তিনি নিজ কর্মগুণেই বেঁচে থাকবেন

তিনি নিজ কর্মগুণেই বেঁচে থাকবেন

মাশরাফী হিরো : আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। হৃদয়গ্রাহী এই কথাটি বলেছিলেন সদ্যপ্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরকম অসংখ্য বিখ্যাত উক্তির প্রবক্তা তিনি। যার বক্তব্য শোনার জন্য শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মি নয় বরং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধ শক্তিগুলির লোকজনও তাকিয়ে থাকত। সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য মানেই আলাদা ধরনের ব্যঞ্জনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মাতৃভূমি রক্ষার জন্য। তার পূর্বে তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। বাবা আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সৈয়দ আশরাফও ঢাকায় চলে আসেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঘনিয়ে আসে সেই কালোরাত্রির অন্ধকার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর পারিবারিক চাপেই পাড়ি জমান লন্ডনে। তার পর ৩রা নভেম্বর পিতার মৃত্যু সংবাদও তাকে শুনতে হয়। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার কারণে চাপটাও বেশি। লন্ডন শহরে তার থাকার সমস্যার পাশাপাশি দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতেও কষ্ট করতে হয়েছে। তখন কিছুটা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। আস্তে আস্তে আবারও দাঁড়িয়েছেন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দাঁড় করিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ, পিতাসহ জাতীয় নেতাদের হত্যার প্রতিবাদসহ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে লন্ডনে বসেই ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ৯৬ সালে দেশে ফিরে কিশোরগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পান বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের। দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন বলেই ২০০১ সালে চরম দুঃসময়েও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে অদ্যাবধি মানুষ তাকে সম্মানিত করেই চলেছে। জনপ্রিয়তার পিছনে তিনি কখনও ছোটেননি।

 বরং জনপ্রিয়তায় তার কাছে ধরা দিয়েছে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ওয়ান ইলেভেনের সময়। যখন আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতারা জননেত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনায় মুখর, আবার অনেকে জেলখানায়। ঠিক সেই মুহূর্তে দলের হাল ধরেছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার সেই ভূমিকা আজও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের কাছে পাথেয় হয়ে আছে। যিনি কখনও পদ চাননি কিন্তু পদ তার কাছে ধরা দিয়েছে। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি সরকারে এবং দলে কম সময় দেন। তিনি বলেছিলেন, আমার মন্ত্রণালয়ে কাজ বাস্তবায়নের হার ৯৮ ভাগ। যা অন্যান্য যে কোন মন্ত্রণালয়ের চেয়ে বেশি। তাছাড়া দলের সাধারণ সম্পাদকের কাজ শুধুমাত্র কাজ করা না বরং কাজ করিয়ে নেওয়াও সাধারণ সম্পাদকের কাজ। তিনি দলে নেতৃত্ব বিকশিত করার সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রতিদিন নিজে কথা না বলে দলের যুগ্ম-সম্পাদকদের কথা বলার সুযোগ করে দিতেন। তাছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিতেন।

 যার ফলে তার ব্যক্তিগত প্রচার এবং নেতৃত্ব তৃণমূল পর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে না পৌঁছলেও  পরোক্ষভাবে তা পৌঁছে গিয়েছিল সর্বত্র। শ্রদ্ধা এবং সম্মানের ভিত্তি এতটাই মজবুত হয়েছিল যে, তিনি কর্মীদের পাশাপাশি নেতাদেরও নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার। অথচ তিনি তা অজান্তেই করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেশের ক্রান্তিকালে তিনি সবসময় ভূমিকা রেখেছিলেন। হেফাজতে ইসলামের ৫ মে শাপলা চত্বর দখলে সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্য রীতিমত সবাইকে চমকে দিয়েছিল। তাছাড়া আমেরিকার রাষ্ট্রদুত ডন মজিনাকে নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের অনেকটাই চাঙ্গা করেছিল। ড. ইউনুসের শান্তি পুরস্কারের সমালোচনাও অনেকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিল। এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্তিক ঘটনার নিয়ামক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সৎ এবং নিষ্ঠাবান এই আদর্শিক রাজনীতিবিদের শারীরিক মৃত্যু তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। তার প্রমাণ তার জানাজা। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকে একবার দেখার জন্য ছুটে গেছে সংসদ ভবন প্লাজায়, প্রিয় জন্মভূমি কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় এবং ময়মনসিংহ আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বেঁচে থাকবেন হাজারও মানুষের মাঝে, আওয়ামী লীগের সমস্ত নেতাকর্মিদের হৃদয়ে। সর্বশেষ একটি উক্তি উদ্ধৃত করতে চাই, জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন তিনি নিজ কর্মগুণেই বেঁচে থাকবেন। অর্থাৎ পিতার পরিচয়ে তাকে পরিচিত হতে হবে না। যিনি বলেছিলেন আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। সবশেষে তিনি নিজেই বাংলাদেশের মানুষ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের কাছে একটি অনুভূতি হয়ে ধরা দিলেন।
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫