিলম্বিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচন এবং আন্দোলন নিয়ে দলের কর্মকৌশল নির্ধারণে তারেক রহমানের পরামর্শে ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার সুপার ফাইভ নেতাদের নিয়ে দুইদিনের এই বৈঠক আহ্বান করে বিএনপির হাইকমান্ড। দশটি সাংগঠনিক বিভাগের মধ্যে প্রথমদিন শুক্রবার দুই সেশনে চারটি বিভাগের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। প্রথম সেশনে সকাল ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ এবং দ্বিতীয় সেশনে বিকেল সোয়া ৩টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত খুলনা ও বরিশাল বিভাগের নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনে ১৯টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ৪৫জন এবং দ্বিতীয় সেশনেও ১৯টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ৪৫জনের মতো নেতা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তবে বৈঠক সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি।

 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দুই সেশনের বৈঠকের শুরু এবং সমাপ্তিতে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূচনা বক্তব্যে তৃণমূলে সংগঠনের অবস্থা, আন্দোলন-সংগ্রামে নিহত-গুম ও কারান্তরীণ নেতাকর্মীদের সংখ্যা এবং তাদের মামলা সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের আন্দোলন নিয়ে তৃণমূলের নেতাদের পরামর্শ চান তিনি। এরপর বৈঠকে জেলা ও মহানগর নেতারা আগামী নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। তারা বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে কোনোভাবেই শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না। আগে দেশনেত্রীকে মুক্ত করতে হবে। কারণ, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচন একসূত্রে গাঁথা। মুক্তি পাওয়ার পর নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারে দেশনেত্রীই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে যদি কোনো কারণে দেশনেত্রীকে বাদ দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেটি হবে চরম আত্মঘাতী। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

 

তৃণমূলের নেতারা আরো বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে-সরকার দেশনেত্রীকে বাদ দিয়ে আবারো একতরফা নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে। সেজন্য মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে তার মুক্তিও অনিশ্চিত। তাই খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আমাদের কঠোর আন্দোলনে যেতে হবে। চলমান নরম কর্মসূচিতে দেশনেত্রীর মুক্তি সম্ভব নয়। এ সময় নেতাদের কেউ কেউ ঈদুল আজহার পরে ২০/২৫ দিনের শার্টটার্ম আন্দোলনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, চলমান নরম কর্মসূচিকে ধীরে ধীরে কঠোর আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে। কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। লাগাতার হরতাল, অবরোধের মধ্য দিয়ে তা শেষ করতে হবে। তৃণমূল আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত জানিয়ে তারা আরো বলেন, কেন্দ্র থেকে আন্দোলনের যে কর্মসূচি দেয়া হবে তা সফল করতে তৃণমূল প্রস্তুত। কিন্তু রাজধানীতে আন্দোলন সফল হতে হবে। এজন্য ঢাকা মহানগরকে প্রস্তুত করতে হবে। আন্দোলন সফলে এবার কেন্দ্রীয় নেতাদেরও রাজপথে নামা দরকার।

 

বৈঠকে ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন বিএনপির তৃণমূলের নেতারা। তারা বলেন, জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সিলেট সিটিতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও গাজীপুর সিটিতে জোটগতভাবে নির্বাচন হলেও সেগুলোতেও তারা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে সেভাবে মাঠে নামেনি। এছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্য নির্বাচনগুলোতেও বিএনপির প্রার্থী তাদেরকে সেভাবে পাশে পায়নি। তাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফলে জামায়াতের সাথে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বিকল্পধারা, জেএসডি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ইতিবাচক ইমেজসম্পন্ন সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে আমাদের কাছে টানার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

 

তৃণমূলের নেতারা সরকারবিরোধী বিগত দুটি আন্দোলনে দলের নিহত-গুম ও কারান্তরীণ নেতা-কর্মী এবং তাদের মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এ সময় তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আংশিক কমিটিগুলো এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ করে কেন্দ্রে জমা দেয়ার নির্দেশনা দেন বিএনপি মহাসচিব। এছাড়া জেলা ও মহানগরে মূল সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো যারা জমা দেননি তাদেরকেও দ্রুততম সময়ে তা কেন্দ্রে জমা নেয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।

 

সমাপনী বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচন এবং আন্দোলন বিষয়ে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত-প্রস্তাবনা আমরা শুনলাম। এগুলো নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনার পর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আশা করি, কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত নেবে তৃণমূল সেটা পালন করবে।

 

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপির তৃণমূল নেতাদের সাথে কেন্দ্রের বৈঠকে আগামী নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তৃণমূলের নেতারা এই বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।

 

মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে বৈঠকে কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তৃণমূল নেতাদের মধ্যে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বগুড়া জেলা সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন, সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক এম আর ইসলাম স্বাধীন, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলম, লালমনিরহাট জেলা সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলু, নাটোর জেলা সভাপতি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, গাইবান্ধা জেলা সভাপতি অধ্যাপক ডা. মঈনুল হাসান সাদিক, নওগাঁ জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু, যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

 

আজ শনিবার একইস্থানে দুই সেশনে বাকি ছয়টি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের বৈঠক হবে। প্রথম সেশনে সকাল ৯টা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বিভাগ এবং দ্বিতীয় সেশনে বিকেল ৩টা থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগের নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।