তাসাওউফের পর্যালোচনা

তাসাওউফের পর্যালোচনা

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক : নামায রোজা প্রভৃতি শরীয়তের যাহেরী বিধানের উপর আমল করা যেমন জরুরি, তদ্রƒপ এখলাস, তাকওয়া, শোকর প্রভৃতি কলবের গুণাবলী অর্জন এবং অহংকার, হিংসা প্রভৃতি অন্তরের ব্যাধি দূর করা তথা শরীয়তের বাতেনী বিধানাবলীর উপর আমল করাও জরুরি। এই বাতেনী বিধানাবলীর উপর আমল করাকে বলা হয় তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে (তাযকিয়া) পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। (সূরা: জুমুআহ, আয়াত:২) আয়াতে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত বর্ণনা প্রসঙ্গে নবী প্রেরণের তিনটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে। (এক) কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত (দুই) উম্মতকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করা। (তিন) কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়া। রাসূল (সাঃ) কে প্রেরণের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে পবিত্রকরণ। এর অর্থ বাহ্যিক ও আত্মিক নাপাকি থেকে পবিত্র করা। বাহ্যিক নাপাকি সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানরাও জানে। আর আত্মিক নাপাকি হচ্ছে কুফর, শিরক, কৃপণতা, শত্রুতা, দুনিয়া প্রীতি ইত্যাদি। পবিত্রকরণকে রাসূল (সাঃ) এর পৃথক কর্তব্য সাব্যস্ত করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কোন শাস্ত্র পুুঁথিগতভাবে শিক্ষা করলেই তার প্রয়োগ ও পূর্ণতা অর্জিত হয় না। প্রয়োগ ও পূর্ণতা অর্জন করতে হলে গুরুজনের শিক্ষাধীনে থেকে তার অনুশীলনের অভ্যাসও গড়ে তুলতে হয়। সুফিবাদে কামেল পীরের দায়িত্বও তাই। শিক্ষা যতই বিশুদ্ধ হোক না কেন, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুরুব্বীর অধীনে প্রশিক্ষণ লাভ না করা পর্যন্ত শুধু শিক্ষা দ্বারাই চরিত্র সংশোধিত হয় না। থানবী (রাহঃ) বলেন, যেহেতু দ্বীনের জাহেরী আমলগুলো সহজ, তাই জাহেরী আমলগুলো পালন করা হয়। পক্ষান্তরে বাতেনী আমলগুলো পালন করা এবং চরিত্র সংশোধন করা খুবই কষ্টকর। কারণ, চরিত্র গঠনের জন্য নফসকে দমন করে কুপ্রবৃত্তিসমূহের মোড় পরিবর্তন করতে হয়। এজন্য লোকেরা আত্মগঠন ও আত্মসংশোধনের পথে পা বাড়াতে ভয় পায়। এই পথে চলতে হলে অন্য সব সম্পর্কের উপর আল্লাহর সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে যিন্দেগী কাটাতে হয়। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির আদিকাল থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত মানুষের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য দু’টি ধারা অব্যাহত রেখেছেন। একটি আল্লাহর কিতাবসমূহের ধারা, অপরটি রাসূলগণের ধারা। আল্লাহপাক শুধু কিতাব নাযিল করাই যেমন যথেষ্ট মনে করেননি, তেমনি শুধু রাসূল প্রেরণ করেও ক্ষান্ত হননি। বরং সর্বদা উভয় ধারা জারি রেখেছেন। উভয় ধারা সমভাবে প্রবর্তন করে আল্লাহ তায়ালা একটি বিরাট শিক্ষা দিয়েছেন। তা এই যে, মানুষের নির্ভুল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্যে শুধু কিতাব কিংবা শুধু শিক্ষাই যথেষ্ট নয়, বরং একদিকে যেমন আল্লাহর কিতাব প্রয়োজন তেমনি অপরদিকে একজন শিক্ষাগুরুরও প্রয়োজন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক”। (সূরা: তাওবা, আয়াত: ১১৯) সমগ্র কুরআনের সারমর্ম হল সূরা ফাতিহা। আর সূরা ফাতিহার সারমর্ম হল সিরাতে মুস্তাকীমের হেদায়েত, সিরাতে মুস্তাকীমের সন্ধান দিতে গিয়ে কুরআনের পথ রাসূলের পথ বলার পরিবর্তে কিছু খোদাভক্তের সন্ধান দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, “সিরাতে মুসতাকীম হল তাদের পথ যাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত বর্ষিত হয়েছে। তাদের পথ নয়, যারা গজবে পতিত ও গোমরাহ”। (সূরা: ফাতিহা, আয়াত-৬,৭) আল্লামা শামী (রাহঃ) এর মতে শরীয়ত ও তরীকত পরস্পর অভিন্ন এবং একটি অপরটির সহিত অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কযুক্ত। শরীয়তের রাস্তায় পুরোপুরি চলার নামই তরীকত। আল্লাহতায়ালা বলেন, যে নিজের নফসকে শুদ্ধ করে, সে সফলকাম হয়। আর যে আত্মাকে কুলষিত করে সে ব্যর্থ হয়। (সূরা: শামস, আয়াত: ৯-১০) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জন করে সে সফলকাম, পক্ষান্তরে সে ব্যক্তি ব্যর্থ যে নিজের নফসকে পাপের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে। অন্য আয়াতে বলেন, “নিশ্চয় সেই সফলকাম হবে, যে নিজের তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধ করে” (সূরাঃ আলা, আয়াত:১৪) রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, মানবদেহের একটি মাংসপিন্ড রয়েছে, সেটি যদি ঠিক থাকে তবে সারা শরীর ঠিক থাকে। আর তা যদি অকেজো হয় তখন দেহের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়। মনে রাখবে তা হল ‘কলব’। (বুখারী) আর আল কুরআন অন্তরের ব্যাধিসমূহের জন্য একান্ত সফল ও সুস্থতা এবং রোগ নিরাময়ের অব্যর্থ ব্যবস্থাপত্র। মহান সত্তা বলেন, (কুরআন) সে সমস্ত রোগের জন্য আরোগ্য যা বুকের মাঝে হয়ে থাকে। (সূরাঃ ইউনুছ, আয়াতঃ ৫৭)
 লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০